শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব

শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব
  • অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলমগীর কবীর:
    বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বাংলাদেশ ইত্যাদি প্রত্যেকটি শব্দ আজ সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো একটির সঙ্গে আরেকটি খুবই নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। তার মধ্যে প্রথম শব্দ বঙ্গবন্ধুই অন্য সবগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে। এদিকে সন্তান ও পিতার সম্পর্ক যেমন, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের সাথে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ- এ দুটি নাম, দুটি শব্দ একে অপরের পরিপূরক, যা আজ ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যে মহানায়ক, তিনি বঙ্গবন্ধু, আমাদের জাতির পিতা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্রষ্টা। তার দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, কারাবাস, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগের পথ ধরেই বাঙালি তাদের নিজ আবাসভূমি প্রতিষ্ঠা করেছিল। তার নেতৃত্বেই বাঙালি জাতি অনুপ্রাণিত ও ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ তথা পাকিস্তানি আধিপত্যবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার নাগপাশ থেকে মুক্ত করেছে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিকে। তাই “সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ বাঙালি” হিসেবে বিশ্বব্যাপী নন্দিত এক চরিত্র আমাদের বঙ্গবন্ধু।শতাব্দীর এই মহানায়ক ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার পাটগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা শেখ লুৎফর রহমান গোপালগঞ্জ দায়রা আদালতের হিসাব সংরক্ষণের কাজ করতেন এবং মা সায়েরা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। চার কন্যা এবং দুই পুত্রের সংসারে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান। ১৯২৭ সালে বঙ্গবন্ধু গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ১৯২৯ সালে গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে ভর্তি হন এবং এখানেই ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। চোখে জটিল রোগের সার্জারির কারণে প্রায় চার বছর পর ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জে মাথুরানাথ ইনস্টিটিউট মিশন স্কুলে সপ্তম শ্রেনীতে ভর্তি হন এবং এখান থেকেই ১৯৪২ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। ১৯৪৪ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে আই.এ এবং একই কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে বি.এ পাশ করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন অধ্যয়নের জন্য ভর্তি হন তিনি। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি দাওয়ার প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ঔদাসীন্যের বিরুদ্ধে তাদের বিক্ষোভ প্রদর্শনে উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে তাঁকে ১৯৪৯ সালের প্রথমদিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করা হয়।

নির্যাতিত ও নিপীড়িত মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধু যে আমৃত্যু সংগ্রাম করেছেন তা বাঙালি জাতির ইতিহাস থেকে দিবালোকের মত স্পষ্ট। তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন অর্থাৎ ১৪ বছর কারাভোগ করেছেন। এর মধ্যে স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে সাত দিন এবং বাকি ৪ হাজার ৬৭৫ দিন তিনি কারাভোগ করেন পাকিস্তান সরকারের আমলে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সমাজ, রাষ্ট্র যেখানেই এদেশের মানুষ নির্যাতন, নিপীড়ন, শোষণ ও বঞ্চনার শিকার হয়েছেন সেখানেই তার প্রতিবাদ করেছেন বঙ্গবন্ধু।এসব প্রতিবাদের কারণে ব্যক্তি মুজিব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সবচেয়ে বেশি। তাঁর উপর অমানসিক নির্যাতন হয়েছে, হামলা, মামলা, হুলিয়া নিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছেন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, তাঁর সন্তানেরা পিতার স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এত বেশি মানুষের কাজে ব্যস্ত থাকতেন যে তাঁর স্ত্রী, সন্তানেরা তাঁর সাথে বসে একবেলা খাবার খাওয়ার সময় পেতেন না। পরিবার পরিজনের সাথে সময় কাঠানো তাঁর হয়ে উঠতো না, সারাক্ষণ সাধারণ মানুষের কল্যাণ ও মুক্তির জন্য কাজ করেছেন।

মার্কিন কূটনৈতিক অ্যার্চার ব্ল্যাড তার গ্রন্থে লিখেছেন, শেখ মুজিব ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের “মুকুটহীন সম্রাট।” তবে এই মুকুটহীন সম্রাট হয়ে ওঠার পেছনের ইতিহাসটা সবাই গভীরভাবে লক্ষ্য করে থাকবেন। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাকে খুবই ভাবাতো। তিনি দুঃখী গরিবের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য দিন রাত কাজ করতেন।

ইতিহাসে ৬দফাই হলো প্রকৃতপক্ষে বাংলার মুক্তির সনদ এবং বঙ্গবন্ধু শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছেন অহিংস পন্থায় বাঙালির অধিকার অর্জনের এ আন্দোলনে সফল হতে। তাই দেখা যায়, ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর ক্ষমতা তাদের না দেয়ার পরও তিনি সহিংসতায় না গিয়ে ভুট্টোর ক্ষমতাভাগের দাবির তীব্র সমালোচনা করেন। মুক্তিযুদ্ধে বীর বাঙালিকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য এবং দিক নির্দেশনা মূলকভাবে আকার-ইঙ্গিতে স্বাধীনতা ঘোষণার জন্য ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। যে ভাষণের কারণে সারা বিশ্বে বঙ্গবন্ধুকে রাজনীতির কবি (পয়েট অব পলিটিকস) এবং ভাষণটিকে বাঙালির জীবনের এক অনন্য সাধারণ মানব মুক্তির কবিতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।এই ভাষণটিই আজ স্বীকৃতি পেয়েছে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেইজে।

১৯৬৩ এর ২৮ আগস্ট বর্ণবাদী আন্দোলনের নেতা মার্টিন লুথার কিং এর সেই ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম’ মহাকাব্যের পর আরো একটি মহাকাব্য রচিত হয় ১৯৭১ এর ৭ মার্চ রেসকোর্সের ময়দানে। সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য তাঁর ভাষণ সর্বশ্রেষ্ঠ মহাকাব্য রচনার মাহেন্দ্রক্ষণ যা দিয়েছে আমাদের লাল সবুজের পতাকার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা।

ইতিহাসের এই মহানায়ককে মাত্র ৫৫ বছর বয়সে ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ভোরে ষড়যন্ত্রকারীরা (কিছু বিপথগামী সেনা অফিসার) বঙ্গবন্ধুর বাসভবন আক্রমণ করে এবং হত্যা করেন। নিচতলার অভ্যর্থনা এলাকায় পুত্র শেখ কামালকে এবং সামরিক প্রধান কর্নেল জামিলকে গুলি করে মারা হয়।

১৫ আগস্ট ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম এই হত্যাকাণ্ডের আরও শিকার হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিনী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, ছেলে শেখ জামাল, শিশুপুত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধূ দেশবরেণ্য সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মণি ও তার অন্তঃসত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও তার মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য কৃষক নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছোট মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, কনিষ্ঠ শিশুপুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত আবদুলাহ বাবু, ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত, আবদুল নঈম খান রিন্টু।

এছাড়াও আওয়ামী লীগের চারজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য (জাতীয় চারনেতা)তাজউদ্দীন আহমেদ, এম মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আ হ ম কামরুজ্জামানকে আটক করা হয়। তিন মাস পরে ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বরে তাঁদের সকলকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে হত্যা করা হয়। বিদেশে থাকায় ঐদিন প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শেখ রেহানা।

১৭ই মার্চ শোষিত, বঞ্চিত, ভাগ্যাহত ও দুঃখী মানুষের বন্ধু জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন। ২০২০-২০২১ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও মুজিববর্ষ বাঙ্গালি জাতির গৌরব ও সম্মানের বছর। এ বছরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ পৌঁছে যাবে অন্য উচ্চতায়। সালাম, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি জাতির পিতা, ইতিহাসের মহানায়ক শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি যিনি ছিলেন শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের পক্ষে।

লেখক:পরিচালক, ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র ও সাবেক প্রভোস্ট, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0