মহান মে দিবসঃ বঙ্গবন্ধু পরিষদ ঢাকা মহানগর আহবায়কের কথা

মহান মে দিবসঃ বঙ্গবন্ধু পরিষদ ঢাকা মহানগর আহবায়কের কথা

‘শ্রমিক-মালিক ঐক্য গড়ি, সোনার বাংলা গড়ে তুলি’। এ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আজ দেশে পালিত হচ্ছে মহান মে দিবস। আশাকরি শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থসংরক্ষণ ও সার্বিক জীবনমান উন্নয়নে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, মালিকপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহন করবেন। বিশেষ করে গার্মেন্টস মালিকরা এই করোনা পরিস্থিতিতে অন্ততপক্ষে নিজ শ্রমিকদের স্বাস্থ্যগত বিষয় সম্পর্কে নজর রাখবেন।

শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে শ্রমনীতি প্রণয়ন করেছিলেন। তিনি পরিত্যক্ত কলকারখানা জাতীয়করণ করে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছিলেন। শ্রমিদের প্রকৃত মানুষ উল্লেখ করে তিনি মাঝে মাঝেই বলতেন, “ ব্ল্যাকমার্কেটিং কারা করে? যাদের পেটের মধ্যে দুই কলম বিদ্যা রয়েছে তারাই ব্ল্যাকমার্কেটিং করে। স্মাগলিং কারা করে? যারা বেশি লেখাপড়া করেছে তারাই করে। হাইজাকিং কারা করে? যারা বেশি লেখাপড়া শিখছে তারাই করে। ইন্টারন্যাশনাল স্মাগলিং তারাই করে। বিদেশে টাকা রাখে তারাই। আমরা যারা শিক্ষিত, আমরা যারা বুদ্বিমান, ওষুধের মধ্যে ভেজাল দিয়ে বিষাক্ত করে মানুষকে খাওয়াই তারাই। নিশ্চয়ই গ্রামের লোক এসব পারে না, নিশ্চয়ই আমার কৃষক ভাইরা পারে না। নিশ্চয়ই আমার শ্রমিক ভাইরা পারে না। ” শুধু তাইই নয় শ্রমিকের সম্মান বৃদ্ধির জন্য সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনে দেয় ওই গরিব কৃষক, আপনার মাইনে দেয় ওই গরিব শ্রমিক, আপনার সংসার চলে ওই টাকায়, আমি গাড়ি চড়ি ওই টাকায়, ওদের সম্মান করে কথা বলেন, ওদের ইজ্জত করে কথা বলেন, ওরাই মালিক।’ ১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত ন্যাম শীর্ষ সম্মেলনে সারা পৃথিবীর শোষিত মানুষের পক্ষে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত, একদিকে শোষক, আর অন্যদিকে শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে। প্রিয় শ্রমিক ভাইয়েরা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন। মহান মে দিবসের ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন পূরণে আপনাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি। বঙ্গবন্ধু শ্রমিক ভাই সবসময় স্মরণ করিয়ে দিতেন, গাই বাচিয়ে দুধ খেতে হবে অর্থাৎ প্রতিষ্ঠান বাচাতে হবে। তাহলেই তো শ্রমিক ভাইরা বাচতে পারবে। আজ বিশ্বব্যাপি নভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাস সংক্রমণের ভয়াল থাবা আঘাত এনেছে। ফলে গভীর সংকটে পড়েছে শিল্প-প্রতিষ্ঠানসহ দেশের শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ। এ পরিস্থিতিতে আমি সরকারের সাথে শিল্পের মালিক ও সমাজের বিত্তবানদেরকে শ্রমিকের পাশে দাড়ানোর আহবান জানাচ্ছি।

শ্রমজীবী ও মেহনতি ভাইয়েরা আপনারাই হচ্ছেন দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। আপনাদের অক্লান্ত পরিশ্রমের মধ্যেই নিহিত রয়েছে দেশের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন তথা ‘রূপকল্প-২০২১ ও ২০৪১’ বাস্তবায়নে শ্রমজীবী মানুষের ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের সমান্তরালে বাড়ছে শিল্প-প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানার সংখ্যা। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছে বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ। দেশের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এসব শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য মজুরি প্রদান, দক্ষতাবৃদ্ধি, সুন্দর ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণসহ সার্বিক কল্যাণ সাধন খুবই জরুরি। বর্তমান শ্রমিকবান্ধব সরকার এ লক্ষ্যে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, শিশুশ্রম বন্ধ, নারী শ্রমিক ও কর্মচারীদের জন্য মাতৃত্বকালীন ছুটির সময় বৃদ্ধি, কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিরাপত্তাসহ শ্রমিকের স্বাস্থ্যসম্মত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

শ্রমিক ভাইয়েরা মনে রাখবেন, মে দিবস কেবল অধিকার আদায়ের দিন নয়, নিজেদের আত্মবিশ্লেষণ ও সম্মিলিতভাবে দেশ গড়ার অঙ্গীকারও বটে। শ্রমিক-মালিক পারস্পরিক সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক শ্রমক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা রক্ষা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে ইনশাআল্লাহ্‌ ।

আমি বিশ্বাস করি, মহান মে দিবসের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শ্রমিক এবং মালিক পরস্পর সুসম্পর্ক বজায় রেখে জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে নিবেদিত হবেন। বৈশ্বিক এ মহামারির মধ্যে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মোতাবেক মালিকরা প্রয়োজনে কারখানা খোলা রাখবে। তবে অবশ্যই কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন করতে হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দফতর, সংস্থা যেমন-শিল্প পুলিশ, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নিতে হবে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধে সরকার অবশ্যই সফল হবে ইনশাআল্লাহ্‌ ।

শ্রমিক ভাইয়েরা মে দিবসের চেতনাকে ধারন করে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন থাকবেন। মনেরাইখেন আজ এই করোনা পরিস্থিতিতে আপনাদের সমিতিও পাশে ছিল না। মে দিবস উপলক্ষে যেসমস্ত কোম্পানি তাদের প্রচারের জন্য গিফট , অর্থ দেওয়ার জন্য আপনাদের কাছে ঘুরে বেড়াতো তারাও আপনাদের পাশে নেই। আল্লাহুর রহমতে সেই বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনাই আপনাদের পাশে ছিল।

আমি ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে যে শ্রমিক ভাই-বোনেরা ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করেছেন তাদের স্মৃতির প্রতিও গভীর শ্রদ্ধা জানাই। পরিশেষে মে দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশসহ বিশ্বের সব শ্রমজীবী মানুষকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন  ।

What's Your Reaction?

like
2
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0