বিদেশি এজেন্ট ও অতি প্রগতিবাদীদের জয় হবে না: বঙ্গবন্ধু

    বিদেশি এজেন্ট ও অতি প্রগতিবাদীদের জয় হবে না: বঙ্গবন্ধু

বিদেশি এজেন্ট ও অতি প্রগতিবাদীরা যত চেষ্টাই করুক না কেন বহু ত্যাগ ও রক্তপাতের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বানচাল করা যাবে না। দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠেবঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ কথা বলেন১৯৭২ সালের ২৪ মার্চ। ওইদিনবিকালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের আনন্দবাজার পত্রিকার সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালেতিনিআবারও বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে ভারতের সহায়তার জন্য দেশটির সরকার ও জনেগণের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন।বাংলাদেশে সংবাদ সংস্থা— বাসস পরিবেশিত খবরে তা উল্লেখ করা হয়।
এদিকে একই দিন ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মওলানা আদুল হামিদ খান ভাসানী বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার মৈত্রী ও শান্তি চুক্তিকে অভিনন্দিত করেন।স্বাধীনতার পর এটাই ছিল তার প্রথম সংবাদ সম্মেলন।

স্বাধীনতা রক্ষায় বাংলাদেশের মানুষ প্রস্তুত
বঙ্গবন্ধু দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেন, বিদেশি এজেন্ট আর তথাকথিত অতি প্রগতিশীলতার যা-ই করুক না কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে বিনষ্ট করার ষড়যন্ত্রে তারা সফল হতে পারেনা। স্বাধীনতার জন্য বাংলাদেশের মানুষকে চরম মাশুল দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষার জন্য যেকোনও ত্যাগ ও যেকোনও পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য বাংলাদেশের মানুষ প্রস্তুত।
সব চক্রান্ত নস্যাৎ করা হবে
বঙ্গবন্ধু হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, বিদেশি এজেন্ট ও অতি বিপ্লবীদের সব চক্রান্ত নস্যাৎ করা হবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে ভারত সরকার ও ভারতীয় জনগণ এবং মিত্রবাহিনীর যে সক্রিয় সাহায্য করেছেন বঙ্গবন্ধু তার জন্য পুনরায় গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

এই স্বাধীনতা বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাও
বঙ্গবন্ধু বাঙালির সংস্কৃতির সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলার সংস্কৃতি উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার আরও গুরুত্ব আরোপ করবে। বাঙালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার জন্য গত ২৩ বছরে পাকিস্তানি শাসকরা যে জঘন্য ষড়যন্ত্র চক্রান্ত ও দমননীতির আশ্রয় নিয়েছিল বঙ্গবন্ধু তার উল্লেখ করে বলেন, বাংলার তরুণসমাজ ও বুদ্ধিজীবীরা তা প্রতিহত করেছে।
তিনি বলেন, কিছু লোক পাকিস্তানের চক্রান্তের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এবং বাংলার মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণ করেনি। তথাকথিত কিছু অতি প্রগতিবাদী ও প্রতিক্রিয়াশীল লোকজন পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল। কিন্তু তারা কখনও সফল হয়নি।
বঙ্গবন্ধু বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার কোনও রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়,এ স্বাধীনতা বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাও বটে। বাংলাদেশের মানুষ এখন তার নিজস্ব সংস্কৃতি নিয়ে নিজেদের ইচ্ছামতো এগিয়ে যেতে পারবে। বিগত দিনগুলোতে বাংলা ভাষা ও কৃষ্টির ওপর আঘাত এসেছে। আরবি হরফে বাংলা লেখা, বাংলা ভাষার মুসলমানিকরণসহ কতকিছু! কিন্তু বাংলাদেশের ছাত্র, যুবক, বুদ্ধিজীবী, কৃষক তথা আপামর জনতা তা প্রতিহত করেছে।
এ প্রসঙ্গে দালালদের ভূমিকা প্রসঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, সবাই জানেন, দালাল সব দেশেই থাকে, বাংলাদেশও ছিল, আছে। তিনি অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে চান না মন্তব্য করে এই আশা প্রকাশ করেন, তাদের শুভবুদ্ধি ফিরে আসবে।
পত্রিকার অনন্য ‍ভূমিকা
আনন্দবাজার পত্রিকার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারায় সন্তোষ প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধু বলেন, বাংলার মুক্তিযুদ্ধে আনন্দবাজার পত্রিকা যে সাহায্য করেছে, তিনি তা জানেন। ভারতের জনসাধারণ ও সরকারের প্রতি আবারও শ্রদ্ধা জানান তিনি।
বঙ্গবন্ধু বলেন, সংগ্রাম এগিয়ে, চলে কিন্তু বিশ্বের মানুষ তার খবর জানতে পারে সবশেষে। আমাদের সংগ্রাম ছিল বহুমুখী, দেশে-বিদেশে বহু দুশমনের সাথে। অতি প্রতিক্রিয়া ও প্রগতিশীলদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাস যখন রচিত হবে তখনই সংগ্রামের কথা পুরোপুরি জানতে পারবেন।
ভারতের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বারবার কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই না। আপনারা আমার দুঃখীমানুষের শ্রদ্ধা গ্রহণ করুন।
কথা বললেন ভাসানী
হোটেল পূর্বাণীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ন্যাপ নেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী বলেন, গঠনমূলক ক্ষেত্রে আমি বাংলাদেশ সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা দিয়ে যাবো। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তিকে অভিনন্দিত করেন।
তিনি বলেন, বিভিন্ন পত্রিকা আমাকে বিদেশের এজেন্ট,এমনকী বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী, ষড়যন্ত্রকারী বলে কুৎসা রটনা করেছে। শেষ মুহূর্তে এরচেয়ে মর্মান্তিক পরিহাস আমার জন্য আর কি হতে পারে! এখন আমার এ দেশ থেকে হিজরত করাই শ্রেয়। তিনি বলেন, এই স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে বৃদ্ধ বয়সেও শেষ রক্তবিন্দু দিতে আমি প্রস্তুত। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে কিন্তু দেশকে ভালোবাসি না—এমন কথা অতীতে কেউ কখনও বলতে পারেনি। আজীবন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রাম করে এসেও আজ আমাকে এসব শুনতে হয় বলে আক্ষেপ করেন তিনি।

বাংলা ট্রিবিউন, মার্চ ২৪, ২০২০

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0