হক সাহেব থেকে শেখ সাহেব এবং শেখ হাসিনা

হক সাহেব থেকে শেখ সাহেব এবং শেখ হাসিনা

আবদুল গাফফার চৌধুরী


বাংলাদেশের রাজনীতিতে কয়েকটি নাম প্রায় মাইলফলক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই মাইল ফলকগুলো দেশটির রাজনীতির গতি-প্রকৃতির সন্ধান দেয়। এই নামগুলো হলো ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ। গত শনিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ছিল শেখ হাসিনার ৬৬তম জন্ম দিবস। তাকে নিয়ে আমি অনেক লেখালেখি করেছি। এবারে তার সম্পর্কে লিখতে গিয়ে মনে হল দেশের রাজনীতিতে হক সাহেব থেকে শেখ সাহেব এই যে মাইল ফলক, তাতে শেখ হাসিনার নামটিও এখন যুক্ত করা যায়।

যিনি যতো বড় মাপের মানুষ হন, তারও ভুলভ্রান্তি থাকে। শেখ হাসিনা একটানা ৩২ বছর দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন, দু' দু'বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এবং এখনো ওই পদে আছেন। সুতরাং তার রাজনীতিতেও বড় ধরনের ভুলভ্রান্তি থাকতে পারে। সেটা বড় কথা নয়। বড় কথা, দেশের মূলধারার রাজনীতি, যে ধারা হক সাহেব থেকে শেখ সাহেব পর্যন্ত বহমান সে ধারার যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে শেখ হাসিনা নিজেকে প্রমাণ করতে পেরেছেন এবং একথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, দেশের ইতিহাস নির্মাণে নিজের একটি স্থায়ী আসন তৈরি করতে পেরেছেন।
 
হাসিনা যখন ক্ষমতায় থাকবেন না, এমনকি বেঁচেও থাকবেন না, বাংলার ইতিহাসে মাইল ফলকের মতো অন্যান্য নামের সঙ্গে তার নামটিও থাকবে। ভবিষ্যতে কেউ হয়তো তার রাজনীতির সাফল্যগুলো বিশ্লেষণ করবেন। কেউ করবেন তার অসাফল্যগুলোর। কিন্তু এই সাফল্য ও অসাফল্যগুলো মিলিয়ে তিনি যে তার সমসাময়িক অনেক কীর্তিমান নেতার কৃতিত্বকে অতিক্রম করে প্রথমে একজন গৃহবধূ থেকে জননেত্রী, তারপর নিজেই ইতিহাসে আরেকটি মাইল ফলক হয়ে উঠেছেন একথাটি আজ বিতর্কিত অথবা অত্যুক্তি মনে হলেও ভবিষ্যতে ইতিহাসই তাকে সে স্বীকৃতি দেবে।
 
জার্মানীর একজন সাবেক চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ডট ছিলেন বহু নিন্দিত ও বহু বিতর্কিত রাজনীতিক। তাকে এক সময় ট্রেইটরও বলা হয়েছিল। কারণ, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় পোলান্ড আক্রমণ এবং পোলান্ডে জার্মানীর যুদ্ধাপরাধের জন্য সে দেশের রাজধানী ওয়ার্সতে গিয়ে তিনি জার্মানীর হয়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন। জার্মানীর অন্য রাজনৈতিক দলগুলো তখন তাকে ট্রেইটর বলে ধিক্কার দিয়েছিল। ঠিক বাংলাদেশে ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, ফারাক্কা চুক্তি এবং অন্যান্য সহযোগিতা চুক্তির পর শেখ হাসিনাকে যেমন তার বিরোধী পক্ষ 'ভারতের তাঁবেদার' আখ্যা দিয়েছিল। এখন জার্মানীতে উইলি ব্রান্ডটের নবমূল্যায়ন হয়েছে। তার সাফল্য ও ব্যর্থতাগুলোকে তুলনামূলক বিচার দ্বারা এখন জার্মানীর ইতিহাসবিদরাই তাকে আখ্যা দিয়েছেন 'নব্য জার্মানীর স্থপতি।' (Founder of new Germany)। আজ বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যতোই নিন্দা ও বিতর্কের ঝড় তোলা হোক, তাকে 'একদিন দেশের দুর্দিনের সবচাইতে সাহসী ও সফল কাণ্ডারি' আখ্যা দেয়া হবে, তাতে আমার কোনো সন্দেহ নেই।
 
বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষিজীবী মুসলমানের রাজনৈতিক জাগরণ ও শিক্ষিত নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিতে উত্তরণে নেতৃত্ব দিয়েছেন ফজলুল হক। ১৯০৬ সালে ঢাকার আহসান মঞ্জিলে যখন নবাব সলিমুল্লাহ্ নিখিল ভারত মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা করেন, তখন সেই সভায় উপস্থিত সকল মুসলমান নেতাই (নবাব মুহসিউল মূলক, নবাব ভিখারুলমূলক) ছিলেন অবাঙালি নবাব। একমাত্র বাঙালি ছিলেন যুবক ফজলুল হক। উর্দুভাষী নবাব সলিমুল্লাহ্ ঢাকার নবাব হলেও তাকে বাঙালি বলে গণ্য করা যেতো না।
 
তখনকার যুবক ফজলুল হক অল্পদিনের মধ্যেই বুঝতে পারেন, মুসলিম লীগ আসলে ব্রিটিশদের পোঁধরা ভারতীয় মুসলমান নবাব নাইটদের প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ সরকারের কাছে নানারকম দেন-দরবার করাই হবে এদের কাজ। ভারতের বিশেষ করে বাংলার বিশাল বিরাট দরিদ্র কৃষক সমাজের অভাব অভিযোগ সমস্যা সংকট সমাধানে এই প্রতিষ্ঠান কোনো ভূমিকাই রাখতে পারবে না। পরবর্তীকালে তিনি তাই কৃষকদের দাবি- দাওয়ার ভিত্তিতে নিখিল বঙ্গ কৃষক প্রজা পার্টি গঠন করেন। ত্রিশের দশকে অবিভক্ত বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করেন। কৃষক প্রজা পার্টি বিরাট জয়লাভের অধিকারী হয়।
 
হক সাহেব গত শতকের গোড়ার দিকেই বুঝতে পেরেছিলেন, দরিদ্র কৃষক প্রজার দারিদ্র্য মোচন এবং তাদের উন্নয়নের জন্য দরকার ব্রিটিশ রাজের সৃষ্ট বিভেদাত্মক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পরিহার করে অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে দেশের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সাধারণ মানুষের ঐক্যকে কিছুতেই বিভক্ত ও দুর্বল হতে না দেয়া।
 
বাংলাদেশ অবিভক্ত থাকার সময় থেকেই মুসলিম রাজনীতির এই মূলধারার বিকাশ অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে এবং নব উত্থিত বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের প্রথম সফল রাজনৈতিক সংগঠন কৃষক প্রজা পার্টি। পরে কংগ্রেসের হঠকারিতা এবং নিজের রাজনৈতিক ভ্রান্তির দরুনই শেরেবাংলা ফজলুল হক সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগের সঙ্গে হাত মেলান এবং নিজের রাজনৈতিক সর্বনাশ ডেকে আনেন।
 
মুসিলম লীগে যোগ দিলেও ১৯৪০ সালে লাহোরে মুসলিম লীগ সম্মেলনে তিনি যে পাকিস্তান প্রস্তাব উত্থাপন করেন, তা ভারতে একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ছিল না। পাকিস্তান নামটিও ওই প্রস্তাবে ছিল না। ছিল ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্বপ্রান্তে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে একাধিক রাষ্ট্র (States) প্রতিষ্ঠার কথা। ১৯৪৬ সালে ফজলুল হক যখন মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কৃত, তখন মোহাম্মদ আলী জিন্না দিল্লিতে মুসলিম লীগের কনভেনশন ডেকে অবৈধভাবে স্টেটস কথাটির এস শব্দটি কেটে দিয়ে একটি ইউনিটারি মুসলিম রাষ্ট্র (State) প্রতিষ্ঠার কথা পাস করান। জিন্নার এই অপচেষ্টার প্রতিবাদ করেছিলেন একমাত্র তখনকার বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম, তিনি অসাম্প্রদায়িক যুক্তবাংলা গঠনের প্রধান পরিকল্পক ছিলেন।
 
১৯৪৬ সালে দিল্লিতে মুসলিম লীগের কনভেনশন ডেকে ১৯৪০ সালে কাউন্সিল অধিবেশনে গৃহীত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রসমূহ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব জিন্না অবৈধভাবে বাতিল করায় ফজলুল হক তার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, "জিন্নার দ্বারা সংশোধিত ইউনিটারি পদ্ধতির পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি মুসলমানের অধিকার ও স্বার্থ দারুণভাবে খর্ব হবে এবং এক কেন্দ্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তান হবে পশ্চিম পাকিস্তানের কলোনি।" ১৯৪৬ সালে অনুষ্ঠিত ভারতব্যাপী সাধারণ নির্বাচনে তিনি তার দল নিয়ে আবার মুসলিম লীগের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং পরাজিত হন। নীরদ সি চৌধুরী কর্তৃক বর্ণিত 'আত্মঘাতী বাঙালি' হক নেতৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করে জিন্নার ডাকে তার মনোনীত "কলাগাছগুলোকেও" ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে এবং নিজেদের সর্বনাশ ডেকে আনে। ১৯৭১ সালে ত্রিশ লাখ বাঙালিকে আত্মদান করে সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়।
 
চল্লিশের ও পঞ্চাশের দশকে আব্দুর রহমান সিদ্দিকি ছিলেন মুসলিম লীগের একজন প্রবীণ নেতা ও সাংবাদিক (তিনি মর্নিং নিউজ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক এবং পরে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হয়েছিলেন)। তিনি জিন্নাকে বলতেন 'হাফ অ্যাডুকেটেড ব্যারিস্টার' এবং তার এক নিবন্ধে স্বীকার করেছেন, "১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে অবিভক্ত বাংলার মুসলমান ভোটদাতারা যদি মুসলিম লীগের প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে ফজলুল হকের দলের প্রার্থীদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নির্বাচিত করতো তাহলেও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হতো। ফজলুল হক তখন প্রভাবশালী রাজনৈতিক ভূমিকা গ্রহণ করতে পারলে এবং বাংলাভাগ ও কলিকাতা শহরের উপর পূর্ব পাকিস্তানের দাবি নিয়ে যদি র্যাডক্লিক কমিশনের সামনে দাঁড়াতে পারতেন (জিন্না তাকে এই কমিশনে যেতে দেননি) তাহলে জিন্নার কর্তিত পাকিস্তানের (trunked Pakistan) বদলে ভারতের দুই প্রান্তে দুইটি স্থায়িত্বলাভের উপযোগী (Viable) অ-কর্তিত মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনাই ছিল অনেক বেশি।"
 
শুধু আব্দুর রহমান সিদ্দিকি নন, বর্তমানে তার মতো আরো অনেক প্রবীণ ও প্রাজ্ঞ রাজনীতিকের ধারণা, ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী উপ-মহাদেশের দুই প্রান্তে দুইটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ তৈরি হলে সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি হতো আধুনিক গণতন্ত্র। অস্বাভাবিক ভৌগোলিক অবস্থান এবং সামাজিক ও জাতিগত ব্যবধান ও বৈষম্যের জন্য সেই রাষ্ট্র দুইটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সহসা ভেঙে পড়তো না এবং সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মান্ধতার অভ্যুদয়ে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে সাম্রাজ্যবাদী ড্রোন হামলায় এমনভাবে বিপর্যস্ত হতো না।
 
আমার একটি ধারণা, 'আত্মঘাতী বাঙালির' (মুসলমান) নির্বাচিত পরিষদ সদস্যরা '৪৬ সালের নির্বাচনের পর শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো একজন গণতন্ত্রমনা ও আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গীয় মানুষকে সদ্য গঠিত পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের পার্লামেন্টারি নেতা নির্বাচিত না করে জিন্নার ক্রীড়নক, উর্দুভাষী ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য খাজা নাজিমুদ্দীনকে নির্বাচিত করে প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ দেয়ায় পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু অধিবাসী হয়েও পূর্ব পাকিস্তান তার সব গুরুত্ব ও অধিকার হারায় এবং পূর্ব পাকিস্তান অবাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকদের কলোনিতে পরিণত হওয়ার পথে দ্রুত এগিয়ে যায়। কেন্দ্রীয় সরকারের বাঙালির স্বার্থ ও অধিকার বিরোধী একটার পর একটা পদক্ষেপের বিরুদ্ধে খাজা নাজিমউদ্দীন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেননি এবং চানওনি। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের অবাঙালি শাসকদের শিখণ্ডি মুখ্যমন্ত্রী।
 
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় এক বছর না যেতেই এটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, পূর্ব বাংলা (তখন পূর্ব পাকিস্তান) ব্রিটিশ কলোনীর পরিবর্তে একটি পাঞ্জাবি কলোনীতে পরিণত হয়েছে এবং এই পাঞ্জাবি শাসনে বাঙালির ভাষা, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারও আর নিরাপদ নয়। পূর্ব পাকিস্তানের মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভায় প্রথম অর্থমন্ত্রী ছিলে হামিদুল হক চৌধুরী। '৭১-এ তিনি পাকিস্তানের কোলাবরেটর হয়েছিলেন; কিন্তু তখন ছিলেন অর্থমন্ত্রী হিসেবে (নাজিম উদ্দীন ও পরবর্তী নূরুল আমিন সরকারে) পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার জন্য সক্রিয়। তাকে শুধু বরখাস্ত করা নয়, কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে সাজানো দুর্নীতির মামলায় জেলেও নিক্ষেপ করা হয়।
 
শহীদ সোহরাওয়ার্দী পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হলে তার পেছনে মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশটির সমর্থন থাকায় এবং তারা গণসম্পৃক্ত নেতাকর্মী হওয়ায় তাদের প্রতিবাদের মুখে পশ্চিমা শাসকদের পক্ষে বাঙালির ভাষা সংস্কৃতির উপর এতো সহজে আঘাত হানা এবং তাদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ এবং তাদের উপর অর্থনৈতিক বঞ্চনা ও বৈষম্যের নীতি চাপিয়ে দেওয়া সম্ভব হতো না।
 
শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে মুসলিম লীগ রাজনীতি থেকে সরানো গেলেও তিনি কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে মুসলিম লীগের প্রতি বীতশ্রদ্ধ নেতা ও কর্মীর এক বিরাট অংশকে তার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ করে পূর্ব পাকিস্তানের অপহূত অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য আন্দোলন শুরু করতে পারেন এই ভয়ে মুসলিম লীগের শাসকেরা তার পূর্ব পাকিস্তানে আগমন নিষিদ্ধ করে দেন এবং পাকিস্তানের প্রথম গণপরিষদে তার আসনটিও বাতিল করে দেন। অন্যদিকে ফজলুল হককে প্রাদেশিক এটর্নী জেনারেলের পদে বসিয়ে এবং তার ভাগ্নে আফজল মোক্তারকে প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় গ্রহণ করে তাকেও বিরোধী রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাখা হয়।
 
আগেই বলেছি, গত শতকের গোড়াতেই নব উত্থিত বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের জীবনে তাদের রাজনীতির অসাম্প্রদায়িক মূলধারার শুরু। অনুরূপভাবে তার পাল্টা প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক বিপরীতমুখী ধারাটিরও শুরু। বাংলার রাজনীতি এই দুই ধারার ক্রমাগত সংঘর্ষ ও সংঘাতের দ্বারা পূর্ণ ছিল এবং এখনো রয়েছে। মূলধারার রাজনীতির মূল প্রতিনিধি এখন আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা এবং বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়াশীল ধারার নেতৃত্বে এখন রয়েছে মুসলিম লীগের বদলে বিএনপি, তাদের সহযোগী জামায়াত ও হেফাজত গোষ্ঠী এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের ছাপমারা এবং ছাপ না মারা বিভিন্ন ফ্রন্ট, এমনকি একটি সুশীল ও বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত গোষ্ঠীও।
 
মূলধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতির নেতা হিসেবে হক সাহেব থেকে শেখ সাহেবকে যে সংগ্রাম, বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে এগুতে হয়েছে এবং নিন্দা, গালি ও বিতর্কের ঝড়ের মধ্যে সারা জীবন কাটাতে হয়েছে, সেই মূলধারার রাজনীতির উত্তরাধিকার বহন করতে গিয়ে শেখ হাসিনাও এখন একই বাধা-বিপত্তি, নিন্দা-সমালোচনা এবং বহুদিকের আক্রমণে জর্জরিত। তবু এই রাজনীতির তিনি মাইল ফলকে পরিণত হয়েছেন। এর ঐতিহাসিক পটভূমি আরো একটু বিশ্লেষণ করা দরকার। তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতির আগামী দিনের সম্ভাবনা ও আশঙ্কার দিনটিও আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0