শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ কৃষক লীগ

শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ কৃষক লীগ
সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল
বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে সব আন্দোলনের সূতিকাগার ছিল বাংলার কৃষক সমাজ। এরই ধারাবাহিকতায় কৃষকদের অধিকার রক্ষায় ও কৃষির উন্নয়নের জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১৯ এপ্রিল প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষক লীগ। “বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও ‘কৃষক বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’ মূলমন্ত্রে সারা দেশে কৃষক সমাজকে সংগঠিত করে কৃষক-জনতার সার্বিক উন্নয়ন সাধন করাই কৃষক লীগের মূল নীতি।" আজ সংগঠনটির ৪৮ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ কৃষক লীগ।
বঙ্গবন্ধু সরাসরি কৃষক সংগঠনে জড়িত না থাকলেও প্রকাশিত 'সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই তার কৃষি ও কৃষক আন্দোলনের নানা বৈচিত্র্যময় দিক। অবশ্য তৎকালিন সময়ের বাস্তবতায় মূল সংগঠন আওয়ামী লীগই কৃষক শ্রমিকের দাবী নিয়ে সর্বদা রাজনীতির মাঠে থেকেছে। বিধায় কৃষি কিংবা কৃষক সম্পর্কিত আলাদাভাবে সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভাবিত হয়নি। কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রীয় কাজে হাত দেওয়ার পর প্রথম কয়েকটি চ্যলেঞ্জের মধ্যে ছিল ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের বাস্তবায়ন। তিনি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীকে খাওয়াতে হলে এমন সব পদক্ষেপ নিতে হবে যার মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থার একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটে। তাই স্বাধীনতা অর্জনের পর কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে পল্লীর জনগণের আর্থসামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে তিনি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হাতে নিয়ে ছিলেন। কৃষকদের অধিকার রক্ষায় ও কৃষির উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ কৃষক লীগ। যেন রাষ্ট্রিয় কাজ করতে যেয়ে আওয়ামী লীগ যেন কৃষকের কাছ থেকে দূরে সরে না যায়। এর সাথে কৃষি গ্রাজুয়েটদের সরকারি চাকুরিতে তিনি প্রথম শ্রেণীর মর্যাদা দিয়ে গেছেন। তিনি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছিলেন বর্ধিত জনগোষ্ঠীকে খাওয়াতে হলে উৎপাদন বাড়াতে হবে। আর উৎপাদন বাড়াতে হলে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে। এর জন্য দক্ষ কৃষি বিজ্ঞানী গড়ে তুলতে হবে। সুতরাং কৃষি গ্রাজুয়েটদের মর্যাদার আসনে না বসালে এ সেক্টরে মেধার সমাবেশ ঘটবে না। আর মেধার সমাবেশ না ঘটাতে পারলে উন্নত প্রযুক্তিরও উদ্ভাবন সম্ভব হবে না। বর্তমানে উন্নত জাতের ধান বীজসহ বিভিন্ন ধরনের প্রধান ও অপ্রধান শস্যের বীজ উদ্ভাবিত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। উন্নত ফসল উৎপাদন কৌশল আবিষ্কৃত হচ্ছে এর সবই বঙ্গবন্ধুর দেখা স্বপ্নের ফসল। শুধু রাজনৈতিক নয় কৃষকদের মাঝে এসব উদ্ভাবিত নতুন নতুন প্রযুক্তিগুলো পৌঁছে দেয়ার জন্য তৎকালীন সময়ে কৃষি বিভাগ কর্তৃক পরিচালিত তৃণমূল পর্যায়ে কৃষকদের সংগঠন গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধকরণ । এসমস্ত কর্মকান্ডও সুনিপুণ ভাবে পরিচালনার জন্য গড়ে তুলেছিলেন বাংলাদেশ কৃষক লীগ।
মানব সভ্যতার ভিত্তি হলো কৃষি, তার প্রকৃত কারিগর হচ্ছে কৃষক। প্রকৃতির সকল প্রতিকূলতাকে মোকাবিলা করে তাকে আয়ত্বে এনে আজকে যে বিপুল প্রাচুর্য্য ও সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে তার কৃতিত্ব মূলত কৃষকের। জন্মগত ভাবে কৃষকের ইতিহাস হলো লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস। এ লড়াইয়ে কৃষক কখনও পরাজিত হয়েছে, তারপর আবার উঠে দাঁড়িয়েছে, লড়াই করেছে, সংগ্রাম থেমে থাকে নাই। ইংরেজদের ক্ষমতা দখলের পর এদেশে জমিদাররা খাজনা আদায়ের জন্য কৃষকদের ওপর চরম নিপীড়ন চাপিয়ে দেয়, উৎপাদিত পণ্য কম দামে কিনতে কিংবা কেড়ে নিতে থাকে। উৎপাদক কৃষক ও কারিগরদের ওপর ইংরেজ শাসকরা নানা করের বোঝা চাপাতে থাকে। ইংরেজ বেনিয়াদের চাহিদা মতো ফসল ও অন্যান্য জিনিস উৎপাদন করতে কৃষক ও কারিগরদের বাধ্য করা হয়। কৃষক, কারিগর ও মেহনতি মানুষের শ্রমে উৎপাদিত ফসল ও ধন-সম্পদ কেন্দ্রীভূত হতে থাকে জমিদার-জায়গীরদার ধনীদের ঘরে আর ইংরেজ বণিকদের কুঠিতে। এই অন্যায়-জুলুমের বিরুদ্ধে কৃষক ও কারিগররা রুখে দাঁড়িয়েছে। এদেশের কৃষকরা ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট কৃত্রিম রাষ্ট্র পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের বিরুদ্ধে লড়েছে। আজও স্বাধীন বাংলাদেশে কৃষকরা লড়ছে, জীবন দিচ্ছে। এসব লড়াই সংগ্রামের মধ্যে ফকির মজনু শাহ্’র নেতৃত্বে সন্ন্যাসী বিদ্রোহ (১৭৬৩-১৮০০), তাতীদের বিদ্রোহ (১৭৭০-১৮০০), চাকমা বিদ্রোহ (১৭৭৬-১৭৮৭), নীল চাষিদের বিদ্রোহ (১৭৭৬-১৮০০), রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩), যশোর-খুলনা ও বীরভূমের প্রজা বিদ্রোহ (১৭৮৪-১৭৯৬), মেদেনীপুরে নায়েক বিদ্রোহ (১৮০৬-১৮১৬), ফরাজী বিদ্রোহ (১৮৩৮-১৮৪৭), সাওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-১৮৫৭), গারো বিদ্রোহ (১৮৩১-১৮৮২), সিরাজগঞ্জের কৃষক বিদ্রোহ (১৮৭২-১৮৭৩), তিতুমীরের বিদ্রোহ (১৮৩১), নাচোনা বিদ্রোহ, তেভাগার কৃষক আন্দোলন (১৯৪৭-১৯৪৯), টঙ্ক বিদ্রোহ (১৯৪৮), নানকার বিদ্রোহ (১৯৩৮-১৯৪৮) অন্যতম। এছাড়াও নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জ ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকারের লড়াই, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষকদের চিংড়ি ঘেরবিরোধী সংগ্রাম, রাজশাহীর বিল কালাই আন্দোলন, উত্তরবঙ্গে আখ চাষি ও তামাক চাষিদের সংগ্রাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জে কানসাট বিদ্রোহ। গাইবান্ধায় সারের দাবিতে কৃষক বিদ্রোহ (১৯৯৫) এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষক-শ্রমিকের প্রতিরোধের ইতিহাস। প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন আন্দোলনে সৃষ্টি হয়েছিল কৃষক লীগের গৌরবময় সংগ্রামের ইতিহাস ।ইতিহাসে দেখা যায়, মুঘল আমলে আকবরের শাসনকালে ১৫৬২ ও ১৫৭৭ সালেও কৃষকরা বিদ্রোহ করেছিল। বাংলা ও ভারতবর্ষের অধিকাংশ কৃষক আন্দোলন, সংগ্রাম ও বিদ্রোহ শাসকগোষ্ঠী হত্যা-সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে দমন করেছে। আবার কোথাও কোথাও দাবি মানতে বাধ্য হয়েছে। এসব আন্দোলন-সংগ্রামের অভিঘাতেই ইংরেজরা যেমন ভারতবর্ষ ছাড়তে বাধ্য হয়, পশ্চিম পাকিস্তানী উপনিবেশিক শক্তির হাত থেকে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। বাংলার স্বাধীনতা এক বড় অংশের দাবিদার বাংলার কৃষক। একারনে সংগঠনটি "কৃষকের কল্যাণে সময়োপযোগী, বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে অবিচল নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে নিজেকে আত্মনিয়োগ করা।” এই মূল লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে।
করোনার কারনে আজকের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে কৃষক লীগকে এগিয়ে আসতে হবে, উৎপাদিত শস্য সংগ্রহ এখন কৃষি শ্রমিকের সংকট। এর প্রধান কারণ করনা আক্রান্তের ভয়। কৃষি শ্রমিকেরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পরিবহন সংকটের কারণে যেতে পারছে না। এছাড়া কৃষি শ্রমিকদের মধ্যে পূর্বের তুলনায় কৃষিক্ষেত্রে কাজ করার মানসিকতা ও কমেছে। শ্রমজীবীরা ইতিমধ্যে সরকারের কাছ থেকে খাদ্য সহায়তা পাচ্ছে এবং নগদ অর্থ সহায়তা পেতে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে কৃষি শ্রমিকের প্রাপ্যতা কিছুটা কমতে পারে। সারাদেশে এবার ধানের বাম্পার ফলন হতে যাচ্ছে। সুতরাং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে সময়ের প্রয়োজনে শ্রমিকের সহজলভ্যতা ছাড়া ধান ঘরে তোলা সম্ভব না। সে ক্ষেত্রে কিছু বিষয় কৃষক লীগ এগিয়ে আসতে পারে। প্রথমতঃ স্থানীয় কৃষি শ্রমিকদের তালিকা করে কাজের জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত রাখতে হবে এবং প্রথম থেকেই তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে করোনা ঝুঁকি প্রতিরোধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়তঃ প্রয়োজনে স্বেচ্ছাসেবী শ্রমিক ব্যবহার করতে হবে। বঙ্গবন্ধুর ডাকে যেমন ১৯৭১ সালে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছে এবার প্রধানমন্ত্রীর ডাকে কাচি নিয়ে কৃষক লীগ প্রতিদিন কিছুটা সময় শারীরিক পরিশ্রম করে কৃষকদের সহায়তা করতে পারে। তৃতীয়তঃ যে এলাকায় কৃষি শ্রমিক বেশি আছে সেখান থেকে কৃষক লীগ জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে অন্য এলাকায় শ্রমিক প্রেরণ করতে পারে। এক্ষেত্রে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় সংক্রমণের ঝুঁকি কিছুটা হলেও কমবে। চতুর্থতঃ প্রকৃত কৃষি শ্রমিকের তালিকা প্রণয়ন করে তার এনআইডি কার্ড নাম্বারই মোবাইল ব্যাংকিং একাউন্ট নাম্বার করে তাদেরকে আর্থিক প্রণোদনা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে। যাতে কৃষি শ্রমিকের মজুরিসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় নির্বাহ করতে পারে। কারণ ইতিমধ্যেই তাদের অন্যান্য উৎস থেকে আয় বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষি প্রধান বংলাদেশের শ্রমশক্তির প্রায় ৪৭ শতাংশ এখনও কৃষির ওপর নির্ভরশীল এবং এই শ্রমশক্তির সিংহভাগই প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে বিস্তৃত, তাই দেশের অর্থনীতির সার্বিক উন্নয়নে গ্রামীণ শ্রমশক্তির আর্থসামাজিক উন্নয়ন অত্যাবশ্যক। দেশের কৃষি সেক্টরের উন্নয়নের মাধ্যমেই গ্রামীণ আর্থসামাজিক উন্নয়নের পাশাপাশি মানুষের কর্মসংস্থানও পূর্বের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক প্রণীত রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ বাস্তবায়নে কৃষি উন্নয়নে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও গ্রামীণ উন্নয়নের পাশাপাশি দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিটি মানুষকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে কৃষক লীগকে বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে। উৎপাদনশীলতা দ্বিগুণ, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও পুষ্টি নিশ্চিত করণ; প্রতিকূলতা সহিষ্ণু নতুন নতুন জাত ও কৃষি নীতি বাস্তবায়ন করে উৎপাদনশীলতা ও উৎপাদন বৃদ্ধি; চরাঞ্চলে ও পাহাড়ে টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ; সরিষা, বাদাম, তিল ও অন্যান্য তৈল জাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিকরণ; দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ও হাওরাঞ্চলে ভাসমান সবজি চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ; রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার কমানো নিশ্চিতকরণ; মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ; কৃষি জমির সর্বোত্তম/সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতকরণ এবং পতিত জমি শতভাগ চাষের আওতায় আনয়ন , মোবাইলসহ ই-কৃষির মাধ্যমে কৃষকদের তথ্য প্রাপ্তির ব্যবস্থা জোরদারকরণ; সমন্বিত কৃষি যান্ত্রিকীকরণ; কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সাথে তা প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য কৃষি পণ্যভিত্তিক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প গড়ে তোলা। এই সব কর্মকান্ডে কৃষক লীগকে ভূমিকা রাখতে হবে।
কৃষিতে অর্জিত সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে এবং লাগসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ কৃষকের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কৃষক লীগের নিরলস প্রচেষ্টা অব্যহত থাকুক। ‘কৃষক বাঁচাও, দেশ বাঁচাও’- স্লোগান সামনে নিয়ে এগিয় চলুক সংগঠনটি কৃষক লীগের জন্মদিনে এই প্রত্যাশায় থাকলাম
টীম সদস্য, নির্বাচন পরিচালনা কমিটি
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

What's Your Reaction?

like
3
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
2