সেই দুর্ভাগ্যময় রাতের কথা

সেই দুর্ভাগ্যময় রাতের কথা
জাহীদ রেজা নূর

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত১৪ আগস্ট খুবই ব্যস্ত সময় কাটিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিকেলে তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আবদুল মতিন চৌধুরী, শিক্ষামন্ত্রী ড. মুজাফফর আহমদ চৌধুরী ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব মোকাম্মেল হক। পরদিন বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবেন, তাই শিক্ষাসচিব এসেছেন মানপত্র দেখাতে। সেই মানপত্র পাঠ করা হবে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব বক্তৃতা হবে, তা নিয়ে আলোচনা করেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী।

বঙ্গবন্ধুর স্নেহভাজন দুই কর্মকর্তা উচ্চশিক্ষার্থে দেশের বাইরে যাচ্ছিলেন। রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের পক্ষ থেকে সেদিন তাঁদের সম্মানে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু অবশ্য কর্মস্থল ছেড়ে গেলেন রাত আটটার দিকে। যাওয়ার আগে বলে গেলেন, একান্ত সচিব রেজাউল হায়াত ও সহকারী একান্ত সচিব শাহরিয়ার ইকবাল যেন ১৫ আগস্ট সকালে সরাসরি বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে চলে যান।

১৪ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধুর বোন—শেখ ফজলুল হক মনির মা—রাত ১২টা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ছিলেন। গল্প করেছেন ভাই ও ভাবির সঙ্গে। তিনি জানতেন না, সে রাতেই ভাই, ভাবি, ছেলে, ছেলের বউ, ভাস্তেদের হারাবেন।

সে রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বেগম মুজিব, শেখ রাসেল, শেখ জামাল, তাঁর স্ত্রী রোজী, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ নাসের ঘুমিয়েছিলেন দোতলায়। তিনতলার দুটি ঘরের একটিতে ঘুমিয়েছিলেন শেখ কামাল ও তাঁর স্ত্রী সুলতানা। বঙ্গবন্ধুর ঘরের সামনের বারান্দায় ঘুমিয়েছিলেন বাড়ির দুই পরিচারক আবদুর রহমান শেখ (রমা) ও সেলিম ওরফে আবদুল।

নিচতলায় ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সচিব এ এফ এম মহিতুল ইসলাম ও বাড়ির অন্য কর্মচারীরা।

বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে সেদিন এ এফ এম মহিতুল ইসলামের কাজের সময় নির্ধারিত ছিল ১৪ আগস্ট রাত আটটা থেকে ১৫ আগস্ট সকাল আটটা পর্যন্ত। রাত একটার দিকে তিনি ঘুমিয়ে পড়েন। খুব ভোরে টেলিফোন মিস্ত্রির ডাকে ঘুম ভেঙে যায় তাঁর। বঙ্গবন্ধু ডাকছেন মহিতুলকে।

তখন ভোর। চারদিকের আকাশ ফরসা হয়ে আসছে। ভোর সাড়ে চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে কোনো একসময়। বঙ্গবন্ধু ফোনেই বললেন, ‘সেরনিয়াবাতের বাড়িতে দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করেছে।’

বঙ্গবন্ধু তখনো জানেন না, বিরাট এক ষড়যন্ত্রের শিকার হতে যাচ্ছেন তিনি।

এ সময় দোতলার দরজা খুলে বেগম মুজিব ‘সেরনিয়াবাতের বাড়িতে দুষ্কৃতকারীরা আক্রমণ করেছে’—এ কথা বলতে বলতে বেরিয়ে আসেন। রমা বাড়ি থেকে বেরিয়ে লেকের দিকে যান। দেখতে পান, গুলি ছুড়তে ছুড়তে কিছু সৈন্য বঙ্গবন্ধুর বাড়ির দিকে আসছে। তিনি বাড়ি ফেরার পথে বঙ্গবন্ধু ও মহিতুল ইসলামকে কথা বলতে দেখেন।

মহিতুল ফোন করেন পুলিশ কন্ট্রোল রুমে। লাইন পাওয়া যায় না। গণভবন এক্সচেঞ্জে চেষ্টা করেন। লাইন পাওয়া যায় না। বঙ্গবন্ধু নিচে নেমে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘পুলিশ কন্ট্রোল রুম থেকে কেন ফোন ধরছে না?’

মহিতুল আবার চেষ্টা করলেন। তিনি যখন ‘হ্যালো, হ্যালো’ বলছেন, তখন বঙ্গবন্ধু এসে সে ফোন হাতে নিলেন। বললেন, ‘আমি প্রেসিডেন্ট বলছি।’

ঠিক সে সময় দক্ষিণ দিকের জানালা ভেদ করে একপশলা গুলিবর্ষণ হলো। জানালার কাচ ভেঙে চৌচির হয়ে গেল। মহিতুলের হাত জখম হলো সে কাচে। বঙ্গবন্ধু শুয়ে পড়লেন। দেখাদেখি মহিতুলও। কিছুক্ষণের জন্য গুলি বন্ধ হলে উঠে দাঁড়ালেন বঙ্গবন্ধু।

এরই মধ্যে রমা শেখ, কামাল ও শেখ জামালের ঘুম ভাঙিয়েছেন। শেখ কামাল প্যান্ট–শার্ট পরে চলে গেছেন নিচতলায়। শেখ জামাল ও তাঁর স্ত্রী রোজী গেছেন মায়ের ঘরে। সুলতানাও সেখানে এলেন।

দোতলা থেকে গৃহপরিচারক সেলিম ওরফে আবদুল বঙ্গবন্ধুর পাঞ্জাবি আর চশমাটা এনে বঙ্গবন্ধুকে দিলেন। সেগুলো পরে বারান্দায় এসে বঙ্গবন্ধু গেটের কাছে দাঁড়ানো নিরাপত্তা বাহিনীর লোকদের উদ্দেশে বললেন, ‘আর্মি সেন্ট্রি, পুলিশ সেন্ট্রি এত গুলি চলছে, তোমরা কী করো?’

এ সময় শেখ কামাল বললেন, ‘আর্মি ও পুলিশ ভাই, আপনারা আমার সঙ্গে আসুন।’

ততক্ষণে খুনিরা ঢুকে পড়েছে বাড়িতে। শেখ কামালের সামনে এসে দাঁড়াল কালো আর খাকি পোশাকের মৃত্যুদূতের দল। মহিতুল ও ডিএসপি নূরুল ইসলাম খান ছিলেন শেখ কামালের পেছনে। নূরুল ইসলাম মহিতুলকে টান দিয়ে নিয়ে গেলেন অফিস কক্ষে। কিছুক্ষণের মধ্যেই শোনা গেল গুলির শব্দ। শেখ কামাল গুলির আঘাতে ছিটকে পড়লেন অফিস ঘরের দিকে। তিনি চিৎকার করে বলছিলেন, ‘আমি শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল, ভাই, ওদেরকে বলেন।’

বঙ্গবন্ধু সে সময় দোতলায় নিজের ঘরে ফিরে গেছেন। প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ফোন করতে থাকেন। কর্নেল জামিলকে ফোনে পান। ফোনে পান সেনাপ্রধান সফিউল্লাহকে। তাঁদের জানান এই পরিস্থিতির কথা। একসময় গোলাগুলি থামলে বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে আসেন তাঁর ঘর থেকে। খুনিরা তাঁকে ঘিরে ধরে। রমা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর পেছনে। বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘তোরা কী চাস? কোথায় নিয়ে যেতে চাস আমাকে?’

৩২ নম্বরের বাড়ির সিঁড়িতে গুলিবিদ্ধ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত৩২ নম্বরের বাড়ির সিঁড়িতে গুলিবিদ্ধ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

এ সময় তিনি গুলিতে আহত সেলিমকে দেখে ঘাতকদের বলেন, ‘এই ছেলেটা ছোটবেলা থেকে আমার এখানে থাকে। ওকে কে গুলি করল?’

ওরা বঙ্গবন্ধুকে সিঁড়ির দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। নিচ থেকে দুই ঘাতক ইংরেজিতে কিছু বলে পেছনের খুনিরা সরে যায়। নিচ থেকে বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে ওরা। বঙ্গবন্ধু লুটিয়ে পড়েন সিঁড়িতে।

বঙ্গবন্ধুর ঘরে তখন দোতলার সবাই আর তিনতলা থেকে সুলতানা কামাল এসে আশ্রয় নিয়েছেন। রমা এসে বঙ্গবন্ধুকে গুলি করার কথা জানান বেগম মুজিবকে। শেখ নাসের এ ঘরে আসার আগেই তাঁর গায়ে গুলি লাগে। বেগম মুজিব তাঁর শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে রক্ত মুছে দেন।

খুনিরা এসে এই ঘরের দরজা ধাক্কাতে থাকলে বেগম মুজিব বলেন, ‘মরলে সবাই একসাথে মরব।’ এ কথা বলে তিনি দরজা খুলে দেন। বেগম মুজিব, শেখ নাসের, শেখ রাসেল ও রমাকে নিয়ে নেমে আসছিল খুনিরা। সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর লাশ থেকে বেগম মুজিব বলেন, ‘আমি যাব না, আমাকে এখানেই মেরে ফেলো।’

খুনিরা তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ঘরে। ব্রাশফায়ার করে ঘরে থাকা সবাইকে হত্যা করে। শেখ রাসেল, শেখ নাসের ও রমাকে নিচে নিয়ে আসে। মহিতুলসহ সবাইকে লাইনে দাঁড় করানো হয়।

বাঁ থেকে কামাল, রেহানা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোলে রাসেল, বেগম মুজিব, জামাল ও হাসিনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হাসিনা ও রেহানা ছাড়া বঙ্গবন্ধু পরিবারের আর সবাইকে হত্যা করা হয়। ছবি: সংগৃহীতবাঁ থেকে কামাল, রেহানা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোলে রাসেল, বেগম মুজিব, জামাল ও হাসিনা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হাসিনা ও রেহানা ছাড়া বঙ্গবন্ধু পরিবারের আর সবাইকে হত্যা করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

শেখ নাসেরকে ওরা জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কে?’

শেখ নাসের পরিচয় দিলে নিচতলার বাথরুমে নিয়ে গিয়ে তাঁকে হত্যা করে খুনিরা।

মহিতুলকে দেখতে পেয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরে রাসেল বলে ওঠে, ‘আমাকে মারবে না তো।’

মহিতুল বলেন, ‘না। তোমাকে কিছু বলবে না।’

মহিতুল ভাবতেই পারেননি এতটুকু একটি ছেলেকে কেউ হত্যা করতে পারে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাসেলকে মায়ের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে হত্যা করা হয়। এরপর মেজর বজলুল হুদা বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের গেটে দাঁড়িয়ে থাকা মেজর ফারুককে বলেন, ‘অল আর ফিনিশড’।

ডিএসসি নূরুল ইসলাম, পিও মহিতুল ইসলাম ও সেলিম আহত হয়েছিলেন সেদিন।

এ বাড়িতে হত্যা করা হয়েছিল নয়জনকে।

সোবহানবাগ মসজিদের কাছে কর্নেল জামিলের গাড়ি থামিয়ে তাঁকে হত্যা করে খুনিরা।

সূত্র:
১. রমার জবানবন্দি
২. সেলিমের জবানবন্দি
৩. এ এফ এম মহিতুল ইসলামের এজাহার
৪. ‘কর্মময় জীবনের শেষ সপ্তাহ’, শাহরিয়ার ইকবাল (ভোরের কাগজ, ১৫ আগস্ট, ১৯৯৬)
৫. ‘সেই রাতে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে কী ঘটেছিল’, মালেকা বেগম, (প্রথম আলো, ১৫ আগস্ট, ২০১৭)

সৌজন্যেঃ প্রথম আলো

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0