মুজিববর্ষ-বাকশাল দর্শন

মুজিববর্ষ-বাকশাল দর্শন

মোস্তফা কামাল পাশা

রবিবার , ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ at ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ‘মুজিববর্ষ’ দরজার কড়া নাড়ছে। ক্ষণগণনা শেষ হবে ১৭ মার্চ। মুজিববর্ষ শুরুর আগেই বঙ্গবন্ধু জপমালার কোরাস চলছে দেশজুড়ে। চারপাশেই বঙ্গবন্ধু শুধুই বঙ্গবন্ধু! মাফিয়া কর্পোরেট, আর্থিক ও ব্যাঙ্কিং খাতের বর্ষপঞ্জি, বিলবোর্ড, সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দরপত্রের শিরোনাম থেকে শুরু করে কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। কে বঙ্গবন্ধুর খাঁটি অনুসারী আর কেইবা ভেজাল বাছাই করারও কেউ নেই! এটা জাতির জন্য শুভ না অশুভ লক্ষ্মণ বলাই মুশকিল! অস্বাভাবিক এক অবস্থা! অথচ, কিছু বিদেশি অর্ডারি কাজ করতে গিয়ে চমকে উঠার মত তথ্য-উপাত্ত পেয়েছি। সব উন্মোচন অসম্ভব। শুধু এক চিলতে নমুনা উপহার দেব। বঙ্গবন্ধুর নামে সবচে’ বড় সুবিধাভোগী, বঙ্গবন্ধুর দলের বড় বড় পদাধিকারী, সরকারি দায়িত্বের উঁচু অবস্থানে যারা আছেন, তাদের ৮৫% বঙ্গবন্ধুর যুগান্তকারী আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক দর্শন ‘বাকশাল’ সম্পর্কে কিছুই জানেন না। ভাসা ভাসা জানেন ০২%। কিছুটা জানেন ৫%! আর জেনেও লুকিয়ে রাখতে চান ৮%! বঙ্গবন্ধু এবং জননেত্রী শেখ হাসিনা এবং বঙ্গবন্ধু পরিবার নিয়ে যারা টানা আবেগের ফেনায় সাঁতার কাটছেন, ভাসছেন, নাচছেন, বৈষয়িক ফায়দা লুঠছেন ইচ্ছেমতন। তাদের ০১%ও বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী বা কারাগারের রোজনামচা পড়েন নি। অথচ বই দুটো সংগ্রহে আছে উধৃত নানা গ্রুপের ৪৫%এর হাতে! এখানেই নমুনা জরিপের বিষয়টা ইতি টানছি। দুঃখজনক, জরিপ কাজে যে স্যাম্পলগুলো বাছাই করা হয়েছে, তারা প্রত্যেকে সমাজ ও দেশের আলোকিত প্রতিনিধি এবং রাজনীতি ও নানা গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরের নামীদামি জন! সামান্য নমুনা থেকে বুঝে নিন, আমরা কোথায়?
বাকশাল দর্শনের ওপর সামান্য আলোকপাত করে অন্য প্রসঙ্গে মোড় বদলাবো। সবাই জানেন, আজকের জ্ঞানবিমুখ,জগাখিচুড়ি মাফিয়া কর্পোরেট ও আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য কারা দায়ী। আসল খলনায়কইবা কে? এর পুরো দায় চাপে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্বপ্নের পোলাও গিলানোর ঢঙ্কা বাদক জাসদ এবং সিরাজুল আলম খান নামের কাপালিক দাদার। দেশে উগ্র জঙ্গিবাদ, রগকাটা জামাত বা তথাকথিত বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ উত্থানের বীজতলা তৈরির হোতাও এই চক্র। নেপথ্যে থেকে বঙ্গবন্ধুর সমান্তরালে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র তথা জাতির বিকল্প জনক হওয়ার স্বপ্নের ফেরি তাকে দেশ ও জাতিকে সর্বনাশের অন্ধকারে ঠেলে দিতে প্ররোচিত করে! সদ্য স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুননির্মাণে যখন সবার আগে দরকার ছিল জাতীয় ঐক্য। ঐক্যের ইস্পাত দৃঢ় ভিত গড়তে বঙ্গবন্ধু দেশ পুনর্গঠনে যখন মনোযোগ দেন, তখনি তথাকথিত মেধাবী দাবিদার ছাত্রলীগের একটি অংশ নিয়ে কাপালিক জোব্বাদাদা জাসদ এর জন্ম দেন’ ৭২ সালের শেষদিকে। জাসদের মূল শক্তিকেন্দ্র ছিল গর্তে লুকিয়ে থাকা যুদ্ধাপরাধী আল বদর, রাজাকার, জামাত, মুসলিম লীগের পতিত সশস্ত্র এজেন্ট বাহিনী। এই সূত্রে জাসদ এর ঘাড়ে চাপে পরাজিত পাকি আইএসআই ও সিআইএ এজেন্টরা। গর্তে লুকানো উগ্র সামপ্রদায়িক যুদ্ধাপরাধী চক্রই ছিল জাসদ এর মূল ভারকেন্দ্র। এদের প্ররোচনায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে স্বাধীন দেশের জন্মের পর একদিনের জন্যও বঙ্গবন্ধুকে শান্তিতে দেশ পরিচালনার সুযোগ দেয়নি জাসদ। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের হাওয়াই ফেনায় দেশ ডুবিয়ে দেয় তারা! পাশাপাশি সশস্ত্র গণবাহিনী গঠন করে প্রতিদিনই খুন, গুম, পাটের গুদামে আগুন, থানা লুঠ, আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী খুণের মৃত্যু উৎসবে মেতে উঠে জাসদ। পুরো দেশে নৈরাজ্য-অরাজকতা তৈরি করে ঘোলাজলে মাছ শিকারের ক্ষেত্র তৈরি করা হয় ‘৭৪ এর কৃত্রিম দুর্ভিক্ষের মাধ্যমে। কিসিঞ্জার তখন সরাসরি সিআইএ ও আইএসআই’র মাধ্যমে বিপুল অর্থায়ন করে জাসদকে। খাদ্যবাহী দু’টো জাহাজ আটকে দিয়ে ভুলপথে নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষে মারা যায়, বহু মানুষ। বঙ্গবন্ধুকে জনবিচ্ছিন্ন করে ছুঁড়ে ফেলতে জাসদ এর মুখপত্র দৈনিক গণকন্ঠ ও কিছু উগ্রপন্থী চিনা বামধারার মিডিয়া জন অসন্তোষের বারুদ ঘষতে থাকে টানা।
অবস্থা বুঝতে পেরে বঙ্গবন্ধু ‘৭৫ এর শুরুতে অসাধারণ এক আর্থ -সামাজিক রাজনৈতিক দর্শন উপহার দেন। যার নাম ‘বাকশাল’ [বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ]। নাম রাজনৈতিক হলেও এটা আসলে এক যুগান্তকারী অর্থনৈতিক দর্শন। বাকশাল কাঠামোয় দেশে প্রতিটি মানুষের জন্য সাংবিধানিক অঙ্গীকার অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বাসস্থানের পূর্ণ নিশ্চয়তার ব্যবস্থা ছিল। দেশে গ্রাম শহরের বিভাজন রেখা মুছে ফেলে প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পাঁচ মৌলিক সুবিধা পৌঁছে দেয়া ছিল বাকশাল এর মূল অঙ্গীকার। গ্রামকে ঘিরেই গড়ে উঠত নগর। সমবায় ভিত্তিক কৃষি ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় কোন মানুষের গরীব থাকার সুযোগ ছিলনা। শিল্প সেক্টরের শ্রমিকেরাও ন্যূনতম পারিশ্রমিকের পাশাপাশি উৎপাদনের ১০/২০% পর্যন্ত লভ্যাংশ ভোগ করতেন। রাজনীতিতে টাকার খেলার কোন সুযোগই ছিলনা। যে কেউ ভোটে দঁড়াতে পারতেন। স্থানীয় জনগণই প্রাথমিক ভোটে প্রার্থী বাছাই করতেন। প্রার্থীর নির্বাচনী সব খরচ রাষ্ট্রের, ব্যাক্তির নয়। জনগণ পছন্দমত তাদের প্রতিনিধি বেছে নিতেন গোপন ব্যালটের মাধ্যমে। যোগ্য ও মেধাবীরা প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতায় মেধা চর্চার সুযোগ পেতেন। বাকশাল এর অর্থনৈতিক বিন্যাস এমন ছিল, কারো পক্ষে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার কোন পথ খোলা ছিলনা। মাফিয়া কর্পোরেট বা হাজার এমনকী শত কোটিপতি হওয়াও ছিল দিবাস্বপ্নের মত অলিক। ব্যাঙ্কখেলাপি বলে কোন শব্দই থাকতোনা। বিদেশে লক্ষ হাজার টাকা কেন, দশটাকা পাচারেরও সুযোগ ছিলনা। খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, অধ্যাপক আবু সাইয়িদসহ আরো ক’জন লেখক বাকশাল দর্শনের উপর চমৎকার বই লিখেছেন। আগ্রহীরা পড়লে বুঝতে পারবেন বঙ্গবন্ধুর বাকশাল বাংলার মাটি ও মানুষের জন্য কতোবড় উপহার ছিল। এটা বঙ্গবন্ধুর নিজস্ব উদ্ভাবন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন জাতীয় ঐক্য ও সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়তে হলে বাকশাল দর্শন বাস্তবায়ন ছাড়া কোন বিকল্প ছিলনা-নেইও। কিন্তু পারেন নি, ঘরের শত্রু বিভীষণ চক্র তাঁকে গোষ্ঠীশুদ্ধ নির্মূল করে দেয়।
মুজিববর্ষের স্লোগান ও অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হলে চিহ্নিত এবং পোশাক পাল্টানো পুরানো ও নতুন শত্রুদের চিনে রাখাও জরুরি। পাশাপাশি বেশি বেশি বঙ্গবন্ধু পাঠ, পাড়ায় পাড়ায় বঙ্গবন্ধু চর্চাকেন্দ্র খোলা ও স্কুলিং এখন সময়ের দাবি। নাহলে স্রোতের তোড়ে ক্ষমতার উজানে ভেসে আসা পরগাছা ও পুরানো শত্রুদের চেনা সম্ভব হবেনা কোনমতেই। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে, আমাদের চোখে এখন প্রাপ্তির ঘোরে স্থায়ী ছানি পড়ে গেছে! ছানি কাটাতে দেরি হলে লাভের গুড় পিপড়ের পেটে যাবে।
লেখক : সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
1
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0