শুদ্ধতম বাঙালি, শ্রেষ্ঠতম নেতা

শুদ্ধতম বাঙালি, শ্রেষ্ঠতম নেতা

হারুন হাবীব

শুদ্ধতম বাঙালি, শ্রেষ্ঠতম নেতা

শেখ মুজিবুর রহমান, বঙ্গবন্ধু নামে উচ্চারিত না হলে যে নাম অসম্পূর্ণ থেকে যায়, তেমনি একটি নাম। এ নামকে জোর করে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, মুছে দেওয়াও সম্ভব হয় না কখনো। যে নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের, তার সঙ্গে মিশে আছে বাংলাদেশ; মিশে আছে সব ধর্ম, সব বর্ণের মানুষের কল্যাণে আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার ফসলবাহী প্রথম বাঙালি রাষ্ট্র পত্তনের ইতিহাস। হাজার বছরের যে বাঙালি, কখনো বিচ্ছিন্ন, কখনো পরাজিত, কখনো লড়াকু, জাতিসত্তা অন্বেষণে বিভ্রান্ত কিংবা বিপর্যস্ত, সেই বাঙালির জন্য প্রথম স্বাধীন ও আধুনিক রাষ্ট্রের স্থপতির নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এ নাম স্বমহিমায় দীপ্যমান।

ভারত উপমহাদেশের সীমানায় আকাশচুম্বী সফলতার সম্ভার নিয়ে জন্মেছিলেন শেখ মুজিব। দেশপ্রেম, সাহস ও ত্যাগের মহিমায় অবিভক্ত পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরাচার, ধর্মীয় মিথ্যাচার, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে তিনি তাঁর মানুষকে অধিকার সচেতন করে তুলেছিলেন; জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে প্রায় একচ্ছত্রভাবে বেগবান ও অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছিলেন এবং মুসলমান প্রধান একটি জনপদে জনগণতান্ত্রিক স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সফলতা দেখিয়েছিলেন। গোটা বিশ্বের মুসলমান প্রধান দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সে কারণেই এক ব্যতিক্রম; যে ব্যতিক্রমের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অসামান্য রাজনীতিবিদ তিনি; কীর্তিমান এই রাজনীতির কবি একাত্ম হয়ে উঠেছিলেন বাঙালি মানস ও বঙ্গের মাটির সঙ্গে, এই জনপদের দীর্ঘ লালিত আশা ও আকাক্সক্ষার সঙ্গে। দুর্ভাগ্য যে, সে ইতিহাস কেউ না কেউ ঢাকতে চায়; বিশেষত ধর্মীয় লেবাসে যারা টুকরো করতে চায় বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তাকে। কারণ তিনি জেগে উঠলেই উগ্র ধর্মবাদী তত্ত্ববাদীদের অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে; হত্যাকান্ডের বহু যুগ পরও সে কারণে আমাদের সেক্যুলার সমাজশক্তির মুখ্য প্রাণপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান।

সাহিত্য, শিল্প ও দর্শনে বাঙালিকে প্রথম বিশ্বনন্দিত করেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, আরেক বাঙালি, হয়ে ওঠেন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ বিরোধী স্বাধীনতাকামী সর্বভারতীয় গণমানুষের নন্দিত মহানায়ক। চিত্তরঞ্জন দাস, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এই কীর্তিমানরাও হয়ে ওঠেন গণনন্দিত মহানায়ক। কিন্তু প্রায় সবাইকে ছাপিয়ে নিজের জায়গা করে নেন ইতিহাসে টুঙ্গিপাড়ার শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি বাঙালির ইতিহাসে সর্বপ্রথম স্বাধীন ও আধুনিক রাষ্ট্রের স্থপতি হওয়ার সাফল্য অর্জন করেন। বিস্ময়কর যে, বঙ্গের এই অকৃত্রিম নেতাকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গ্রেফতার করে হাজার মাইল দূরের ভূখন্ডে কারারুদ্ধ রাখার পরও তাঁরই নেতৃত্বে, তাঁরই নামে পরিচালিত হয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ- যা এক বিস্ময়কর ব্যতিক্রম!

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এক জাতি হয়েও বাঙালি কখনো এক ও একাত্ম হতে পারেনি। স্বশাসিত হওয়ার সৌভাগ্য বড় বেশি জোটেনি বাঙালির জীবনে। ধর্মীয় কুসংস্কার, সংকট, ষড়যন্ত্র, লোভ-দাসত্ব এসব বারবার আঘাত হেনেছে বাঙালিকে। সে কারণে স্বশাসিত হওয়ার স্বপ্ন ম্লান হয়েছে বারংবারের দুর্ভাগ্যে। শেখ মুজিবুর রহমানই প্রথম সবল-সফল মহান রাজনীতি- পুরুষ, যিনি তাঁর অনন্য সাধারণ নেতৃত্বগুণে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনাকে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত করেন; সব গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে, এক দেহ, এক আত্মায় সমর্পিত করে জাতিকে জাতীয় রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেন। এক অসামান্য কৃতিত্ব নিঃসন্দেহে।

শেখ মুজিব ছিলেন এমনই রাজনীতি-পুরুষ যার কর্মতৎপরতা কখনো গোপন পথে বিচরণ করেনি। তিনি এমনই গণতান্ত্রিক বিপ্লবী, যিনি সশস্ত্র জনযুদ্ধের পথে জাতিকে এগিয়ে নিতেও শান্তিপূর্ণ নিয়মতান্ত্রিকতায় বিশ্বাসী ছিলেন, যা তাঁকে অনন্য মর্যাদায় সমাসীন করেছে। যার ফলে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বলে চিত্রিত করা সম্ভব হয়নি কারও পক্ষে।

শুদ্ধতম বাঙালি এবং বিশুদ্ধ আধুনিক মানুষ শেখ মুজিব, ধর্মকে যিনি ব্যক্তিজীবনের অনস্বীকার্য ধরেও তার অনধিকার প্রবেশ রুদ্ধ করেছেন রাষ্ট্রজীবনে, সঙ্গতভাবেই। যুক্ত পাকিস্তানের ২৩ বছরের ধর্ম ও সেনার যূথবদ্ধ অপশাসনের মোট ১৩ বছর থাকেন তিনি কারারুদ্ধ। শাসককুলের চরম নির্যাতনী আচরণেও তিনি ভাঙেননি, মোচড়াননি, পরাজিত হননি। নেতাজি সুভাষ বসুর পর তাই হয়ে ওঠেন তিনি বাংলার অবিভাজিত নিষ্কলুস যৌবন-শক্তির প্রতীক; মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানের প্রাণের মানুষ, মনের মানুষ; সব ধর্ম সব বর্ণের অধিকার বঞ্চিত মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ও সাহসের প্রতীক। আমার উপলব্ধিতে শেখ মুজিব ধারণ করেছিলেন তিতুমীরের অমিত বিক্রম, মহাত্মা গান্ধীর অহিংস শান্তিবাদ, রবীন্দ্রনাথের প্রেম দর্শন এবং নেতাজি সুভাষের অপ্রতিরুদ্ধ দেশপ্রেম ও সাহস।

তাঁর ব্যক্তিত্বের অসামান্য সম্মোহনী শক্তি, ত্যাগ ও আদর্শনিষ্ঠা তাঁকে পরিণত করেছিল ইতিহাসের অলঙ্ঘনীয় গণদেবতায়। এমন অনন্য সাধারণ জনপ্রিয়তা আর অন্য কোনো নেতার ভাগ্যে জোটেনি এই বঙ্গে। বিদেশিরা তাঁকে বলেছে ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’। কিন্তু শেখ মুজিব একই সঙ্গে ছিলেন ‘পোয়েট অব হিউম্যানিটি অ্যান্ড জাস্টিস’। তিনি তাঁর জাতিকে আত্মসচেতন করেছেন, নিয়মতান্ত্রিকতার পথে সেই জাতীয়তাকে সশস্ত্র করেছেন এবং গণমানুষের আশা-আকাক্সক্ষাকে পৌঁছে দিয়েছেন গ্রামগঞ্জ, শহর, নগর ও বন্দরে। এ অর্জন বিস্ময়কর।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়, প্রায় সপরিবারে। এ হত্যাকান্ড ইতিহাসের বর্বরতম অধ্যায় সন্দেহ নেই তাতে। এর মধ্য দিয়ে নবীন রাষ্ট্রের স্বাভাবিক ইতিহাসের যাত্রাপথ রুদ্ধ করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গের ইতিহাসে এ যাবৎকালের শ্রেষ্ঠতম রাজনীতি পুরুষ সন্দেহ নেই এ উচ্চারণে। মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র পর্বে তিনি সশরীরে উপস্থিত থাকতে পারেননি সত্য, কিন্তু তিনিই ছিলেন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এবং যুদ্ধ পরিচালনাকারী সরকারের সব নীতি ও প্রেরণার উৎস। ইতিহাস সচেতন মানুষমাত্রই স্বীকার করবেন, শেখ মুজিবের হত্যাকান্ড তাঁর সরকারের সংকট বা সীমাবদ্ধতার মধ্যে আবদ্ধ ছিল না। এই হত্যাকান্ড ছিল জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনকের বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রথম প্রত্যক্ষ প্রতিশোধ। নতুন রাষ্ট্রের মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় তাঁকে হত্যা করে ষড়যন্ত্রকারীরা সদ্য-স্বাধীন বাংলাদেশের স্থিতিশীলতাই কেবল বিনষ্ট করতে চায়নি, একই সঙ্গে তারা গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিল বাঙালির ইতিহাসের অমর সব গৌরবগাথা; পাল্টে দিতে চেয়েছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের সব সাফল্য ও অর্জন। সফলও হয়েছিল তারা, আমার ধারণা, যতটা চেয়েছিল তার চাইতেও বেশি! নিঃসন্দেহে সে ছিল এক বড় ট্র্যাজেডি।

ওই হত্যা, অগণিত মৃত্যু দিয়ে কেনা স্বাধীনতাকে ভূলুণ্ঠিত করেছিল; ওই হত্যা স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মাথায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিল পরিত্যক্ত সেই পাকিস্তানি রাজনীতি ধারা; আবারও সেই সংস্কৃতি, ধর্মের চাতুরী দিয়ে, অসাংবিধানিক শাসন দিয়ে, মুক্তচিন্তার সমাজ-প্রগতিকে বিনাশ করার সেই সর্বনাশা সংস্কৃতি- যাকে পরাস্ত করা হয়েছিল ১৯৭১ এর ঐতিহাসিক গণযুদ্ধের মধ্য দিয়ে!

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হত্যাকান্ড ছিল সামরিক ও সাম্প্রদায়িক আধিপত্যবাদী পাকিস্তান রাষ্ট্রকে বিচূর্ণ করে জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যক্ষ প্রতিশোধ। ওই হত্যাকান্ড ছিল রাজনৈতিক ইসলাম ও ধর্মীয় সন্ত্রাসবাদীদের পরাজয়ের পাল্টা আঘাত, যার ফলে রাষ্ট্রবিরোধীরা আবারও ক্ষমতায় আসে, পরিকল্পিত ধারায় পুনর্বাসিত হয় যুদ্ধাপরাধীরা; যে ধারা অব্যাহত থাকে কয়েক যুগ ধরে। দুর্ভাগ্যজনক সেই ধারায় নতুন প্রজন্মের মনে বিকৃত ইতিহাস প্রবেশ করানো হয়, নতুন-নবীনদের শেকড়শূন্য করার চেষ্টা হয়! আমার দৃঢ় উপলব্ধি যে, পঁচাত্তরের রক্তপাত ও ইত্যাকার দানবীয় আধিপত্বের পরও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক কিংবা মহান মুক্তিযুদ্ধের মৃত্যু ঘটানো সম্ভব হয়নি। হবেও না কখনো। কারণ আত্মরক্ষার তাগিদে বাঙালিকে যেমন বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে আঁকড়ে ধরতে হবে, তেমনি অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তাকে প্রতিরক্ষা দিতে, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে ছুঁয়েই বাঙালিকে প্রতিরোধ আন্দোলনে নামতে হবে আজ এবং আগামীকাল।

বাংলাদেশের মাটিতে মৌলবাদী ও পাকিস্তানপন্থিদের তৎপরতা যত বাড়বে, যত ওরা শক্তি সঞ্চয় করবে, ততই দ্রুত আশ্রয় খুঁজতে হবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কাছে, একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাছে। কারণ তিনি জাতীয় অস্তিত্ব ও আত্মশক্তির অমোঘ অধিনায়ক। আমি বিশ্বাসে দৃঢ় যে, রাজনীতির নানামুখী ধারা বহন করেও, আত্মরক্ষার তাগিদেই বাঙালিকে ফিরে যেতে হবে অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনায় এবং বারবার। আত্মতুষ্টির সুযোগ কোথায়?

শেখ মুজিবুর রহমানকে চিরজাগ্রত মহানায়ক। টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে শুয়েও তিনি সর্বাধিনায়ক; বেঁচে থাকার, সামনে এগোবার মূল অনুপ্রেরণা। মনে রাখা উচিত যে, যে অসহিষ্ণুতা বাংলাদেশকে আজও ক্ষতবিক্ষত করে চলেছে, স্বাধীনতা ও অসাম্প্রদায়িকতার যে শত্রুরা আজ সংঘবদ্ধ, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে কেবলই জাতিসত্তার অবিভাজিত বোধ, যার নেতৃত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে।

বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ সমার্থক। বঙ্গবন্ধু আজ কোনো দলের নন; তিনি জাতির এবং এটিও বিশ্বাস করতে রাজি নই যে, ওই মহাপ্রাণকে শ্রদ্ধা জানাতে বিশেষ দলভুক্ত হওয়ার প্রয়োজন আছে। বাংলাদেশ নামে যার আস্থা, হৃদয়ে যার বাংলাদেশ, তারই কাছে তিনি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও অহংকারের। যে বাঙালির হৃদয়ে দাসত্ব নেই, পরাধীনতা ও উগ্র-ধর্মীয় উন্মাদনা নেই, সে বাঙালিকেই গ্রহণ করতে হবে শেখ মুজিবুর রহমানকে; এ নামের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষক।

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0