শশাঙ্ক ব্যানার্জির এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার-১ নেহেরুকে লেখা মুজিবের চিঠি ছিল ভারত সরকারকে শেকড়সহ কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো

শশাঙ্ক ব্যানার্জির এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার-১ নেহেরুকে লেখা মুজিবের চিঠি ছিল ভারত সরকারকে শেকড়সহ কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো

পীর হাবিবুর রহমান

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬২ সালের ২৪ ডিসেম্বর গভীর রাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহরুকে লেখা চিঠি হস্তান্তর করে শশাঙ্ক এস ব্যানার্জিকে বলেছিলেন, ‘আমি ভারতের কাছে সমমর্যাদার বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে স্বাধীনতার প্রশ্নে সমর্থন চাইছি। মাথা নত করে হাত পাতছি না। চীনের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে ভারত এখন দুনিয়ায় ইজ্জত হারিয়েছে। আমাকে স্বাধীনতা সংগ্রামে সহযোগিতা ন ফিরে আসবে, মর্যাদা যেমন বাড়বে; তেমনি আমার বাঙালি স্বাধীন আবাস ভূমি পাবে। আমরা স্বাধীন হব।’ সেই সময় পূর্ববাংলার ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় উপ-দূতাবাসের রাজনৈতিক অফিসার শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা বলেছেন। ১০ জুলাই সামারের চমৎকার বিকালে তাঁর লন্ডনের বাসভবনে টানা দুই ঘণ্টা তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন। ৮৬ বছর বয়স্ক শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি এখন অবসর জীবনযাপন করছেন। পরিপাটি সুন্দর বাড়ির পেছনে পিউলিপ, গোলাপসহ বাগান হরেক রকমের ফুলে প্রস্ফুটিত। সেখানে দাঁড়ালে ফুল আর ফুল দেখতে দেখতে মন জুড়িয়ে যায়। আমার সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিদিনের যুক্তরাজ্য প্রতিনিধি আ স ম মাসুম ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়েছিলেন। শশাঙ্ক এস ব্যানার্জির দুই ছেলে ক্যামব্রিজ পাস করে একজন ওয়াশিংটনে আরেকজন লন্ডনে পরিবার-পরিজন নিয়ে কর্মরত। দেয়ালে তাঁর গোটা পরিবারের ছবিসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ১০ জানুয়ারি ’৭২ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের পাশাপাশি সিটে বসা ছবিখানি উজ্জ্বল হয়ে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছিল।

১৯৫৫ সালে ফরেন চাকরিতে যোগ দেওয়া শশাঙ্ক ব্যানার্জি ’৮৫ সালে অবসর নেন। ’৬২ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার স্বপ্ন সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু হত্যার পূর্ব পর্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িত ছিলেন। বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক ছিল। এমন সুপুরুষ, এমন কণ্ঠ ও ভাষার বক্তৃতায় একজন অসীম সাহসী দেশপ্রেমিক ও অমায়িক ব্যবহারের বিচক্ষণ নেতা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।

শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বলেছেন, ১৯৬০ সালে তাঁকে পলিটিক্যাল অফিসার হিসেবে ভারতীয় উপ-হাইকমিশনে নিয়োগ দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হয়। ঢাকায় আসার আগে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ও যোগাযোগ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। যদিও তখন আওয়ামী লীগ বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠেনি। ১৯৬২ সালের ২৫ মার্চ ছিল খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের বড়দিনের উৎসব। তখন তিনি পুরান ঢাকার চক্রবর্তী ভিলায় বসবাস করেন। বাড়িটির পাশেই ছিল দৈনিক ইত্তেফাক অফিস। ২৪ ডিসেম্বর রাতে তিনি তাঁর সহধর্মিণীসহ এক সহকর্মীর বাসায় বড়দিনের আনন্দ অনুষ্ঠান ও নৈশভোজ শেষে রাত ১২টার পর পর বাসায় ফিরে পেছনের দরজা দিয়ে প্রবেশ করেন। ঘরে প্রবেশ করতে না করতেই সামনের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পান। দরজা খুলে দেখেন ১৪ বছরের এক ভদ্র, বিনয়ী অচেনা কিশোর দাঁড়িয়ে। সালাম বিনিময় করে সেই কিশোর ছেলেটি তাঁকে বললেন, ইত্তেফাক সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া আপনাকে নিয়ে যেতে আমাকে পাঠিয়েছেন। দরজা খোলার আগে কড়া নাড়ার শব্দে শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন। নিশ্চিত হতে পারছিলেন না, মধ্যরাতের পর এই অসময়ে কে বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল। তিনি ভাবছিলেন, কেউ কি তাঁকে অনুসরণ করছিল? ঢাকায় আসার আগে তাঁকে নিজের এবং পরিবারের অতিরিক্ত নিরাপত্তায় সতর্ক থাকতে বলা হয়েছিল। দৈনিক ইত্তেফাক ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার লেখা নিয়মিত পড়ে মুগ্ধ হলেও কখনো দেখা হয়নি। ছেলেটি আরও বলল, মানিক মিয়ার সঙ্গে আরেকজন ভদ্রলোক আছেন। কিন্তু সেই ভদ্রলোক কে? সেটি ছেলেটি আর বলল না। তিনি ইতস্তত করে করে গোলকধাঁধার মতো মানিক মিয়ার আমন্ত্রণ গ্রহণ করে বসলেন। যা ছিল প্রথাবিরোধী। ব্যানার্জি বলেন, কিন্তু আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, “যাই ঘটুক না কেন আমি সেই অজানার উদ্দেশ্যে যাব।” ছেলেটিকে বলে দিলেন, চলে যেতে এবং মানিক মিয়াকে জানাতে যে, কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি দেখা করতে আসছেন।

এমন একটি সাক্ষাতের জন্য গভীর রাতে প্রস্তুত না থাকলেও শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জি কিছুক্ষণ পর মানিক মিয়ার সঙ্গে দেখা করতে ইত্তেফাক ভবনে গেলেন। তিনি শুধু আঁচ করলেন, বৈঠকটি যে রাজনৈতিক হবে এ নিয়ে তাঁর সন্দেহ নেই। তবে এ জন্য তিনি কিছুটা ঘাবড়ে গিয়েছিলেন। শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বলেন, “আমি পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে মানিক মিয়া তাঁর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে করমর্দন করে অস্বাভাবিক মুহূর্তে দেখা করতে আসায় ধন্যবাদ জানালেন। তিনি আমাকে নাম ধরে সম্বোধন করলেন এবং তাঁর পাশে দাঁড়ানো ভদ্রলোকের দিকে ফিরে, হাতের ইশারায় পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমি তাঁর ছবি পত্রিকায় দেখেছি। তাঁর ভাষণ শুনেছি এবং চেহারা খুবই পরিচিত। আমার মনে হলো, এই ভদ্রলোককে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বলেন, আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পর এই প্রথম আমার শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা হলো। আমাকে বলতেই হবে, এতটা কাছ থেকে তাঁকে দেখার পর তিনি তাঁর ক্যারিশমা দিয়ে আমাকে মুগ্ধ করেছিলেন। ঈুৎরষ উঁহহ নামে একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করার পর বলেছিলেন, ‘মুজিব সুপুরুষ ছিলেন এবং তাঁর ছিল দারুণ ব্যক্তিত্ব।’ তিনি ঠিক কথাই বলেছিলেন। আমি দূর থেকে পল্টন ময়দানের গণসমাবেশে শেখ মুজিবের ভাষণ শুনেছি। আমি জানতাম, শক্তিশালী বক্তব্যে তিনি কেমন করে স্রোতাদের বেঁধে রাখেন। সেই সময় আমি শেখ মুজিবের ভাষণ ও মানিক মিয়ার লেখনী থেকে বাংলা ভাষা শিখেছি বললে বাড়িয়ে বলা হবে না। এমনকি তাঁদের আমার বাংলা ভাষার শিক্ষকও বলা যায়।

পরিচয়ের সময় মুজিব শক্ত হাতে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে আমার সঙ্গে করমর্দন করলেন এবং আমাকে তুমি সম্বোধন করে কথা বলতে শুরু করলেন। আমি মুগ্ধ ও অভিভূত হয়ে তাঁকে বললাম, আপনি আমাকে তুমি বলতে পারেন কিন্তু আমি আপনাকে তুমি বলতে পারব না। শেখ মুজিব আমার চোখের দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন ভীষণ জরুরি একটা কিছু বলার জন্য তিনি উসখুস করছেন। হাসিমুখে চোখ মিটমিট করে তাঁকে বললাম, আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে আমি ভীষণ আনন্দিত হয়েছি। তবে জানতে চাইছি, এটা কি একটি ঐতিহাসিক করমর্দন? শেখ মুজিবের ত্বরিত জবাব ছিল, কেন নয়? ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থেচার সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর বলেছিলেন, এই সোভিয়েত নেতার সঙ্গে পশ্চিমের লেনদেন সম্ভব। তেমনি ওই সময়ে আমার মনে যে কথাটি গোপনে দানা বেঁধে উঠেছিল, সেটি হচ্ছে, ‘শেখ মুজিবের সঙ্গে ভারতের লেনদেন সম্ভব।’ সেদিন শেখ মুজিবের পরনে ছিল লুঙ্গি, পায়ে চপ্পল, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, গায়ে সোয়েটার। শেখ মুজিবকে বললাম, আমি অধমের সঙ্গে আপনি কেন দেখা করতে চাইলেন? কেন ডাকলেন? তিনি বললেন, তোমার সঙ্গে খুব দরকারি কথা আছে। আমি প্রশ্ন করলাম, গণতন্ত্রের জন্য কি ভারতের কাছে সাহায্য চান? তিনি কিছুটা ইতস্তত করে বললেন, না। গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করলেও আমি পাকিস্তানের জন্মের পর থেকে যেটির কথা চিন্তা করছি, সেটি শুনলে চমকে উঠবেন না তো? আমি বিস্ময় নিয়ে তাঁর দিকে তাকালাম। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, আমি পূর্ববাংলার স্বাধীনতার কথা চিন্তা করছি। শেখ মুজিবের কথা শুনে আমি শুধু চমকেই যাইনি, রীতিমতো দাঁড়িয়ে গেলাম। অবাক হয়ে বললাম, পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা যদি জানে মেরে ফেলবে। এটা তো সাংঘাতিক ব্যাপার। এটা প্রকাশ হবে না তো! প্রকাশ হলে দেশদ্রোহী মামলা হবে। সাবধান, এভাবে ওপেন বলবেন না। আপনাদের প্রাণ তো যাবেই; ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। তবে আপনারা নিশ্চিত থাকুন, আমার তরফ থেকে এটি ফাঁস হবে না। তিনি বললেন, তাদের তরফ থেকেও ফাঁস হবে না। সেদিন এই দুই মহান ব্যক্তির সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হলেও তাঁদের কর্মকান্ডের সঙ্গে আমি মানসিকভাবে জড়িয়ে ছিলাম।

পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকে লেখা মানিক মিয়ার বিচক্ষণ তর্কমূলক কলামগুলো কখনো না পড়ে থাকতাম না। বুঝতে পারতাম, তাঁর চাতুর্যে ভরা ‘স্বায়ত্তশাসন’ শব্দটির আড়ালে আসলে ‘স্বাধীনতা’ আছে। আশ্চর্যের বিষয়, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বুঝতেই পারেনি, শেখ মুজিব ও মানিক মিয়া কোন দিকে যাচ্ছেন। গণবিক্ষোভমূলক কলামগুলো লেখার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে কখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এমনও অনেক কলাম ছিল উসকানিমূলক হওয়ার জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আমার মনে হয়, হয়তো পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বাংলায় অনুবাদকগণ মানিক মিয়ার কলামের সঠিক চিত্রটি কর্তাব্যক্তিদের কাছে তুলে ধরেননি। অনেকে মনে করে নিতে পারেন, এসব তাত্ত্বিক বিষয় আওয়ামী লীগের নেতারা পড়েছিলেন এবং পাঞ্জাবিদের দমনের বিরুদ্ধে সমর্থন খুঁজে পেয়েছিলেন। সামরিক বাহিনী ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পাঞ্জাবিদের দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল। অন্যদিকে সংখ্যালঘু প্রদেশ যেমন বাঙালি, বেলুচি, সিন্ধি এবং পশতুরা সেই পাঞ্জাবিদের হাতে শোষণ ও দমনের শিকার হয়েছে। সামরিক বাহিনী কেন তার স্বায়ত্তশাসন নিয়ে লেখা কলামগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়নি জানতে চাইলে মানিক মিয়া বলেছিলেন, তিনি কোনো সুযোগ দেননি বা ইস্কুল বয়ের মতো উসকানিমূলক কিছু বলেননি। কিছুটা রেখেঢেকে নিজের মতামত জানানোটাই তাঁর স্টাইল। আমার মনে হয়েছিল, একজন একগুঁয়ে দেশপ্রেমিক হিসেবে এবং সাহিত্যিক হিসেবেও তিনি অসাধারণ। দ্ব্যর্থবোধক শব্দ ও পরিমিত ব্যঙ্গ প্রকাশে তিনি ছিলেন ওস্তাদ। তাঁর শক্তিশালী বাংলা গদ্যশৈলীর এক অভিনব বৈশিষ্ট্য ছিল গীতিময়তা।

এ সময় আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার জন্য ১৩ বছর জেল খেটেছেন। আর মানিক মিয়া ৫৮ সাল থেকে ৬৬ তিনবার গ্রেফতার হয়ে জেল খেটেছেন। 

ঐাক, শশাঙ্ক ব্যানার্জি বলেন, সেই রাতে শেখ মুজিবের সঙ্গে প্রথম দেখার পরই তাঁর অনেকটা প্রথম দর্শনেই প্রেমের পড়ার মতো হয়েছিল। তাঁর ভাষায়, আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে, শেখ মুজিবের মতো একজন বাগ্মী গণনেতা এবং মানিক মিয়ার মতো রাজনৈতিক চিন্তাবিদ দুজনে মিলে একটি বিপ্লব তৈরি করতে পারেন ও নেতৃত্ব দিতে পারেন। সেই রাতে আমাদের মিটিং তিন ঘণ্টা স্থায়ী হয়েছিল। আলোচনার বিষয় ছিল রাজনীতি, কিউবায় মিসাইল সংকট, কীভাবে চীন চতুরতার সঙ্গে ভারত দখলের সুযোগ নিয়েছে, তার কৌশলগত নির্দেশগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত নেটওয়ার্কের মতো ‘সম্মিলিত নিরাপত্তা জোট’, যা সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের গলায় কাঁটার মালার মতো। সামরিক একনায়কের পক্ষে আমেরিকার মদদ এবং এই অঞ্চলে কৌশলগত চিত্রে তার প্রভাব, সোভিয়েত ইউনিয়নের উপনিবেশিকতাবিরোধী জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম থেকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো কী আশা করতে পারে, আওয়ামী লীগ ও ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে কীভাবে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বিষয়ে পরিবর্তন আনা যায়, এমন সব বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছিল। এই আলোচনার মাধ্যমে আমার অভিনব সৌভাগ্য হয়েছিল, শেখ মুজিব ও মানিক মিয়ার মতো ব্যক্তির মনোভাব বুঝে নেওয়ার। বুঝতে পারি, বাংলাদেশের এই দুই নেতা তাঁদের কথায় বেশ পরিণত ও হিসেবী। পরাশক্তিগুলোর কাছে তাদের অবস্থানে কিছুটা দূরত্ব রাখতে চাইছেন তাঁরা।

তখন রাত প্রায় শেষ। বড়দিনের ভোর সমাগত। আলোচনা যখন প্রায় শেষ, তখন বুঝতে পারছিলাম, শেখ মুজিব ও মানিক মিয়া দুজনেই কিছুটা উসখুস করছেন, যেন তাঁরা আরও কিছু বলতে চান। আমিই স্বপ্রণোদিত হয়ে বললাম, উপরের মহলে পৌঁছে দিতে হবে এমন কোনো কথা আছে কি? শেখ মুজিবুর রহমান এবার তাঁর স্বরূপে মুখ খুললেন, বললেন, এই মিটিং তলবের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমার হাতে তাঁর একটি চিঠি তুলে দেওয়া, যেটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর কাছে যেতে হবে। আমার হাতে চিঠি তুলে দেওয়ার সময় তাঁকে দেখে মনে হয়েছিল, তিনি বেশ তাড়াহুড়োর মধ্যে আছেন। আমি তাঁকে বললাম, আমি ছাড়া এই চিঠি প্রধানমন্ত্রীর হাতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের আরও দুটি ভিন্ন অফিস ঘুরে যাবে। তারপর এটি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর টেবিলে যাবে, যার সঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব ও নয়াদিল্লির ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর পরিচালকের কপি এনডোর্স থাকবে। এই চিঠির সম্পূর্ণ লেখাটি ট্রিপল কোডেড সাইফার ম্যাসেজ হিসেবে পাঠানো হবে। আসল চিঠি একটি কূটনৈতিক ব্যাগে সেই সাইফার ম্যাসেজের সঙ্গে যাবে। শেখ মুজিব জানতে চাইলেন, ঢাকা হাইকমিশনের ওই দুজন অফিসার কে হতে পারেন? আমার মনে দ্বিধা থাকলেও শেখ মুজিব ও মানিক মিয়ার বিশ্বাস অর্জনের জন্য বলে দিলাম, একজন হলেন শ্রী সৌর্য কুমার চৌধুরী ডেপুটি হাইকমিশনার। যিনি ঢাকাস্থ মিশনের হেড এবং কর্নেল এস সি ঘোষ। যিনি পূর্ব পাকিস্তানে ভারতীয় ইন্টেলিজেন্স স্টেশনের চিফ।

সেই রাতে ইতিহাসের পাতা উল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে শেখ মুজিব গোপনীয় চিঠিটি ব্যক্তিগতভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী প-িত জওহরলাল নেহেরুর কাছে লিখেছিলেন। একটি ছোট্ট সূচনা প্যারাগ্রাফের পর, সেখানে সরাসরি পরবর্তী পরিকল্পনার কথা লেখা, যা মুজিবের ইচ্ছা অনুসারে তাঁর বিশ্বস্ত বন্ধু মানিক মিয়া লিখেছিলেন। যেখানে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম শুরুর কথা লেখা ছিল। চিঠিতে জোর দেওয়া হয়, পশ্চিম পাকিস্তানে পাঞ্জাবি মুসলমানদের সামরিক দমন, নিপীড়ন, বৈষম্য ও শোষণের ওপর। আর এভাবেই আসে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী মানুষগুলোর জন্য একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র তৈরির কথা। চিঠির ভাষ্যমতে শেখ মুজিবের উদ্দেশ্য ছিল, পাকিস্তানিদের দমন-পীড়নের মুখে খোলাখুলিভাবে যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকা- চালানো সমস্যা বলে মুজিব তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কেন্দ্রভূমি ঢাকা থেকে লন্ডন স্থানান্তর করতে চান এবং সেখান থেকেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনা করবেন। তিনি চিঠিটি শেষ করেছিলেন একটি রোডম্যাপ ও সময়সূচি দিয়ে। তিনি যত দ্রুত সম্ভব তাঁর বেস ঢাকা থেকে লন্ডনে স্থানান্তর করতে চাইছিলেন। মানিক মিয়ার ঢাকাতে থেকে যাওয়ার কথা ছিল। সেখানে থেকেই তিনি তাঁর সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাবেন। ইত্তেফাকে তিনি সার্বভৌমত্বের দাবিতে নিয়মিত কলাম লিখবেন। শেখ মুজিব ১৯৬৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বা খুব বেশি হলে ১ মার্চ লন্ডন থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন।

সার্বভৌম গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রাদেশিক সরকার লন্ডনে নির্বাসিত অবস্থাতেই গঠিত হবে। চিঠির শেষ প্যারাগ্রাফে নেহেরুর কাছে একটি ব্যক্তিগত অনুরোধ ছিল, যাতে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে ভারতের আত্মিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, মাঠ পর্যায়ে সব ধরনের নিঃশর্ত সহযোগিতা দেন। আরও বিস্তারিত আলোচনার জন্য মুজিব ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গোপনে ব্যক্তিগত সাক্ষাতের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। শশাঙ্ক ব্যানার্জি বলেন, এতে কি কোনো সন্দেহ আছে যে, নেহেরুকে লেখা মুজিবের গোপনীয় চিঠিটি একটি খাঁটি ডিনামাইট ছিল না? প্রধানমন্ত্রী নেহেরু কি সিদ্ধান্ত নেন, সেটি এক কথা। কিন্তু অন্যদিকে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জটিলতা ছিল হিমালয়ের সমান উঁচু। সব মিলিয়ে এই চিঠি ভারতের সরকারকে শেকড়সহ কাঁপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা বহন করছিল।

শেখ মুজিবকে সেই রাতে বিদায় নেওয়ার আগে বললাম, আপনি মহান লোক। আমি চুনোপুঁটি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরুকে এখন কেন চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন? কারণ চীনের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভীষণ বিধ্বস্ত। এই সময়টা কেন আপনার পছন্দ? শেখ মুজিব জবাবে বললেন, এটাই সুসময়। চীনের সঙ্গে পরাজয়ের অপমানে লজ্জিত ভারতকে কেউ পুচবে না। বিপদে পড়লে লোকে বন্ধু খোঁজে। আমি হাত পাততে আসিনি; সমমর্যাদার বন্ধুত্বের হাত বাড়াতে এসেছি। আমাদের সহযোগিতা দিলে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করব। আর ভারতের পরাজয়ের অপমানের লজ্জা মুছে যাবে। মর্যাদা ফিরে আসবে। শেখ মুজিবের বিচক্ষণতা আমাকে মুগ্ধ ও অভিভূত করল। মুজিব সেদিন আরও বলেছিলেন, শেখ মুজিবুর রহমান যুদ্ধ করতে নেমে ফাঁসিতে ঝোলার ভয় পায় না। শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বলেন, ভোর ৪টায় ঘরে ফিরে তিনি আর ঘুমাননি। তুমুল উত্তেজনা নিয়ে গোসল সেরে তৈরি হয়ে সাতসকালেই ছুটে চলে যান ডেপুটি হাইকমিশনার সৌর্য কুমার চৌধুরীর বাসভবনে। সৌর্য কুমার চৌধুরীর কাজিন জয়ন্ত চৌধুরী তখন ভারতের সেনাপ্রধান। সাতসকালে বাসভবনে যেতেই ডেপুটি হাইকমিশনার তাঁর বড় চোখ আরও বড় করে বললেন, কী হয়েছে বলুন তো? বললাম, শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা হয়েছে। তিনি আমাকে বসিয়ে শান্ত হয়ে জানতে চাইলেন, কী কথা হয়েছে? আমি বললাম, হাজার কথা হয়েছে। কিন্তু আসল কথা হলো এই চিঠিতে। তিনি নেহেরুকে লেখা শেখ মুজিবের চিঠি আরও বড় বড় চোখ নিয়ে পাঠ করে বললেন, আজকেই পাঠিয়ে দেব। টেলিগ্রাফও করে দেব, ভীষণ গোপনে ট্রিপল কোডে যাতে কারও হাতে গেলে বুঝতে না পারে।

ঢাকার কাজ দ্রুত শেষ হয়ে আসে। শেখ মুজিবের চিঠিটি হেড অব মিশন ও ইন্টেলিজেন্স স্টেশন চিফের কাছে জমা দেওয়া হয়। এর মধ্যে আমরা পাঁচজন অর্থাৎ ডেপুটি হাইকমিশনার, ইন্টেলিজেন্স চিফ, শেখ মুজিব এবং মানিক মিয়া ও আমি খুব অল্প সময়ে আরও দুটি মিটিং করে ফেলি। উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিব ভারতের কাছ থেকে কী আশা করেন, সেই বিষয়ে ভালোমতো বোঝা। এরই মধ্যে চীনা দখলদারিত্বের কারণে শোকে ডুবন্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে শেখ মুজিবের চিঠি পৌঁছে গেল এবং তিনি সেটি ভালো মতো খতিয়ে দেখলেন এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের নিয়ে একটি মিটিংয়ে বসলেন। নয়াদিল্লি থেকে আমাদের জানিয়ে দেওয়া হলো, শেখ মুজিবকে জানিয়ে দিন, তাঁর প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী নেহেরু পেয়েছেন এবং তিনি খুব দ্রুত এর জবাব দেবেন। শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি আফসোস করে বললেন, নেহেরুকে লেখা শেখ মুজিবের সেই চিঠির একটি ফটোকপি তাঁর রাখা উচিত ছিল। শেখ মুজিবের কোড নাম কী ছিল এটি জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে গিয়ে বললেন, কোড তো একটা নিশ্চয়ই ছিল।

 চিঠি পাঠ করে নেহেরুর পদক্ষেপ, জবাব ও শেখ মুজিবের আগরতলা গমন

শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জি বলেছেন, ‘স্বাধীনতার পরিকল্পনা নিয়ে লেখা শেখ মুজিবের চিঠি নয়াদিল্লির রাইসিনা হিল, সাউথ ব্লকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর অফিসে “‘ট্রিপল কোডেড’’’ সাইফার টেলিগ্রামের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছিল। আসল চিঠিও একই সময়ে প্রধানমন্ত্রীর মনোযোগ আকর্ষণ করে পাঠানো হয়। আমরা সবাই জানতাম সরল বিশ্বাসে চতুর চীনের দখলদারিত্বের কারণে ভারত প্রধানমন্ত্রী নেহেরু শোকের মধ্যে আছেন। তারপরও তিনি ভালোমতো শেখ মুজিবের চিঠি পড়ে প্রস্তাবটি খতিয়ে দেখলেন এবং দ্রুত তিনি তার নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের নিয়ে একটি মিটিংয়ে বসলেন। নেহেরু তার বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের স্বাধীনতার জন্য শেখ মুজিবের প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাহায্যের পথ বাড়াবেন কিনা? গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা সবাই স্টেশনে ছিলেন না। কেউ ছিলেন যাত্রাপথে, কেউ ছিলেন বিদেশে। তাই উচ্চপর্যায়ের মিটিংটি হতে সময় লেগেছিল। নয়াদিল্লির সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছিল। আমার মনে হয় এটি কূটনৈতিক জটিলতার জন্য নয়, বাংলাদেশকে সমর্থন করলে ভারতকে যেসব বিষয়ে মুখোমুখি হতে হবে, সেই সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো খুব সাবধানে পর্যালোচনা করছিল। তিনি বলেন, এদিকে, এই দীর্ঘ অপেক্ষা শেখ মুজিবকে অধৈর্য করে তুলেছিল।’ বাংলাদেশ প্রতিদিন কে দেয়া লন্ডনের বাসভবনে টানা দু’ঘণ্টার সাক্ষাৎকারে তৎকালীন ঢাকাস্থ ভারতীয় উপ হাইকমিশনের রাজনৈতিক কর্মকর্তা শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি একথা বলেন।

তিনি বলেন, শেখ মুজিব মনে করছিলেন, ঢাকার কূটনীতিবিদদের সঙ্গে তার আলোচনা আসলে তাকে কোথাও নিয়ে যাচ্ছে না। তাই তিনি তার পথ পরিবর্তন করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি গোপনে সীমান্তবর্তী ভারতের আগরতলায় পাসপোর্ট ছাড়া হাজির হলেন। সেখানে শেখ মুজিব ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন সিংয়ের সঙ্গে কয়েকটি মিটিং করলেন। সেসব মিটিংয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামে ভারতের রাজনৈতিক সমর্থনের আমন্ত্রণ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর কাছে পাঠাতে অনুরোধ করলেন। তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে এটাও জানালেন, ঢাকাস্থ ভারতীয় কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা সাড়া দিতে অনেক বেশি দেরি করছেন, কিন্তু তার হাতে খুব বেশি সময় নেই।

শশাঙ্ক এস ব্যানার্জির মতে, তার মনে হয়েছিল শেখ মুজিব মনে করেছিলেন শচীন সিংয়ের মতো একজন রাজনীতিবিদ হয়তো কূটনীতিবিদের চেয়ে তার কথা ভালোমতো বুঝতে পারবেন এবং নেহেরুকে বোঝাতে পারবেন। আগরতলায় অল্প সময় অপেক্ষা করার পরই মুজিব দিল্লি থেকে সাড়া পেলেন, তাকে বলা হলো; সাড়া দিতে দেরি হওয়ায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী দুঃখিত। তবে নেহেরুর পরামর্শ হচ্ছে শেখ মুজিবের জন্য একটি মাত্র চ্যানেল ব্যবহার করে কাজ করাটা ভালো হবে, আর সেটি হচ্ছে ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশন, আগরতলা নয়। মুজিবকে আরও জানানো হলো, তিনি আগরতলায় থাকতেই তাকে সব ধরনের সমর্থনের সিদ্ধান্ত ঢাকায় পৌঁছে গেছে। শেখ মুজিবের আগরতলা থেকে ফিরে আসার পথেই পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা তার গোপন সফরের খবর পেয়ে যায় এবং দেশে ফেরার পর তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং পরবর্তীতে ৬ দফা নিয়ে তিনি তীব্র জনমত গড়লে তাকে আবার গ্রেফতার করে পরবর্তীতে মামলা দেয়া হয়। যা, ‘রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য’ নামে বা ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে পরিচিত।

শেখ মুজিবের চিঠি নিয়ে নেহেরু তার বাসভবনে সব মুখ্যমন্ত্রী, গভর্নর ও তিন বাহিনী প্রধানকে ডেকে বৈঠক করেছিলেন, সেই বৈঠকে শেখ মুজিবের চিঠি দেখিয়ে তার স্বাধীনতার প্রস্তাব ও ভারতের সহযোগিতার বিষয়টি তুলে ধরে সবার মতামত জানতে চাইলেন। তিনি সবাইকে প্রশ্ন করলেন, আমরা কি সাহায্য করতে পারি? ভারতের সেনাপ্রধান তখন জানতে চাইলেন, আপনি কি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? নেহেরু বললেন, আমি গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। তাই দেশের সব নীতি-নির্ধারকের মতামত চাইছি। তখন ভারত ইয়াসির আরাফাতের প্যালেস্টাইনিদের, আলজেরিয়ায় বেনবেল্লাকে ও দক্ষিণ আফ্রিকার ন্যালসেন মেন্ডেলার জন্য মেডিকেল সাহায্য পাঠাচ্ছেন। নেহেরু জানতে চাইলেন, শেখ মুজিবের স্বাধীনতা-সংগ্রামকে সমর্থন দিলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কি বলবে? তখন অনেকেই উত্তরে জানালেন, সিদ্ধান্ত নিলে কে কি বলল, তাতে যায় আসে না। শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিবকে না বললে অভদ্রতা হবে মনে করে, নেহেরু ছয় মাস সময় নিলেন। অন্যদিকে অধৈর্য শেখ মুজিব ঢাকাস্থ ভারতীয় মিশনে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা মনে করে, এদের দিয়ে কিছু হবে না ভেবে আগরতলা ছুটে গিয়েছিলেন।

পন্ডিত নেহেরু পরবর্তীতে ডেপুটি হাইকমিশনার সৌর্য্য কুমার দেখা করতে গেলে বলেছিলেন, শেখ মুজিবকে জানিয়ে দিতে ভারতও চায় না; কেউ মাথানত করুক, কখনো আমরা এটি বলবও না, আমরা সমবন্ধুত্বে বিশ্বাসী। তবে শেখ মুজিবের স্বাধীনতা-সংগ্রামের রোডম্যাপের সঙ্গে দ্বিমত করে নেহেরু বলেছিলেন, এ সময় স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য অনুকূল নয়। চীনের কাছে অপমাণিত হওয়ার পর ঠিক ওই মুহূর্তে প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশকে সাহায্য করাও ভারতের পক্ষে সম্ভব নয়। মুজিব যদি আসলেই ভারতের কার্যকরী সাহায্য চান, তবে সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তবে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে যে স্বাধীনতা-সংগ্রাম চলছে, তাতে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেহেরু নিয়েছেন। কারণ নেহেরু বুঝতে বিশ্বাস করেন, শেখ মুজিবুর রহমান একজন জাদুকরী গণনেতা এবং তুরস্কের কামাল আতাতুর্কের মতো গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শও বহন করেন।

শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বলেন, এরই মধ্যে ঢাকায় ভারত ও আওয়ামী লীগের দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক তৈরির একটি প্যাকেজ অপেক্ষা করছিল। প্যাকেজটির ভিত্তি ছিল বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে দুদেশের সমমূল্যবোধ ও পারস্পরিক বিশ্বস্ততা, চুক্তিটি একটি রাজনৈতিক নিয়ম-নীতির মতো দেখাচ্ছিল। এখানে আমাকে বলতেই হবে, চুক্তির শর্তগুলো বুঝতে সেগুলো শুধু গোপনীয় সরকারি দলিল হিসেবে বিচার করলে হবে না; এর কোনো কপি আমার কাছে নেই। কিন্তু আমার স্মৃতি থেকে যতটা বিশ্বাসযোগ্যভাবে সম্ভব এগুলো বের করে আনছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ মনে রাখার স্মৃতিশক্তির ওপর বিশ্বাস রেখে শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বলেন, এখানে ভুলের কোনো অবকাশ নেই।

নেহেরু সে সময় শেখ মুজিবকে আরও জানিয়ে দেন তার রোডম্যাপ বাস্তবায়নে কোনো তাড়াহুড়া করা চলবে না। ব্যর্থতা এড়াতে, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকতেই হবে। লন্ডনে গেলে কোনো উদ্দেশ্যই সাধন হবে না। নেতৃত্বের অভাব কোনো সুফল বয়ে আনে না। শেখ মুজিবকে সবচেয়ে উচ্চপর্যায়ে রুখে দাঁড়াবার জন্য উপস্থিত থাকতে হবে। শেখ মুজিবকে আরও পরামর্শ দেওয়া হয়, তিনি যখন গণতন্ত্রের কথা বলছেন তখন তার কয়েক বছর গণমানুষের মধ্যে গণতন্ত্রের ধারণা সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মুক্তির পথে অসংখ্য চড়াই উতরাই থাকবে। সেসব বাধা অতিক্রম করে রাজনৈতিক পদক্ষেপের জন্য ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে পারলেই মুজিব নিজেকে স্বাধীনতার বীর হিসেবে প্রমাণ করতে পারবেন। এমনকি শেখ মুজিবকে বলা হয়, তার সমাবেশে যদি লাখ লাখ মানুষ জমায়েত হয়ে তার কথা শুনতে আসে; তখনই বিশ্ব তাকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সত্যিকারের নায়ক বলে মেনে নেবে। এ কারণে তাকে তার বাক্য বিন্যাসের সর্বোচ্চ ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের দলের আদর্শ ও নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতির জনপ্রিয়তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি সৌভাগ্যবান যে, তার হাতে ইত্তেফাকের মতো বিশ্বস্ত সংবাদপত্র ও মানিক মিঞার মতো সম্পাদক আছেন। তিনি একজন শক্তিমান মুখপাত্র, যিনি ইতিমধ্যেই পূর্বপাকিস্তানে স্বায়ত্তশাসনের সচেতনা তৈরিতে কাজ করছেন। ভারত জানিয়ে দেয়, বিপুলসংখ্যক জনসমর্থন তৈরি হওয়ার পর পূর্ণাঙ্গ কৌশলগত সমর্থন দেওয়ার জন্য তারা তৈরি থাকবে। কিন্তু বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরি করার দায়িত্ব শেখ মুজিব ও তার আওয়ামী লীগের, অন্য কারও নয়।

শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বলেন, শেখ মুজিবুর রহমান একজন দুর্র্ধর্ষ সাহসী রাজনীতিবিদই ছিলেন না; বিচক্ষণ নেতাই ছিলেন; অনন্য সাধারণ সংগঠক ছিলেন। পশ্চিম বঙ্গের একটি দৈনিকের সেøাগান আছে; ভগবান ছাড়া কাউকে ভয় পাই না। তেমনি শেখ মুজিবকে দেখেছি, তিনি আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পেতেন না এবং তিনি তার বিশ্বাস ও লক্ষ্য অর্জনে অমিত সাহসী, বেপরোয়া ও অবিচল ছিলেন। তিনি তার দলকে শক্তিশালী করেছেন, জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করেছেন এবং ইয়াহিয়া খানের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে, একচ্ছত্র বিজয় অর্জন করে বিশ্ববাসীর সামনে বাঙালির একমাত্র নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ৬৩ থেকে ৭১ মাত্র সাত বছরের একটু বেশি সময় নিয়ে স্বাধীনতার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন এবং তিনি জনগণের সামনে এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তিনি জনগণের জন্য, দেশের জন্য জীবন দিতে পারেন বলে বিশ্বস্ততা অর্জন করেছেন। ৬৩ সালের ধারণাগত জায়গা থেকে ভারত ও শেখ মুজিব দুপক্ষই চতুরতার সঙ্গে কাজ করছিল এবং শেখ মুজিব নিজের ক্যারিশমা দেখিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন।

শশাঙ্ক ব্যানার্জি বলেন, চীনের সঙ্গে যুদ্ধে পরাজয়ের বেদনা সইতে না পেরে, ’৬৪ সালে নেহেরু পরলোক গমন করলেও তিনি শেখ মুজিবের স্বাধীনতা-সংগ্রামকে সমর্থন ও সহযোগিতা দানের কথা লিখে রেখে এর যাতে অন্যথা না হয়, সেই মন্তব্য করে গিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় এসে তার পিতার অঙ্গীকার রক্ষা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে বেরিয়ে ’৬৬ সালে তার ছয়দফা প্রস্তাব উত্থাপন করে তিনি ও তার দলকে জনপ্রিয়ই করেননি, জনগণকেও ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন। পাকিস্তানি জেনারেলরাও জেনে গিয়েছিলেন, ছয়দফা দাবি আসলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামো থেকে পূর্ব পাকিস্তানের আলাদা হওয়ার কর্মসূচি। আইয়ুব খান এটিকে স্তব্ধ করতে না পেরে শেখ মুজিবকে রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান বা আগরতলা মামলায় কারাবন্দি করে ফাঁসি দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মুজিব তখন বাঙালি জাতির বিশ্বস্ত নেতা হয়ে ওঠেছেন। তাই শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনে আইয়ুবের পতনই হয়নি; শেখ মুজিবসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তি দিতে হয়। আর সেই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির নয়নের মনিতে পরিণত হন। পাকিস্তানের সামরিক একনায়ক জেনারেল আইয়ুব খান ’৬৯-এর ২৫ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ছয়দফার ভয়ের পরিণতি উচ্চারণ করেছিলেন এভাবে, ‘আমাদের দেশের এই ধ্বংসের ওপর দাঁড়িয়ে এর তত্ত্ববধান করা আমার পক্ষে অসম্ভব। তিনি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের কাছে সেদিন ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। আর ৩১ মার্চ সামরিক শাসক ইয়াহিয়া নিজেকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন।

ব্যানার্জি বলেন, ১৯৬৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আমাকে তার অফিসে ডেকে নিলেন। বললেন, আমাকে বাগদাদে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। আমি উর্দু জানি, আরবিটাও যেন সেখানে গিয়ে শিখে নিই। কিন্তু আমার মূল দায়িত্ব হচ্ছে, শেখ মুজিবের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং আমার ওপর অর্পিত আগের দায়িত্ব সেখানে বসে পালন করা। বাগদাদে স্কুল অব ল্যাঙ্গুগুয়েজ ‘কুলিয়াত আল নুগাত, জামে কি বাগদাদ’-এ আমি ভর্তি হয়ে যাই আরবি শেখার জন্য। প্রিন্সিপাল আমাকে প্রশ্ন করলেন, আমি কলেমা পড়ালে আপনার অসুবিধা হবে? বললাম, কোনো অসুবিধা নেই। আমি সব ধর্মকে সম্মান করি। শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি সেখানে পবিত্র কোরআন শরিফও পাঠ করেছিলেন। তিনি কোরআনের একটি আয়াত আরবীয়দের উচ্চারণে আমাকে শোনালেন, শুনে আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম। তিনি আরও বললেন, তিনি বাগদাদ যাবার এক সপ্তাহ পরই ইরাকের ক্ষমতায় এসেছেন। তার সঙ্গে জীবনে সেই সময়ই একবার একঘণ্টার কূটনৈতিক সৌজন্য সাক্ষাৎ ঘটেছিল। তিনি বললেন, সাদ্দাম হোসেনকে খুব কোমল মনের অমায়িক ভদ্রলোক মনে হয়েছিল। পরে যা শুনেছি, তার সঙ্গে সেই এক ঘণ্টা মিলাতে পারিনি। বাগদাদ থেকে ডিপ্লোমেটিক ব্যাগে তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গোপনীয়ভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। ইন্দিরা গান্ধীর বার্তা পৌঁছে দিতেন। সেখান থেকে ’৭০ সাল পর্যন্ত এই কাজ করে তিনি লন্ডনে বদলি হয়ে আসেন। লন্ডনে এসেও তিনি তার কাজ অব্যাহত রাখেন।

যে কারণে নেহেরু-ইন্দিরা জাদুকরী নেতা বঙ্গবন্ধুর ওপর আস্থা রেখেছিলেন

যে কারণে নেহেরু-ইন্দিরা জাদুকরী নেতা বঙ্গবন্ধুর ওপর আস্থা রেখেছিলেন

সেই সময়ের ঢাকাস্থ ভারতীয় উপহাইকমিশনের পলিটিক্যাল অফিসার শশাঙ্ক এস ব্যানার্জিকে আমি আমার ব্যক্তিগত কৌতূহল থেকে প্রশ্ন করেছিলাম, আপনি কি মনে করেন একাত্তর সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী না হয়ে তাঁর পিতা প-িত জওহরলাল নেহেরু থাকলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে এভাবে সমর্থন ও সহযোগিতা দিতেন? তিনি জানতে চাইলেন, আপনার কী মনে হয়? আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে নিবিড়ভাবে একাত্ম থাকা ভারতীয় কূটনীতিক যিনি আজ অবসরজীবনে বয়সে প্রবীণ, তাঁর সামনে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আমার মনে হয়, ইন্দিরা গান্ধীর মতো তাঁর পিতা নেহেরু এভাবে সহযোগিতা ও সমর্থন দিতেন না। স্মিত হেসে শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন, আপনার ধারণা ভুল। নেহেরু একাত্তরে থাকলেও এই সমর্থন ও সহযোগিতা দিতেন। নেহেরু ’৬২ সালেই বুঝেছিলেন বলে শেখ মুজিবের প্রতি আস্থা রেখেছিলেন। তিনি বলেন, ভারতীয় উপহাইকমিশনের উপপ্রধান সৌর্য্য কুমার দেখা করতে গেলে নেহেরু বলেছিলেন, শেখ মুজিব একজন জাদুকরী গণনেতা, যার দ্বারা সম্ভব তাঁর জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে নেতৃত্বের উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া। নেহেরু চতুর চীনের আক্রমণে পরাজিত হওয়ার শোক সইতে না পেরে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেও শেখ মুজিবের স্বাধীনতা সংগ্রামে সমর্থনদানের যে গাইডলাইন রেখে গিয়েছিলেন, তাঁর কন্যা শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী পিতার সেই নির্দেশ পালন করেছেন মাত্র।

নেহেরু শেখ মুজিবের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও বিপ্লবের ক্ষেত্র তৈরি দেখে যেতে না পারলেও বিশ্বাস করতেন একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানই বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেন এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে নেতৃত্বের যোগ্যতা রাখেন। আর ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতায় আসার পর অবলোকন করেছেন, একজন দুর্ধর্ষ সাহসী নেতা হিসেবে শেখ মুজিব তাঁর স্বাধীনতার সংগ্রামকে কীভাবে ত্বরান্বিত করে তাঁর দলকে জনপ্রিয় ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে সংগ্রামের পথে সফলভাবে ইতি টেনেছেন। পাকিস্তানি জেনারেলদের বা একনায়কদের ঘুম হারাম করে দিয়ে তিনি ছয় দফার ভিত্তিতে স্বায়ত্তশাসনের নামে স্বাধীনতার সংগ্রামকে পূর্ব বাংলায় ছড়িয়ে দিতে সফল হয়েছেন। শেখ মুজিব বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী একজন নেতা হিসেবে নেহেরুর কাছে যেমন গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিলেন; তেমনি ইন্দিরা গান্ধীর কাছেও এই আদর্শের এক সাহসী, জনপ্রিয় বিস্ময়কর নেতা হিসেবে সমাদৃত হয়েছিলেন।

শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বলেন, তিনি বাগদাদ থেকে সত্তর সালে লন্ডন হাইকমিশনে আসার আগে ’৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু কারামুক্ত হয়ে ইয়াহিয়া খানের আমলে লন্ডনে গিয়েছিলেন। ভারতীয় হাইকমিশনে গোয়েন্দা কর্মকর্তা ফণীন্দ্রনাথ ব্যানার্জিকেও ইন্দিরা গান্ধী সামগ্রিক পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু ফণীন্দ্রনাথ ব্যানার্জির সঙ্গে বৈঠক করে স্বাধীনতাযুদ্ধের পরিকল্পনা করেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিংয়েরও পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। রাজনৈতিকভাবে তাঁর প্রশিক্ষিত তরুণরা ভারত থেকে সশস্ত্র যুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে আসবে এমন ব্যবস্থা পাকা করেছিলেন। কিন্তু ইয়াহিয়া খান সাধারণ নির্বাচন দেওয়ায় সেটি স্থগিত হয়ে যায়। শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি বলেন, সে সময় ভারতের কূটনৈতিক মহলে কৌতুকময় গল্প চালু ছিল যে, মিসেস ইন্দিরা গান্ধী তাঁর প্রশংসা করে বলতেন- ব্যানার্জি তো ভালোই করছে। আর ভারতের জেনারেলরা মনে করতেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বোধহয় ফণীন্দ্রনাথ ব্যানার্জির প্রশংসা করছেন। আর তাই তাঁরা তাঁকে একের পর এক প্রমোশন দিতে থাকেন।

ব্যানার্জির ভাষায়, কৌশলগত বিষয় ছাড়াও ইন্দিরা গান্ধী ব্যক্তিগত পর্যায়েও বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীর মমত্ব রাখতেন। বাঙালিদের ভালোবাসতেন এবং বাংলায় কথাও বলতেন। তিনি অক্সফোর্ডের পড়াশোনা শেষ না করে ফিরে গিয়ে পশ্চিম বাংলার শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে বাঙালি সংস্কৃতির প্রবাদপুরুষ, ভারতের শ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যাকে নেহেরুও সম্মান করতেন এবং যিনি প্রিয়দর্শিনী ইন্দিরা নামটি রেখেছিলেন, তাঁর চরণে বসে পড়াশোনা করেছেন। যখন পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের ওপর গণহত্যার প্রতিবাদে রুখে দাঁড়িয়েছিল তখন তার জন্য স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনে এগিয়ে আসাই স্বাভাবিক ছিল। বাংলাদেশের সমর্থনে সামরিক বাহিনীকে সম্পৃক্ত করার বিবেচনা দৃশ্যপটে এসেছে অনেক পরে, প্রায় দ্বিতীয় চিন্তা হিসেবে। এ ছাড়া মিসেস ইন্দিরা গান্ধী এই ঐতিহাসিক সত্য বিশ্বাস করতেন যে, বিপরীত দুটি জাতিকে শুধু একমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাস একত্র করে রাখতে পারে না। যেখানে আদি বাঙালি ও আদি পাঞ্জাবি জনগোষ্ঠী সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক। যেখানে একটি দেশের দুটি বহুজাতিক গোষ্ঠীকে আলাদা করে দিতে পারে, ধর্ম দিয়ে তা এক করে রাখা যায় না। মানুষকে একটি একক রাজনৈতিক ইউনিটে বেঁধে রাখতে ধর্মের ব্যর্থতা আগেই নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছিল যখন ’৪৭ সালে ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি পাকিস্তান চলে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। যদিও উপমহাদেশে মুসলিমদের ভূমি হিসেবে পাকিস্তানের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু একটি সাংস্কৃতিক দল হিসেবে ভারতীয় মুসলিমরা ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক ভারতে থেকে যেতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছিলেন। একাত্তর সালের গণহত্যা ছিল মুসলমানের ওপর মুসলমানের আঘাত। শশাঙ্ক এস ব্যানার্জি আরও বলেন, ভারতের গোয়েন্দা ব্যুরোতে কিংবদন্তিতুল্য ভোলানাথ মল্লিক, যিনি ভি এন মল্লিক নামে পরিচিত তিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর সিনিয়র উপদেষ্টাদের মধ্যে প্রথম ভারতের প্রতি পাকিস্তানের চিরস্থায়ী শত্রুতার নীতির বিষয়টি আঁচ করতে পারেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে, কাশ্মীরে আদিবাসী দখলদারিত্ব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা ধ্বংস করতে সুদীর্ঘ ও টেকসই কর্মসূচির সূত্রপাত মাত্র।

পাকিস্তানের চ্যালেঞ্জের ভিত্তি ছিল বিশ্বব্যাপী ধর্মীয় চরমপন্থা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম। অন্যদিকে ভারতের জবাব ছিল স্থানীয় যার ভিত্তি গান্ধীজির অহিংসা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আদর্শ। প্রধানমন্ত্রীর কাছে আধা-অফিশিয়াল নোটে গোয়েন্দাপ্রধান ভি এন মল্লিক লিখেছিলেন, ‘পাকিস্তান যত দিন পর্যন্ত বর্তমান অবস্থায় থাকবে, তত দিন সে ভারতের আঞ্চলিক মর্যাদার প্রেক্ষিতে নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একমাত্র ভয়ঙ্কর হুমকি।’ তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘পরিবর্তিত সময়ের সঙ্গে নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়ে নয়াদিল্লির উচিত, পাকিস্তানের প্রশাসনিক, জাতিগত বিভক্তির কথা মাথায় রাখা।’ কোনো ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী এ পরামর্শ ভুলে যাননি। পূর্ব বাংলার বাঙালিদের ওপর পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বর্বর হামলা ভি এন মল্লিকের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হয়েছিল। আর এ ঘটনা ভারতকে টেনে এনেছিল বাংলাদেশ সংকটে। এটি ভারতের জন্য শত্রুকে দুর্বল করে দেওয়ার সুযোগ করে দেয়। শত্রুর ঘৃণ্য বিভক্তকারী আদর্শ যার নাম দ্বিজাতিতত্ত্ব বা টু নেশন থিওরি, যা ’৪৭ সালে ধর্মের ওপর ভিত্তি করে ভারতকে বিভক্ত করেছিল তা ধ্বংস করে দেয়।

যাক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ঠিক তখন পাকিস্তানের সামরিক একনায়ক জেনারেল ইয়াহিয়া খান ’৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর থেকে ১৭ জানুয়ারি, ’৭১ পর্যন্ত সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে বসলেন। জেনারেল ইয়াহিয়া যে ভুলের চোরাবালিতে বসে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিলেন, আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অনেকের সংশয় ও আপত্তি সত্ত্বেও প্রবল আত্মবিশ্বাস নিয়ে নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ কেনো গ্রহণ করলেন, ভোটের ফলাফলই তা প্রমাণ করে দিয়েছে। এ কথা সত্য, নির্বাচন হয়েছিল অবাধ, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সংগত; যার সমালোচনা কেউ করতে পারেনি। আর পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ১৬৯টি আসনের মধ্যে শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তা ও তাঁর অঙ্গীকারের প্রতি জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থনে আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করেছিল। বঙ্গবন্ধু জানতেন তাঁর জনগণের নাড়ি-নক্ষত্র ও অন্তরের খবর। পূর্ব বাংলায় যে তাঁর একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এটি বিচক্ষণ শেখ মুজিব জেনে গেলেও নির্বোধ জেনারেল ইয়াহিয়া খান বুঝতে পারেননি পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানি জেনারেল ও তাদের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পতন ঘটে গেছে।

এই নির্বাচন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের মানুষের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত করে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।’ আর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘তোমরা ঐক্য দাও, আমি স্বাধীনতা দেব।’ এই নির্বাচনী ফলাফলের মধ্য দিয়ে শুধু ভারতকেই নয়; পশ্চিমকেও তিনি জানিয়ে দিলেন- বাঙালি জনগণ তাঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ এবং তিনিই তাদের নেতা। স্বায়ত্তশাসন থেকে শোষণমুক্তিতে তাঁর বক্তব্য নিয়ে এসে জানিয়ে দিলেন তিনি যা চাইছেন এখন তা-ই হবে।

রাজনৈতিক পরিস্থিতি তীব্রতার সঙ্গে সংগ্রামের পরবর্তী পর্যায়ে এগিয়ে গেলে বঙ্গবন্ধু তার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তিনি অনুভব করেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান এতটাই সুদৃঢ় যে, তিনি গান্ধীজির ’৪২ সালের ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলননের মতো কিছু একটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। ১ মার্চ, ’৭১ ইয়াহিয়া খান যখন ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করলেন তখন হোটেল পূর্বাণীতে বঙ্গবন্ধু তাঁর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করছিলেন। এর আগে তিনি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শপথ অনুষ্ঠানে ছয় দফা থেকে একচুল না নড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। সেদিন তাঁকে ঘিরে গোটা পূর্ব বাংলা বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠল। ২ থেকে ৬ মার্চ, ’৭১ প্রশাসনিক কর্মকান্ডে জাতীয় হরতালের ডাক দিয়েছিলেন। এটি একটি গণরাজনৈতিক কর্মসূচি হওয়ার কথা ছিল; যার পরিপূর্ণ সফলতার জন্য তিনি জাতীয় ঐক্যের ডাক দেন। তাঁর নির্দেশ তখন অক্ষরে অক্ষরে কার্যকর হচ্ছিল। আর পাকিস্তানি জেনারেলদের শাসনের পতন ঘণ্টা বেজেছিল। পাঁচ দিন ধরে পূর্ব পাকিস্তানের সবকিছু বন্ধ হয়ে পড়ে। ৩ মার্চ পল্টনে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ছাত্রলীগের মহাসমাবেশে ৭ কোটি বাঙালিকে তাঁর নির্দেশ জানিয়ে দেন। অসহযোগ কর্মসূচির ডাক দেন এবং তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালনের মাধ্যমে তাঁর প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ ঘটায়। সারা দেশে কালো পতাকা উঠতে থাকে, জয় বাংলা ও শেখ মুজিবের নামে স্লোগানে সেøাগানে এক অকল্পনীয় পরিবেশ তৈরি করল। আর মুজিব ঘোষণা করলেন, বাঙালিদের আর শোষণ-শাসনে দমিয়ে রাখা যাবে না। কারণ তারা মনস্থির করেছে স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হবে। ৬ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খান একদিকে ২৫ মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকলেন, অন্যদিকে বেলুচিস্তানের কসাই নামে নিন্দিত লে. জেনারেল টিক্কা খানকে তিনি পূর্ব বাংলার গভর্নর নিয়োগ করলেন। দূরদর্শী বঙ্গবন্ধু দেখলেন, জাতীয় পরিষদের এই অধিবেশন একটা মুখোশমাত্র। তিনি ইয়াহিয়া খানের আদেশ যেমন অগ্রাহ্য করলেন, তেমনি তাঁর স্বাধীনতার লক্ষ্য স্থির রেখে সব কৌশল গ্রহণ করলেন।

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৭ মার্চ ইতিহাসের বৃহত্তর জনসমুদ্রে ১৮ মিনিটের এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন, যার মধ্য দিয়ে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা ও জাতিকে এক মোহনায় মিলিত করে প্রস্তুতির নির্দেশ দিলেন। জনগণ সেদিন তাঁকে দেখার এবং তাঁর কথা শোনার জন্য সমবেত হয়েছিল। ততক্ষণে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে মানুষ। গমগমে আবহাওয়ায় তীক্ষè ও আবেগময়, অন্যদিকে চাতুর্যেভরা ভাষণে বঙ্গবন্ধু এটাও বললেন, গণহত্যা বন্ধ করতে হবে, মার্শাল ল তুলে নিতে হবে, জনগণের প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা দিতে হবে। বজ্রকণ্ঠ নামে এই ভাষণ স্বাধীনতার ডাক হিসেবে ছড়িয়ে পড়ায় জেনারেল টিক্কা খান সরাসরি সম্প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। যদিও পরদিন এটি প্রচার করতে বাধ্য হন। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে এটি রোজ প্রচারিত হয়। ৭ থেকে ২৫ মার্চ, ’৭১ ঝড়ের আগে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছিল। তিনি আলোচনার দরজা যেমন খুলে রাখলেন, তেমনি তাঁর প্রস্তুতিও নিতে থাকলেন। তিনি অনেককে বলছিলেন, যে কোনো সময় তাঁকে আটক করে করাচিতে নিয়ে যাবে, এমনকি ফাঁসিও দিতে পারে। মুক্তির সংগ্রাম চূড়ান্ত পর্যায়ে এগিয়ে যাওয়ার পথে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী বাঙালিদের ওপর গণহত্যা চালায়। চতুরতার সঙ্গে তিনি যে ফাঁদ পেতেছিলেন, বেকুব ইয়াহিয়া খান সেই ফাঁদে পা দিয়ে সামরিক আক্রমণ চালিয়ে গণহত্যা শুরু করলেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী যুদ্ধ শুরু করে। আওয়ামী লীগ সরকারও গঠন করে। রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বাঙালির ঘুরে দাঁড়ানোর দৃশ্যে বিশ্ব বিস্মিত আর রাওয়ালপিন্ডির সামরিক কর্মকর্তারা হয়েছিলেন হতবাক। পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হাতে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার আগে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে তিনি সরাসরি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি জানতেন, তাঁর এই স্বাধীনতার ঘোষণা সামরিক কর্তৃপক্ষ তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ হিসেবে নেবে। তিনি বলেছিলেন, জীবিত অবস্থায় ফেরত আসার সম্ভাবনা নেই। দেশদ্রোহের দায়ে তাঁর ফাঁসি হয়ে যাবে। তাই তাঁর আবেদন ছিল, স্বাধীনতা অর্জন না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ যেন চালিয়ে যাওয়া হয়। তাঁকে গ্রেফতার করে সামরিক বিমানে করে করাচিতে গৃহবন্দী করে রাখা হয়। পরে মিয়ানওয়ালি কারাগারে বন্দী হিসেবে সবার থেকে আলাদা রাখা হয়। মুক্তির পর বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তাঁকে ছোট্ট একটি কক্ষে আটকে রাখা হয়, কোনো পত্রিকা, বই পড়তে দেওয়া হয়নি। ঘরে কোনো টিভি ছিল না। কারও সঙ্গে কথাও বলতে পারতেন না। তাঁর কক্ষের ছাদ থেকে একটি ফাঁসির দড়ি ঝুলত এবং ঠিক বাইরেই একটি কবর খুঁড়ে রাখত তাঁকে বোঝাতে যে, তাঁর সময় শেষ হয়ে এসেছে।

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0