ভাষা আন্দোলন ও শেখ মুজিব

ভাষা আন্দোলন ও শেখ মুজিব

ভাষা আন্দোলন বাঙালি জাতির সংগ্রামী ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠার এ আন্দোলনে তৎকালীন ছাত্র-যুব নেতাসহ অনেকে নানাভাবে ভূমিকা রেখেছেন। বুকের রক্ত দিয়ে ইতিহাস হয়ে রয়েছেন সালাম জব্বার, রফিক, বরকতসহ অনেকে। এ আন্দোলনের সূচনাকাল থেকে পরিণতি পর্যন্ত অন্য অনেকের ভূমিকার কথা যেভাবে বিভিন্ন জনের লেখায় বা স্মৃতিচারণে উঠে আসে সেভাবে ঊঠে আসে না সমকালীন অন্যতম ছাত্র ও যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকার কথা। কেউ কেউ বলতে চেষ্টা করেন, ‘শেখ মুজিব তো তখন জেলে ছিলেন, তিনি আন্দোলনে থাকবেন কী করে’! অথচ ভাষা আন্দোলনের সূচনাকালে বিভিন্ন স্থানে মিছিল-সমাবেশের ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ও সাধারণ ধর্মঘট চলাকালে পুলিশের হাতে প্রথম যাঁরা গ্রেপ্তার হন তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

মূলত, ১৯৪৮ সালেই পাকিস্তানিরা বাঙালিদের জাতীয়তাবোধের উন্মেষ রোধের সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের অংশ হিসেবে ভাষার ওপর আঘাত হেনে বাঙালির চেতনা ধ্বংস করার অপচেষ্টা চালায়। সমগ্র পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬.৪০ ভাগ ছিল বাংলা ভাষাভাষী। দ্বিতীয় স্থানে ছিল পাঞ্জাবি ভাষাভাষী-২৮.৫৫ ভাগ এবং পঞ্চম স্থানে ছিল উর্দু ভাষাভাষী মাত্র ৩.২৭ ভাগ। (ড. মো. মাহবুবুর রহমান, সপ্তম মূদ্রণ, পৃ-৮৬) অথচ সেই সংখ্যালঘু মানুষের ভাষা উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতির প্রতিক্রিয়ার কথা সামান্যটুকুই না ভেবে। ৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এক সমাবেশে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোনো ভাষা নয়।’ এ ব্যাপারে ভিন্ন মত প্রকাশকারীদের তিনি ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। জিন্নাহ তাঁর স্বৈরাচারী চরিত্রের প্রকাশ ঘটিয়ে আরও বলেন, তিনি কোনো শত্রুকে এমনকি সে যদি মুসলমানও হয়, সহ্য করবেন না। আন্দোলনকারীদের তিনি পঞ্চম বাহিনীরূপে অভিহিত করেন। ওই সভাতেই জিন্নাহ’র বক্তব্যের প্রতিবাদে ‘না-না’ ধ্বনি উচ্চারিত হয়। ২৪ মার্চ কার্জন হলে এক সমাবর্তন অনুষ্ঠানেও জিন্নাহ যখন একই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করেন, সেখানেও ছাত্র নেতৃবৃন্দ ‘না-না’ ধ্বনির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানান।

অবশ্য বাংলা ভাষা আন্দোলনের বীজ রোপিত হয় আরও আগে। ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি করাচিতে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। সেখানে কথা বলার সুযোগ রাখা হয় কেবল উর্দু এবং ইংরেজিতে। কিন্তু কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধি শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উদর্ুু এবং ইংরেজির সাথে বাংলা ভাষাকে গণপরিষদের অন্যতম ভাষারূপে সরকারি স্বীকৃতির দাবি তোলেন। তাঁর এ দাবির বিরোধিতা করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, পূর্ববাংলার মুসলিম লীগ প্রতিনিধি প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দিন ও গণপরিষদের সহসভাপতি মৌলবি তমিজউদ্দিন খান প্রমুখ। তারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষারূপে গ্রহণের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। ২৩ বছর পর ১৯৭১ এর ২৫ মার্চের দিকে কুমিল্লায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত হন শ্রী ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। অন্য এক সূত্রে জানা যায়, ২৯ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর লোকেরা বাসভবন থেকে তাঁকে উঠিয়ে নেওয়ার পর আর হদিস মেলেনি তাঁর।

ভাষা নিয়ে মুসলিম লীগ নেতাদের ষড়যন্ত্র, প্রতিবাদ, আন্দোলন-সংগঠন এবং এতে ধীরেন্দ্রনাথসহ নিজের ভূমিকার প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে শেখ মুজিব লেখেন, ‘ফেব্রুয়ারি ৮ হবে, ১৯৪৮ সাল। করাচিতে পাকিস্তান সংবিধান সভার (কন্সটিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলি) বৈঠক হচ্ছিল। সেখানে রাষ্ট্রভাষা কি হবে সেই বিষয়ও আলোচনা চলছিল। মুসিলম লীগ নেতারা উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষপাতী। পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ লীগ সদস্যেরও সেই মত। কুমিল্লার কংগ্রেস সদস্য বাবু ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত দাবি করলেন বাংলা ভাষাকেও রাষ্ট্রভাষা করা হোক। কারণ, পাকিস্তানের সংখ্যাগুরুর ভাষা হল বাংলা। মুসলিম লীগ সদস্যরা কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। আমরা দেখলাম, বিরাট ষড়যন্ত্র চলছে বাংলাকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিস এর প্রতিবাদ করল এবং দাবি করল, বাংলা ও উর্দু দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। আমরা সভা করে প্রতিবাদ শুরু করলাম। এই সময় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ও তমদ্দুন মজলিস যুক্তভাবে সর্বদলীয় সভা আহ্বান করে একটা “রাষ্ট্রভাষা বাংলা সংগ্রাম পরিষদ” গঠন করল। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কিছু শাখা জেলায় ও মহকুমায় করা হয়েছে। তমদ্দুন মজলিস একটা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান যার নেতা ছিলেন অধ্যাপক আবুল কাশেম সাহেব। এদিকে পুরানা লীগ কর্মীদের পক্ষ থেকে জনাব কামরুদ্দিন সাহেব, শামসুল হক সাহেব ও অনেকে সংগ্রাম পরিষদে যোগদান করলেন। সভায় ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চকে “বাংলা ভাষা দাবি” দিবস ঘোষণা করা হল। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম। আমি ফরিদপুর, যশোর হয়ে দৌলতপুর, খুলনা ও বরিশালে ছাত্রসভা করে ঐ তারিখের তিন দিন পুর্বে ঢাকায় ফিরে এলাম। দৌলতপুরে মুসলিম লীগ সমর্থক ছাত্ররা আমার সভায় গোলমাল করার চেষ্টা করলে খুব মারপিট হয়, কয়েকজন জখমও হয়। এরা সভা ভাঙতে পারে নাই, আমি শেষ পর্যন্ত বক্তৃতা করলাম। এ সময় জনাব আবদুস সবুর খান আমাদের সমর্থন করেছিলেন। বরিশালের জনাব মহিউদ্দিন আহমদ তখন নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সদস্য, মুসলিম লীগ ও সরকারের পুরা সমর্থক। কাজী বাহাউদ্দিন আহমদ আমাদের দলের নেতা ছিলেন। আমি কলেজেই সভা করেছিলাম। মহিউদ্দিন সাহেব বাধা দিতে চেষ্টা করেন নাই। ঢাকায় ফিরে এলাম। রাতে কাজ ভাগ হল-কে কোথায় থাকব এবং কে কোথায় পিকেটিং করার ভার নেব। সামান্য কিছু সংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছাড়া শতকরা নব্বই ভাগ ছাত্র এই আন্দোলনে যোগদান করল। জগন্নাথ কলেজ, মিটফোর্ড, মেডিকেল স্কুল, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ বিশেষ করে সক্রিয় অংশগ্রহণ করল। মুসলিম লীগ ভাড়াটিয়া গুন্ডা লেলিয়ে দিল আমাদের উপর। অধিকাংশ লোককে আমাদের বিরুদ্ধে করে ফেলল। পুরান ঢাকার জায়গায় ছাত্রদের মারপিটও করল। আর আমরা পাকিস্তান ধ্বংস করতে চাই- এই কথা বুঝাবার চেষ্টা করল।’

ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলে ফরিদপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সাপ্তাহিক গোপন প্রতিবেদনে। ‘সিক্রেট ডক্যুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বইয়ের উদ্বৃতি দিয়ে ড. শামসুজ্জামান খান লিখেছেন, ‘৪ মার্চ ১৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম স্টুডেন্ট লিগের অস্থায়ী সাংগঠনিক কমিটির পক্ষে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিসংবলিত এক লিফলেটে স্বাক্ষর করেন। এবং ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে এবং সচিবালয়ে ছাত্র বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়ে তিনিসহ কতেক ছাত্র গ্রেপ্তার হন। এ সম্পর্কে গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে ১৬-৩-৪৮-এ গোপালগঞ্জে সর্বাত্মক হরতাল ডাকা হয়। বিকেলে এস এন একাডেমি এবং এম এন ইন্সটিটিউটের ৪০০ ছাত্র শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে, “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”, “নাজিমউদ্দিন নিপাত যাক”, “মুজিবকে মুক্তি দাও”, “অন্য গ্রেপ্তারকারীদের মুক্তি দাও” ইত্যাদি স্লোগান দেয়।’ উল্লেখ্য, ঢাকায় এর আগের দিন মুজিবসহ গ্রেপ্তারকৃত নেতাদের মুক্তি দেওয়া হয়। সে খবর যথাসময়ে গোপালগঞ্জে না পৌঁছায় ছাত্র বিক্ষোভটি ওইদিন অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে আন্দোলনের প্রাথমিক স্তরে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠিত ছাত্র সমাজের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ ও সাধারণ ধর্মঘট চলাকালে পুলিশি আক্রমণে বহু ছাত্র আহত হন এবং শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শামসুল হক, শওকত আলী ও গোলাম মাহবুবসহ বিপুল সংখ্যক ছাত্র নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কিন্তু নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের কারণে বিক্ষোভ প্রশমিত না হয়ে তীব্র হয়ে ওঠে।

পুলিশি নির্যাতন ও নিজের গ্রেপ্তার হওয়ার ব্যাপারে শেখ মুজিব তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘১১ মার্চ ভোরবেলা শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং, জেনারেল পোস্ট অফিস ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করল। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে কোনো পিকেটিংয়ের দরকার হয় নাই। সমস্ত ঢাকা শহর পোস্টারে ভরে ফেলা হল। অনেক দোকানপাট বন্ধ ছিল, কিছু খোলাও ছিল। পুরান ঢাকা শহরে পুরাপুরি হরতাল পালন করে নাই। সকাল আটটায় জেনারেল পোস্ট অফিসের সামনে ছাত্রদের উপর ভীষণভাবে লাঠিচার্জ হল। একদল মার খেয়ে স্থান ত্যাগ করার পর আরেকদল হাজির হতে লাগল। ফজলুল হক হলে আমাদের রিজার্ভ কর্মী ছিল। এইভাবে গোলমাল, মারপিট চলল অনেকক্ষণ। নয়টায় ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনের দরজায় লাঠিচার্জ হল। খালেক নেওয়াজ খান, বখতিয়ার (এখন নওগাঁর এডভোকেট), শহর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম.এ. ওয়াদুদ গুরুতররূপে আহত হল। তোপখানা রোডে কাজী গোলাম মাহাবুব, শওকত মিয়া ও আরও অনেক ছাত্র আহত হল। আবদুল গনি রোডের দরজায় তখন আর ছাত্ররা অত্যাচার ও লাঠির আঘাত সহ্য করতে পারছে না। অনেক কর্মী আহত হয়ে গেছে এবং সরে পড়ছে। আমি জেনারেল পোস্ট অফিসের দিক থেকে নতুন কর্মী নিয়ে ইডেন বিল্ডিংয়ের দিকে ছুটেছি, এর মধ্যে শামসুল হক সাহেবকে ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনে পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। গেট খালি হয়ে গেছে। তখন আমার কাছে সাইকেল। আমাকে গ্রেফতার করার জন্য সিটি এসপি জিপ নিয়ে বার বার তাড়া করছে, ধরতে পারছে না। এবার দেখলাম উপায় নাই। একজন সহকর্মী দাঁড়ান ছিল, তার কাছে সাইকেল দিয়ে চার পাঁচজন ছাত্র নিয়ে আবার ইডেন বিল্ডিংয়ের দরজায় আমরা বসে পড়লাম এবং সাইকেল যাকে দিলাম তাকে বললাম, শীঘ্রই আরও কিছু ছাত্র পাঠাতে। আমরা খুব অল্প, টিকতে পারব না। আমাদের দেখাদেখি আরও কিছু ছাত্র ছুটে এসে আমাদের পাশে বসে পড়ল। আমাদের উপর কিছু উত্তম মধ্যম পড়ল এবং ধরে নিয়ে জিপে তুলল। হক সাহেবকে পূর্বেই জিপে তুলে ফেলেছে। বহু ছাত্র গ্রেফতার ও জখম হল। কিছু সংখ্যক ছাত্রকে গাড়ি করে ত্রিশ-চল্লিশ মাইল দূরে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে আসল। কয়েকজন ছাত্রীও মার খেয়েছিল। অলি আহাদও গ্রেফতার হয়ে গেছে। তাজউদ্দীন, তোয়াহা ও অনেককে গ্রেফতার করতে পারে নাই। আমাদের প্রায় সত্তর-পঁচাত্তরজনকে বেঁধে নিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিল সন্ধ্যার সময়। ফলে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠল। ঢাকার জনগণের সমর্থনও আমরা পেলাম।’

এদিকে আন্দোলন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম হলে সরকার সমঝোতার উপায় খুঁজতে থাকে। ফলে সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ও সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে কমরুদ্দিন আহমদ একটি চুক্তিতে উপনীত হন। ১৫ মার্চ সই করা চুক্তিতে গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি, পুলিশি নির্যাতনের তদন্ত, সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার ছাড়াও বাংলা ভাষার মর্যাদা সম্পর্কে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সেগুলো হচ্ছে: (৩) ১৯৪৮ এর এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পূর্ববাংলা সরকারের ব্যবস্থাপক সভায় বেসরকারি আলোচনার জন্য যে দিন নির্ধারিত হইয়াছে সেইদিন বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করিবার ও তাহাকে পাকিস্তান গণপরিষদে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের পরীক্ষা দিতে উর্দুর সমমর্যাদা দানের জন্য একটি বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপন করা হইবে।

(৪) এপ্রিল মাসে ব্যবস্থাপক সভায় এই মর্মে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হইবে যে, এদেশের সরকারি ভাষা হিসেবে ইংরেজি উঠিয়া যাওয়ার পরই বাংলা ভাষা তাহার স্থলে সরকারি ভাষারূপে স্বীকৃত হইবে। তবে সাধারণভাবে স্কুল-কলেজগুলোতে অধিকাংশ ছাত্রের মাতৃভাষার মাধ্যমেই শিক্ষা দান করা হইবে।’

এদিকে চুক্তিটি সই হওয়ার আগে গুরুত্বপূর্ণ ছাত্রনেতাদের মতামত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব হলো। কিন্তু তাঁদের বেশির ভাগই তখন জেলে। এ অবস্থায় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবার আগে সংগ্রাম পরিষদের সদস্যরা ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে গিয়ে শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, শওকত আলী প্রমুখ বন্দী ছাত্রনেতৃবৃন্দকে চুক্তিপত্রটি দেখিয়ে তাঁদের সম্মতি গ্রহণ করেন।

চুক্তি সম্পর্কে শেখ মুজিব লিখেছেন, ‘তখন পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার অধিবেশন চলছিল। শোভাযাত্রা রোজই বের হচ্ছিল। নাজিমুদ্দীন সাহেব বেগতিক দেখলেন। আন্দোলন দানা বেঁধে উঠেছে। ওয়াদুদ ও বখতিয়ার দু’জনই ছাত্রলীগ কর্মী, তাদের ভীষণভাবে আহত করে জেল হাসপাতালে রাখা হয়েছে। এই সময় শেরে বাংলা, বগুড়ার মোহাম্মদ আলী, তোফাজ্জল আলী, ডা. মালেক, সবুর সাহেব, খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন ও আরও অনেকে মুসলিম লীগ পার্টির বিরুদ্ধে ভীষণভাবে প্রতিবাদ করলেন। আবার শহীদ সাহেবের দল এক হয়ে গেছে। নাজিমুদ্দীন সাহেব ঘাবড়িয়ে গেলেন এবং সংগ্রাম পরিষদের সাথে আলাপ করতে রাজি হলেন। আমরা জেলে, কি আলাপ হয়েছিল জানি না। তবে সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে কামরুদ্দিন সাহেব জেলে আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং বললেন, নাজিমুদ্দীন সাহেব এই দাবিগুলি মানতে রাজি হয়েছেন : এখনই পূর্ব পাকিস্তানের অফিসিয়াল ভাষা বাংলা করে ফেলবে। পূর্ব পাকিস্তান আইনসভা থেকে সুপারিশ করবেন, যাতে কেন্দ্রে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হয়। সমস্ত মামলা উঠিয়ে নিবেন, বন্দিদের মুক্তি দিবেন এবং পুলিশ যে জুলুম করেছে সেই জন্য তিনি নিজেই তদন্ত করবেন। আর কি কি ছিল আমার মনে নাই। তিনি নিজেই হোম মিনিস্টার, আবার নিজেই তদন্ত করবেন এ যেন এক প্রহসন।’ প্রসঙ্গত ওই চুক্তি সইয়ের মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে চুক্তির অসারতা প্রমাণ হলো। ২১ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ‘একমাত্র উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা’ করার ঘোষণা দেন রেসকোর্স ময়দানে। ভাষার অধিকার নিয়ে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ জোরদার হলে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে নূরুল আমিন সরকার। বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে আন্দোলনকে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে রূপ দেওয়ার চেষ্টা চালান। ওই দিন (২১ ফেব্রুয়ারি) ছাত্রদের খণ্ড খণ্ড মিছিলে পুলিশ বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করে। ফলে ছাত্রদের সাথে পুলিশের খণ্ড যুদ্ধ শুরু হলে বহু ছাত্র-জনতা আহত হয়। এক পর্যায়ে ছাত্ররা প্রতিবাদ জানানোর জন্য পরিষদ ভবনের দিকে যাওয়ার সময় মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের কাছে পুলিশ গুলি চালিয়ে রফিক উদ্দিন, জব্বার ও আবুল বরকতকে হত্যা করে। এই ঘটনার পর একদিকে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে, অপরদিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী তাদের এদেশীয় তোষামোদী গোষ্ঠীর যোগসাজশে প্রাসাদ ষড়যন্ত্র অব্যাহত রাখে।

উল্লেখ্য, তৎকালীন ছাত্র ও যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান ভাষা আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার কারণে সেই যে ৪৮ সালের ১১ মার্চ গ্রেপ্তার হন, ১৫ মার্চ চুক্তি সম্পাদনের পর মুক্তি পেলেও ৪৯ সালের ১২ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনের সময় তাদের পক্ষে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে পুনরায় গ্রেপ্তার হন। কিছুদিন পর মুক্তি পেয়ে ৫০ সালে দুর্ভিক্ষের সময় মুখ্যমন্ত্রী লিয়াকত আলীকে ঘেরাও করতে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার হন ভাসানী-মুজিব ও শামসুল হক। সেই থেকে ৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ক্রান্তিলগ্নেও মুজিব জেলে বন্দী ছিলেন। ছাত্রদের আন্দোলনের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিন আহমদ জেলের ভেতর অনশন ধর্মঘট পালন শুরু করেন (১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি)। শেখ মুজিব অনশনের কারণে ঢাকা থেকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তরিত হন ১৮ ফেব্রুয়ারি। এর মধ্যে ছাত্র নেতৃবৃন্দ তাঁদের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সময়ে সময়ে জেলখানায় গিয়ে শেখ মুজিবের সাথে পরামর্শ করে আসতেন। ওই সময়ে শেখ মুজিব ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের যুগ্ম সম্পাদক এবং কার্যত দলের অন্যতম নীতি নির্ধারক।

বস্তুত, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে যে রক্ত ঝরে, তার শোণিত ধারার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর নেতৃত্বে বাঙালিরা কোনোদিন তাদের মান-মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে পারবে না। ফলে একটি সুগঠিত রাজনৈতিক প্লাটফরম তৈরির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৯৫৪ সালে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করার জন্য পূর্ব বাংলার বিরোধীদলগুলোর সমন্বয়ে একটি যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়। মার্চে অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক বৃহত্তম সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

পাকিস্তানি শাসক ও তাদের এ দেশীয় তল্পীবাহকদের ষড়যন্ত্রের কারণে মাত্র ৪৫ দিনের মাথায় যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল করা হয় রাষ্ট্রদ্রোহীতার অভিযোগে। নজরবন্দি করা হয় মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হককে এবং গ্রেপ্তার করা হয় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে। পরবর্তী সময়ে ভাষা আন্দোলনে শহীদদের রক্ত ও ত্যাগের মহিমাকে সামনে রেখে ১৯৬২ সালে সামরিক জান্তা আইউব খান বিরোধী শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ সাল থেকে ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯ সালের গণ-আন্দোলন, এবং ৭০ এর নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দিয়ে (নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে) বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায় বাঙালি জাতি। অবশেষে তাঁর নামে প্রায় নয় সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা অর্জন করে এবং সেই সাথে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা মর্যাদা।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের ইতিহাস: ড. মো. মাহবুবুর রহমান, সপ্তম মুদ্রণ, পৃ-৮৬, প্রাগুক্ত: পৃ-৯০, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম: রফিকুল ইসলাম, পৃ-৩৬, ধীরেন দত্ত, ঢাকায় স্মৃত এক ঢাকা পড়া মানুষ: রনজিৎ বিশ্বাস, সাপ্তাহিক খবরের কাগজ, ৭ জুলাই ৯৮, অসমাপ্ত আত্মজীবনী: শেখ মুজিবুর রহমান, পৃ-৯১- ৯২, ‘পাকিস্তান আমলের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের নিরিখে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম’ প্রথম আলো, ১৪.০৯. ১৮, অসমাপ্ত আত্মজীবনী: শেখ মুজিবুর রহমান, পৃ-৯২-৯৩, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম: রফিকুল ইসলাম, পৃষ্ঠা-৩৬-৩৭, স্বাধীনতার বিপ্লবী অধ্যায়-বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য ৪৭-৭১: মুহাম্মদ শামসুল হক, পৃ-৫৪।

মুহাম্মদ শামসুল হক

দৈনিক আজাদী বৃহস্পতিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0