বিশ্বের নিকৃষ্টতম অধ্যাদেশ বাতিলের দিন

বিশ্বের নিকৃষ্টতম অধ্যাদেশ বাতিলের দিন

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে বহু কালো কানুন প্রণয়ন করা হয়েছে বা প্রণয়নের চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু খুনীদের, বিশেষ করে রাষ্ট্রপ্রধানের খুনীদের আইনের আওতা থেকে রক্ষা করার জন্য কোন আইন স্মরণকালের ইতিহাসে কোন দেশেই খুঁজে পাওয়া যাবে না। রাষ্ট্রপতির খুনীদের ইনডেমনিটি বা রক্ষা কবচ দেয়ার জন্য শুধু খুনী মোশতাক এবং খুনী জিয়াই অর্ডিনেন্সের নামে আইন প্রণয়নের অপচেষ্টা করে বিশ্বের নিকৃষ্টতম নজির সৃষ্টি করেছেন। আইন প্রণয়নের অপচেষ্টা বলছি এ জন্য যে আমাদের সুপ্রীমকোর্টের উভয় বিভাগ তথাকথিত অর্ডিনেন্সটিকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মর্মে ঘোষণা দিয়ে এটিকে আইনবহির্ভূত এবং অচল বলে রায় দিয়েছেন। এই তথাকথিত অর্ডিনেন্সটিতে ১৯৭৫ সালের ২৬ নবেম্বর স্বাক্ষর করেন তৎকালীন স্বঘোষিত তথাকথিত রাষ্ট্রপতি খুনী খন্দকার মোশতাক। যেহেতু নামে (যদিও সম্পূর্ণ সংবিধানবহির্ভূতভাবে) খুনী মোশতাককেই রাষ্ট্রপতি বলে আখ্যায়িত করেছিল বন্দুকের নলে ক্ষমতা দখলকারী গোষ্ঠী, তাই মোশতাককেই তথাকথিত অর্ডিনেন্সে দস্তখত করতে হয়েছিল। তবে এই তথাকথিত অর্ডিনেন্স যে শুধু একা মোশতাকেরই কর্মকা-, তা নয়- এই অপকর্মের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল সেই ব্যক্তি, যার হাতে ছিল আসল ক্ষমতা, অর্থাৎ খুনী জিয়াউর রহমান, খুনী মোশতাককে সামনে রেখেই যে তারা দুজনে মিলে এসব অপকর্ম ঘটিয়েছিলেন, তার প্রমাণ মিলে এ থেকে যে কিছু সময় পরে জিয়া মোশতাককে হটিয়ে অবশেষে নিজের মুখোস উন্মোচন করেছিলেন পর্দা তুলে দিয়ে।

তথাকথিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারির পূর্বে খুনী মোশতাক বঙ্গবন্ধু খুনীদের ‘সূর্য সন্তান’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। শুধু তাই নয় মোশতাক-জিয়া জুটি খুনীদের বাংলাদেশের বিভিন্ন দূতাবাসে সম্মানজনক পদে পদায়ন করে আবারও প্রমাণ করেছেন যে ঐ সব মেজর কর্নেলই শুধু বঙ্গবন্ধুর খুনী ছিল না, বঙ্গবন্ধু খুনের আসল পরিকল্পনাকারী ছিলেন জিয়া-মোশতাক জোট যাদের সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত ছিল। তারা ঐসব মেজর কর্নেলকে দিয়ে জাতির জনককে খুন করার মতো ঘৃণ্যতম অপরাধটি করেছে এবং তারপরই চেষ্টা করেছে ঐ সব মেজর কর্নেলসহ সব খুনী ও পরিকল্পনাকারীকে আইনের হাত থেকে রক্ষার জন্য সেই রকম অধ্যাদেশ জারি করতে।

তথাকথিত অধ্যাদেশে যা বলা হয়েছিল সংক্ষেপে তা হলো এই যে, ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট, সকালে যে সকল ব্যক্তি (ঐতিহাসিক) পরিবর্তন এবং সামরিক শাসন জারির উদ্দেশ্য যে সব কর্মকা- ঘটিয়েছিল এবং ঘটানোর পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে কোন দেওয়ানী, ফৌজদারী মামলা চলবে না, সুপ্রীমকোর্টসহ কোন আদালতেই এবং কোর্ট মার্শালের নিয়মানুযায়ীও তাদের বিচার চলবে না। সোজা কথায় ঐ তথাকথিত অধ্যাদেশ, যাকে ১৯৭৫ এর ১৯ নং অধ্যাদেশ হিসাব চিহ্নিত করা হয়েছিল, তার দ্বারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকারী এবং হত্যা পরিকল্পনাকারীদের সকল প্রকার আইনের আওতা থেকে নিষ্কৃতি দেয়ার একটি বেআইনী প্রচেষ্টা করা হয়। শুধু বঙ্গবন্ধুই নয়, ১৫ আগস্ট সকালে তার পরিবারের সদস্যবর্গসহ অন্য যাদের হত্যা করা হয়, তাদের ব্যাপারে ঐ অধ্যাদেশের পরিধি টানা হয়।

তথাকথিত কার্যক্রমটি প্রাথমিকভাবে অধ্যাদেশ আকারে মোশতাক দস্তখত করলেও পরবর্তীতে খুনী জিয়া এটিকে আনুষ্ঠানিক আইনের বিধান (স্টেচুট) হিসাবে মর্যাদা দেয়। যদিও সেটাকেও অচল বলে সর্বোচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, জিয়া অন্য বহু কর্মকা-কে ইনডেমনিটির আওতায় আনার প্রয়াস পেয়েছিলেন এবং সবশেষে ১৯৭৯ সালে তার সৃষ্ট ক্রিড়ানক সংসদের সহায়তায় পঞ্চম সংশোধনী তথাকথিত আইন (যেটিকেও সর্বোচ্চ আদালত আইনের দৃষ্টিতে অচল বলে ঘোষণা দিয়েছেন) দ্বারা সাংবিধানিক মর্যাদা দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিলেন।

যদিও পরবর্তীতকালে সুপ্রীমকোর্টের দেয়া রায় অনুযায়ীই তথাকথিত অধ্যাদেশ, পরবর্তীতে জিয়া কর্তৃক ঐ অর্ডিনেন্সকে প্রথমত আইনের মর্যাদা দেয়ার এবং পরবর্তীতে জিয়ার নেতৃত্বে পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এটিকে সংবিধানিক মর্যাদা দেয়ার সকল প্রচেষ্টাই ছিল সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে অচল, তথাপিও ভুয়া অধ্যাদেশ এবং পরবর্তীতে প্রণীত ভুয়া আইন এবং সংশোধনীর ধুয়া তুলে বঙ্গবন্ধু খুনী এবং খুনের নক্সা প্রণয়নকারীরা দীর্ঘ ২১টি বছর আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে বাংলাদেশেরই উঁচু কূটনৈতিক পদ দখল করে থাকেন খুনী মোশতাক এবং জিয়ার আইনবহির্ভূত (সর্বোচ্চ আদালত তাই বলেছেন) শাসন আমলে। ঐ সময় থানা পুলিশ এবং আদালত কেউই বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা গ্রহণ করেননি তথাকথিত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের ধুয়া তোলে।

অবশেষে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার সার্বজনীন ভোটে ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে ১৯৯৬ সালের ১২ নবেম্বর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ রহিত করার জন্য সংসদে আইন পাস করেন। খুনী জিয়ার সৃষ্ট দলের এবং যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত জামায়াতের সদস্যরা সংসদে অনুপস্থিত থাকেন যার কারণ পুরোপুরি প্রবিধানযোগ্য। রহিতকরণ আইন সংসদে তোলা হলে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে কালো কানুন হিসাবে আখ্যায়িত করে সাংসদগণ বলেন যে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে নিজেদের একটি সভ্য জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে পৃথিবীর বুকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বার্থেই উক্ত অধ্যাদেশ রহিতকরণ বিল পাস করা প্রয়োজন। সাংসদরা আরও বলেছিলেন, খুন, ধর্ষণ, রাজাহানি প্রভৃতির মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে বিচার লাভ মানুষের মৌলিক অধিকার। সাংসদগণ জোর দিয়ে বলেন, অধ্যাদেশটি মোটেও সংবিধানের অংশ নয়, যে অজুহাত দেখিয়ে বিএনপি-জামায়াত সরকার এটি রহিত করার চেষ্টা এড়িয়ে যায়।

পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ২ অক্টোবর ধানম-ি থানায় বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা দায়েরের পর তদন্ত প্রক্রিয়া চলমান থাকাকালে খুনী ফারুক, খুনী শাহরিয়ার হাইকোর্ট বিভাগে এ কথা বলে রিট করেন যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা এবং জেলহত্যা মামলা সংবিধান এবং আইনবহির্ভূত। তারা এই মর্মে খোড়া যুক্তি উপস্থাপন করেন যে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে জিয়ার পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের অংশে পরিণত করা হয়েছে বলে এটি রহিতকরণের আইন ও সংবিধান বিরোধী, অর্থাৎ সংবিধান সংশোধন ছাড়া এটি আইনত সম্ভব নয়।

তাদের এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে হাইকোর্ট যে রায় দেন, সংক্ষেপে তা হলো এই যে, ১৯৭৫ সালের ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ এ কারণে বেআইনী এবং আইনের দৃষ্টিতে অচল যে এটি সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। হাইকোর্ট বিভাগ এটাও ঘোষণা করেছেন যে ইনডেমনিটি রহিত করার জন্য ১৯৯৬ সালে প্রণীত আইন সম্পূর্ণরূপে বৈধ। মামলাটি আপীল বিভাগে গেলে উক্ত বিভাগ যা ঘোষণা করেন সংক্ষেপে তা হলো এই যে, সামরিক আইন জারি হলেও সংবিধানকে বাতিল করা হয়নি বিধায় ৩১ এবং ৩২ অধ্যায়ে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার, যার দ্বারা আইনের আশ্রয় পাওয়া এবং জীবনের নিশ্চয়তা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, সে বিধানসমূহ সম্পূর্ণ অটুট ছিল। আপীল বিভাগ আরও বলেছেন যে, এটা বিনা দ্বিধায় বলা যায় কোন সময়ই কোন ঘোষণাপত্র দ্বারা কোন ব্যক্তিকে অন্য কোন ব্যক্তির জীবন হরণের কোন ক্ষমতা দেয়া হয়নি এবং কোন ব্যক্তিকে আইনের সুরক্ষা থেকেও বঞ্চিত করা হয়নি এবং সে কারণেই বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের সদস্যদের হত্যাকা-কে সামরিক শাসনের ঘোষণাপত্র দ্বারা অনুমোদিত বা রক্ষিত করা হয়েছে এ কথা বলা যায় না। এটি সংবিধানের অংশ বলে যে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছিল, সুপ্রীমকোর্ট তা সমুলে প্রত্যাখ্যান করেন।

সবশেষে ২০১০ সালে প্রথমে হাইকোর্ট বিভাগ এবং পরবর্তীতে আপীল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনীকে এবং সামরিক শাসনকেই অবৈধ বলে রায় প্রদান করে একথা বলেন যে দৈনন্দিন কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় বিধানসমূহ ছাড়া সামরিক শাসন আমলে তৈরি সমস্ত আইনই অবৈধ।

এরপর যা হলো তা সবারই জানা। কয়েকজন খুনীর সাজা হলো। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল নক্সাকারী জিয়া এবং মোশতাকসহ আরও যারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তারা মরে গিয়ে বেঁচে গেল। তাদের বিচার আইনে সম্ভব না হলেও একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কমিশন পর্দার আড়ালে থেকে যারা বঙ্গবন্ধু হত্যায় মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন তাদের পরিচয় প্রকাশ করলে সেটি যুগ-যুগান্তরের জন্য মহামূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল হয়ে থাকবে। এটাই গোটা জাতির প্রত্যাশা। এ ব্যাপারে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে বঙ্গবন্ধু হত্যার দিন প্রত্যুষে জিয়া কর্নেল সাফায়েত জামিলকে (মামলার ১৯নং সাক্ষী) বলেছিলেন ‘প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা হয়েছে তাতে কি হয়েছে?’ ইদানীং আরও যেসব নতুন অকাট্য সাক্ষ্যে প্রমাণ পাওয়া গেছে তার একটি হলো এই যে, জিয়া ১৯৭৩ এ আমেরিকায় পাকিস্তান দূতাবাসের ডিফেন্স এটাচির সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেছিলেন এবং আমেরিকা থেকে ফেরার পথে লন্ডন থেকে কর্নেল ফারুকের রেখে যাওয়া সুটসেইস নেয়ার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলেন, বলে ছিলেন কর্নেল ফারুক তার বিশিষ্ট বন্ধু (সূত্র লন্ডনে ভারতীয় দূতাবাসের সাবেক প্রথম সচিব শশাংক বন্দ্যোপাধ্যায়)।

জিয়া বাংলাদেশকে আবার পাকিস্তানে পরিণত করার জন্যই যে পাকিস্তানী প্রভুদের নির্দেশনা এবং পরিকল্পনা অনুযায়ী বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিয়ে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে কাজ করেছেন, এটা দিবালোকের মতোই স্পষ্ট। এ কথা কর্নেল ফারুক-রশিদও বলেছে লন্ডনে টেলিভিশন সাক্ষাতকারে। জাতির প্রত্যাশার সঙ্গে সুর মিলিয়ে মাননীয় আইনমন্ত্রী যে ঘোষণা দিয়েছেন, তাতে সকলের সাধুবাদ রয়েছে।

খালেদা জিয়ার শাসন আমলে ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট নামে’ বিনা-বিচারে অকাতরে বহু লোককে হত্যা করা হয় এবং ঐ সকল খুনীকে আইন থেকে বাঁচানোর জন্য তিনিও একটি ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, যা পরে আইনে পরিণত করেছিলেন ২০০৩ সালে প্রণয়ন করেছিলেন। কিন্তু সুপ্রীমকোর্টের এ্যাডভোকেট জেড, আই পান্নার দায়েরকৃত রিট পিটিশনের রায় দান কালে হাইকোর্ট বিভাগ এটিকে সম্পূর্ণ বেআইনী এবং জন্ম থেকেই অচল বলে ঘোষণা করেন।

২০০৩ এর আইন সম্পর্কে বিজ্ঞজনদের মন্তব্য হলো- খালেদা তার স্বামীর পদাংকই অনুসরণ করেছেন। ২০১৫ এর হাইকোর্টের রায় ও সর্বমহলে প্রশংসিত হয়েছে এ কারণে যে, কোন খুনীকে আইনের আওতা থেকে নিষ্কৃতি দেয়ার মতো কলঙ্কজনক কাজ আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞারই নিদর্শন।

লেখক : বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, আপীল বিভাগের সাবেক বিচারপতি
জনকণ্ঠ, ১২ নভেম্বর ২০১৯

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0