বঙ্গবন্ধু মুজিব, বিশ্ববন্ধু মুজিব

বঙ্গবন্ধু মুজিব, বিশ্ববন্ধু মুজিব

অধ্যাপক আমিনুল হক,
প্রতিটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে থাকে অনেক আত্মত্যাগের ইতিহাস। স্বাধীনতার জন্য রক্ত, জীবন, সম্ভ্রম দিতে হয়। দীর্ঘ লড়াই–সংগ্রাম করতে হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশরা বিদায় নিয়ে চলে গেল। ভারতবর্ষ শেষ পর্যন্ত দুটি দেশ হল—ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তান পূর্ব-পশ্চিম নামে দুই ডানা নিয়ে উড়লেও তাতে নির্মল প্রাণ জুড়ানো বায়ুর চেয়ে আগুনের হলকা ছিল বেশি। তাই শুরু থেকেই পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটির হুইল চলে যায় সামরিক শক্তির কাছে এবং গণতন্ত্র নামটি অনেকটা নিষিদ্ধই ছিল পাকিস্তানের মানুষের কাছে। পাকিস্তানি সামরিক স্বৈরাচারের নির্মম শাসন আর শোষণের নির্মম শিকার হয় প্রধানত পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি জনগোষ্ঠী। কার্যত পূর্ব পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের একটি উপনিবেশে পরিণত হয়। ব্রিটিশ বেনিয়ারা যেমন বাণিজ্যের নামে ভারতবর্ষে তাদের শাসন কায়েম করে ২০০ বছর ভারতের সম্পদ, সুখ, স্বাধীনতা লুটে নেয়।
২০০ বছর লড়াই-সংগ্রাম, নিপীড়ন-নির্যাতন সয়ে আর আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জন করে পাকিস্তান। ঠিক তেমনি পূর্ব পাকিস্তান পরিণতির মুখোমুখি দাঁড়ায় পাকিস্তানের অংশ হয়ে। সেই ১৯৪৭ সালের পর থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ এক মুহূর্তের জন্যও স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি। পাকিস্তান শোষণ-বঞ্চনা, অবজ্ঞা-অবহেলা-অসম্মানের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই বাঙালিদের আন্দোলন সংগ্রামে নামতে হয়। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত সংগ্রাম আর জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধ করে ৩০ লাখ বাঙালির আত্মত্যাগ, দুই লক্ষাধিক মা-বোনের ইজ্জতের ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ডিসেম্বর বিজয়ের মাস। একাত্তরের মার্চ মাসকে আমরা বলি উত্তাল ও আগুন ঝরা মাস। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তেমন আগুন ঝরানো ছিল না। তবে এটি ঠিক, ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ ফরিদপুরের গোপালগঞ্জ মহকুমার মধুমতী নদীর পাড়ে টুঙ্গিপাড়ায় একটি আগুনের ফুলকির জন্ম হয়েছিল। সেই আগুনের ফুলকি বাঙালির প্রাণে ছোঁয়া লাগিয়ে ছিল ১৯৭১ সালের মার্চে। সে কারণেই ১৯৭১ আমাদের আগ্নিঝরা মাস। কেন তিনি বঙ্গবন্ধু? কেন তিনি নেতা?
প্রথমেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংল্যান্ডের স্থপতি স্যার প্যাট্রিক গেঁটসকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। স্যার প্যাট্রিক ছিলেন পুরো ভারতবর্ষের নকশাকার। চিঠির এক জায়গায় লিখেছিলেন—‘কোন প্রতিষ্ঠানের ওপর আমার আস্থা নেই, আস্থা আছে সেই মানুষগুলোর ওপরে, যাদের আছে যথার্থ চিন্তা, মহান অনুভব ও সঠিক কর্ম।’ বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তি জীবন ও কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাব সঠিক গুণাবলি বঙ্গবন্ধুর জীবনকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছে। বঙ্গবন্ধুর জীবনী পাঠ করলে জানা যায়, তিনি জন্মই নিয়েছিলেন জীবনটা মানুষের তরে বিলিয়ে দেওয়ার জন্য। সারাটা জীবন পথ হাঁটলেন সাধারণ মানুষের চলার পথ মসৃণ করতে। কী পরম মমতায় মানুষকে বুকে টেনে নিতেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য।
ভদ্রলোকদের দিকে তিনি আঙুল তুলে বলতেন, কার টাকায় ডাক্তার সাব! কার টাকায় ইঞ্জিনিয়ার সাব! কার টাকায় রাজনীতিবিদ সাব! কার টাকায় চেয়ারম্যান ও এমপি সাব! কার টাকায় সব সাব! ওদের সম্মান করে কথা বলবেন। যারা রোদে-বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে ফসল ফলায়, যারা কারখানায় ঘাম ঝরিয়ে উৎপাদন করে, যারা কামার-কুমোর, কুলি-মজুর-ধুলো মাটির মানুষ—তাঁদের প্রতি তাঁর কী গভীর শ্রদ্ধা! কী আন্তরিক সম্মান প্রদর্শন! ওদের প্রতি সম্মান জানাতে সাদা কলার ওয়ালাদের কী কঠোর নির্দেশনা!
জাতির জনকের ভাবনার জগৎটাই ছিল সেসব মানুষকে নিয়ে, যারা দেশকে স্বাধীন করার মূলশিক্ত, মুক্তিযোদ্ধা। যারা দেশ বিনির্মাণের প্রধান। শ্রমিক, যারা শ্রমের ন্যায্য মূল থেকে শুধু বঞ্চিত হয় না, মালিকদের নানামুখী নিপীড়ন-নির্যাতনেরও শিকার হয়। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হয়। প্রতিকার পায় না। এসব মানুষের ভাবনাই ছিল জাতির জনকের অন্তরের মূল ভাবনা। এসব হতভাগা মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক নিরাপদ ভরসা ও আশ্রয় স্থল।
পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও বঙ্গোপসাগরের কূলে বসবাসকারী এই জনসম্পদের ইতিহাসে সর্বোত্তম আসনে অধিষ্ঠান, তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু মুজিব। তিনি একটি পিছিয়ে পড়া জাতিকে পরাধীনতা থেকে মুক্ত করেছেন, দিয়েছেন স্বাধীনতা। বিশ্ব ইতিহাসে যার দৃষ্টান্ত বিরল। তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুত্ফুর রহমান ও সায়েরা খাতুন দম্পতির তৃতীয় সন্তান, ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ পৃথিবীতে এসে অল্পদিনেই জানিয়ে দিয়েছিলেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের পরে তিনিই বাংলার আকাশের আরেক ধুমকেতু।
প্রতিবছর ১৭ মার্চ আসে একজন রাজনৈতিক কবির পঙ্‌ক্তিমালাকে গভীর শেষ প্রেমের বিশ্বাসে কণ্ঠে নিতে, বাঙালির অসমাপ্ত সাংস্কৃতিক মুক্তিসংগ্রামের অভিযাত্রাকে এগিয়ে দিতে। কিন্তু ২০২০ সালের ১৭ মার্চ হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সারা পৃথিবী শেখ মুজিবকে তাঁর শততম জন্মদিনে স্মরণ করবে। শেখ মুজিব শুধু বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা নন, তিনি বিশ্বের কাছে একটি অনুপ্রেরণার নাম। ১৯৩৯ সালে মাত্র ১২ বছর বয়সে মিশনারি স্কুলে পড়ার সময়ই শেখ মুজিব ছাত্রদের সংগঠিত করে স্কুলের ছাদ সংস্কারের দাবি জানিয়েছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দীর কাছে। নেতৃত্বের এই হাতেখড়ি এবং দাবি আদায়ের অদম্য স্পৃহাই পরবর্তীতে তাঁকে বসিয়েছে বিশ্বনেতার আসনে।
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের অধিবেশনে কংগ্রেস দলীয় সদস্য কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উত্থাপিত ‘গণপরিষদের ভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে অন্তর্ভুক্তি’ সংশোধনী প্রস্তাব মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যদের তীব্র বিরোধিতার মুখে বাতিল হওয়ার পর পাকিস্তানি শোষকগোষ্ঠী বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। একই অধিবেশনে গণপরিষদ পাকিস্তানের সংহতি রক্ষার অজুহাতে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ সারা বাংলায় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে প্রতিবাদ দিবসে পূর্ব পাকিস্তান সচিবালয়ের প্রথম গেটের সামনে বিক্ষোভের নেতৃত্বে দেন এবং ফলশ্রুতিতে গ্রেপ্তার হন। এই প্রতিবাদই পরবর্তীতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির বিয়োগান্ত কিন্তু সফল ভাষা আন্দোলনের শক্তি জোগায়, যার মধ্য দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি সুগঠিত হয়। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ উদ্ধৃত অবিস্মরণীয় বাণী ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি’—কে অন্তরে ধারণ করেই শেখ মুজিব বায়ান্নর পথ ধরে একাত্তরে উপনীত হয়েছিলেন।
বিশ্বকবি রবিঠাকুর বিশ্বকে চিনিয়েছিলেন বাংলাভাষা। আর শেখ মুজিব চিনিয়েছিলেন বাঙালি ও বাংলাদেশকে। অতঃপর ‘১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পাকিস্তান মুসলিম লীগের তথা পূর্ব পাকিস্তানে ভরাডুবি হওয়ার পর আবার তারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। নির্বাচন বাতিল করে দেয় সরকার। অর্থাৎ পাঞ্জাবিরাই দেশ শাসন করবে। অন্য জাতিরা প্রজা হয়েই থাকবে। পাকিস্তানিদের অসাম্প্রদায়িকতার ফলে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন শেখ মুজিব ঐতিহাসিক ৬ দফা ঘোষণা করেন। এই দাবি তিনি লাহোরে এক জনসভায় ঘোষণা করেন। ৭ জুন এই দাবিতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, তাই তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা হতে থাকে।
অবশেষে আসে সেই ঐতিহাসিক আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। দীর্ঘদিন মামলা চলতে থাকে। তারা মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট জহিরুল হককে হত্যা করে চেয়েছিল আন্দোলন থামাতে। কিন্তু এতে বাংলার জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে আন্দোলন আরও তীব্রতর করে। এক সময় ১৯৬৯ সালের আন্দোলনে এই মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় আইয়ুব শাহি। প্রধান আসামি শেখ মুজিবসহ সব বন্দীকে বিনা শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেস কোর্সের (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসভায় শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হয়। সেদিন থেকে তিনি ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’ নামে বাংলার মানুষের কাছে নতুন করে পরিচিত হন। পাকিস্তানের ইতিহাস সামরিক শাসনের ইতিহাস। তাই আবার দ্বিতীয়বারের মত সামরিক শাসন জারি করা হয় ১৯৬৯ সালে। আইয়ুব খান সেনাপ্রধান ইয়াহিয়ার কাছে ক্ষমতা দিয়ে বিদায় নেন। তার ১০ বছরের শাসনের অবসান ঘটে।
শুরু হয় পাকিস্তানের শাসকদের দ্বিতীয় দফা ষড়যন্ত্র। এক সময় ইয়াহিয়া খান ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সারা পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব নির্বাচনের প্রস্তুতি নেন। এরই মধ্যে ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় বয়ে যায় এবং রাতেই লাখ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটে। ঝড়ের তিন দিন পর বিবিসি মারফত সারা দেশ ও বিশ্ব সম্প্রদায় জানতে পারে। এতেই প্রমাণিত হয় আরেকবার, পাকিস্তানিদের কাছে বাঙালিরা কত অবহেলিত ছিল। সব রাজনৈতিক দলের নেতারা নির্বাচন পেছানোর দাবি জানালেও বঙ্গবন্ধু অনড় থাকেন। নির্দিষ্ট তারিখে সেই নির্বাচনে অনুষ্ঠিত হয়। দুর্গত এলাকায় পরে নির্বাচন হয়। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের দুটি আসন ছাড়া সব আসনে, ১৬৭টিতে জয়ী হয়। আর চতুর জুলফিকার আলী ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পায় পশ্চিম পাকিস্তানে ৮০টি আসন। কিন্তু পাকিস্তানিরা কিছুতেই বাঙালিদের ক্ষমতা দেবে না। যে ভুট্টো এক সময় আইয়ুবের দালালি করেছেন, তিনি গোঁ ধরেন, তাদেরও ক্ষমতার ভাগ দিতে হবে। যদিও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠক করেন। যাওয়ার সময় বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের ‘ভাবি প্রধানমন্ত্রী’ বলে আখ্যায়িত করেন।
’৭১ সালের জানুয়ারিতে স্থগিত এলাকার নির্বাচন হওয়ার পরে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন ডাকা হয়। কিন্তু সেই চতুর ভুট্টো আসবেন না বলে ঘোষণা দেন। অনেক জল্পনা-কল্পনার পর হঠাৎ করেই ১ মার্চ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করা হয়। সেদিন থেকেই সারা পূর্ব পাকিস্তানে স্লোগান উঠে—স্বাধিকার নয়, আমরা স্বাধীনতা চাই। এ পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু ২৩ মার্চ ঢাকা শহরে হরতালের ডাক দেন। ২ মার্চই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ানো হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। পরিষদের পক্ষে ৩ মার্চ পল্টন ময়দানে সভায় স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ করা হয়। সেই সভায় শেখ মুজিব প্রধান অতিথি ছিলেন। তিনি জনগণকে ধৈর্য ধরতে বলেন।
অবশেষে আসে সেই ৭ মার্চ। ওই দিনের জনসভায় বঙ্গবন্ধু ১৮ মিনিট ১১ সেকেন্ডের বক্তব্যে পাকিস্তানের ইতিহাস বর্ণনা করেন এবং কীভাবে আমদের প্রতি শোষণ ও অন্যায় করেছে, সবকিছু ব্যাখ্যা করেন। পরোক্ষভাবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতির ডাক দেন। ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সঙ্গে সব আলোচনা ব্যর্থ হয়। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে সামরিক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানের ঘুমন্ত মানুষের ওপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বঙ্গবন্ধুকে তাঁর বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের আগেই পরিস্থিতি আঁচ করে তিনি চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ পাঠিয়ে দেন ওয়্যারলেসে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসূরি তাজউদ্দিনের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। ভারতের সহযোগিতা, মুক্তিযোদ্ধাদের অসীম সাহসিকতা ও ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জন করি।
জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান জানতেন আন্দোলন কীভাবে করতে হয়। ১৯৬৬ সাল থেকে ’৭০, তারপর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ—সবই তাঁর পরিকল্পনার ফসল। তবে তিনি বঙ্গবন্ধু হবেন না কেন? বন্ধু, বিশ্ববন্ধু। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ভাষণে যা বলেছিলেন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হীথ বলেছিলেন, পৃথিবীতে মানুষ যত দিন পরাধীনতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করবে, ৭ মার্চের ভাষণ প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে। মানুষের সংগ্রাম শেষ হয়নি, শোষণের বিরুদ্ধে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় প্রাণ যত দিন চলমান থাকবে, ৭ মার্চের ভাষণ তত দিন দেদীপ্যমান থাকবে উজ্জ্বল সূর্যের মতো।
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ আমাদের জীবনে একটি স্মরণীয় দিন। সবার দৃষ্টি তেজগাঁও বিমানবন্দরের দিকে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ব্রিটিশ উড়োজাহাজটি এখানেই এসে নামবে। নয় মাস ষোলো দিন আগে এই বিমানবন্দর দিয়েই তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল পাকিস্তানে। আজ এখানেই বাংলাদেশের জাতির জনক পা রাখবেন স্বাধীন দেশের মুক্ত নাগরিক হিসেবে। নিজের স্বাধীন দেশে বিজয়ীর বেশে তার এই ফিরে আসাকে ঘিরে দুদিন ধরেই উদ্বেলিত ছিল আপামর জনসাধারণ। ৮ জানুয়ারিই খবর এসেছিল তাঁর মুক্তির। পাকিস্তান থেকে তখন বাংলাদেশে আসার সরাসরি কোন যোগাযোগ ছিল না। ভারতের সঙ্গেও ছিল তাদের বিচ্ছিন্নতা। তাই বঙ্গবন্ধু বেছে নিয়েছিলেন লন্ডন হয়ে ঢাকায় আসার পথ। লন্ডন হয়ে আসতে দুদিন সময় লেগে গিয়েছিল, সেখানে তাঁকে কিছু আনুষ্ঠানিকতা সারতে হয় এবং তাকে দেওয়া হয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির মর্যাদা। সরকারি সফর নয়, তবুও মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হওয়া একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের ভাবমূর্তি ব্রিটিশদের কাছে ভিন্ন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিল। তাই সে মর্যাদা তারা বঙ্গবন্ধুকে দিতে কার্পণ্য করেনি।
বঙ্গবন্ধু লন্ডনে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন, সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে। ১০ জানুয়ারি ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ারফোর্সের একটি বিশেষ বিমানে রওনা হন। পথে যাত্রাবিরতি নয়াদিল্লিতে। সেখানে ভারতের রাষ্ট্রপতি ডি ডি গিগি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। ওই দিন দুপুর ২টায় দিল্লি থেকে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমান বাংলার মাটি স্পর্শ করলে আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে জড়িয়ে ধরে অশ্রুসিক্ত নয়নে আবেগময় চেহারায় জাতির প্রতি, জনগণের প্রতি অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছিলেন। বিকেল ৫টায় রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ লোকের উপস্থিতিতে ভাষণ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু আবেগ আপ্লুত হয়ে বলেছিলেন, ‘নেতা হিসেবে নয়, ভাই হিসেবে আমি আমার দেশবাসীকে বলছি—আমাদের সাধারণ মানুষ যদি আশ্রয় না পায়, খাবার না পায়, যুবকেরা যদি চাকরি বা কাজ না পায়, তাহলে আমাদের এ স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে, পূর্ণ হবে না। আমাদের এখন তাই অনেক কাজ করতে হবে।’ জাতির জনক রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১৭ মিনিট জাতির উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন, যা ছিল জাতির জন্য দিক-নির্দেশনা।
১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ার জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনে সংগ্রামের কথা বঙ্গবন্ধু উচ্চস্বরে উচ্চারণ করে বলেন, ‘বিশ্ব আজ দুভাগে বিভক্ত। এক পক্ষে শাসক, অন্য পক্ষে শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ এটা শুধু বাংলাদেশকে নিয়ে নয়। এটা সারা বিশ্বকে নিয়ে। সম্মেলন শেষ হওয়ার পর কায়রোর আল–আহরাম পত্রিকা সম্পাদকীয় কলামে যা লেখা হলো তার বাংলা অর্থ হল- বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী একটি মাত্র গুলি না ছুড়ে সারা বিশ্বে মুসলিম মন জয় করে নিলেন। বঙ্গবন্ধুর দর্শন আজ সারা বিশ্বে। তাই তিনি বিশ্ববন্ধু কেন নন?
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বিশ্ব মানচিত্রে যে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল, ১৯৭১ সালে তার তিন বছর অর্থাৎ ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য দেশের মর্যাদা পায়। আট দিন পর ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বক্তৃতা করেন বঙ্গবন্ধু। বাঙালির মহানায়ক আরোহণ করেন বক্তৃতা মঞ্চে। প্রথম এশীয় নেতা। মুহুর্মুহু করতালি। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা শুরু করেন মাতৃভাষা বাংলায়। তিনি বাংলা ভাষাকে বিশ্ব দরবারে আবার ঠাঁই করেছিলেন। এর আগে ১৯১৩ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে বিশ্বব্যাপী জেনেছিল বাংলা ভাষার অমূল্য আবেদন। সেই ধারায় তাঁর কন্যা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখনো চলমান রেখেছেন।
বঙ্গবন্ধুই পররাষ্ট্রনীতিতে শত্রুতা ত্যাগ করে মিত্রতার নীতি গ্রহণ করে বলেছিলেন, ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী ও মুজিব বর্ষের সম্মান জানাতে উদ্যোগ নিয়েছে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য কর্তৃপক্ষ। জাতির জনক যেদিন জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই ২৫ সেপ্টেম্বরকে ২০২০ সালের জন্য ‘বাংলাদেশি ইমিগ্রান্ট ডে’ হিসেবে পালন করা হবে নিউইয়র্কে। এ সম্মান শুধু বঙ্গবন্ধুর নয়, পুরো বাঙালি জাতির।
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে বঙ্গবন্ধু যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন, তা তিনি বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির ইতিহাসের এক মর্মান্তিক ও বিয়োগান্ত ঘটনা, যা আজও ভাবতে গেলে শিহরিত হই। ঘাতকদের হাতে সপরিবারে প্রাণ হারিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পরাজিত পাকিস্তানি শক্তি বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা পিছিয়ে দিয়েছিল। ঘাতকেরা জাতীয় চার নেতাকে কারাগারে নির্মমভাবে হত্যা করে। আইনের শাসন রুদ্ধ হয়ে যায়। সামরিক শাসন ও স্বৈরতন্ত্র জাতির ওপর জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসে। দীর্ঘ ২১ বছর পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। তখন থেকে দেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরে আসে। পরে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করতে শেখ হাসিনার ওপর একের পর এক হামলা চালানো হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালানো হয়।
বিগত দিনের সব ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন স্বপ্নে জীবন ও সমাজকে সাজানোর প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছে বাঙালি জাতি। এ বছরটি বাঙালি জাতির আরও একটি উৎসবের বর্ষ। তা হলো সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, অবিসংবাদিত মহান নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার, স্থপতি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। বঙ্গবন্ধুর জন্মের শততম সাল হিসেবে ইতিমধ্যে ২০২০ সালকে ‘মুজিব বর্ষ’ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ সরকার। ‘মুজিব বর্ষ’ উদ্‌যাপনে সরকারি–বেসরকারি পর্যায়ে বছরব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ইউনেসকো ১৯৫টি দেশে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন করবে। তবে ২০২০ সালের ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন থেকে শুরু হয়ে এই উৎসব শেষ হবে ২০২১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে।
যুক্তরাজ্যের রাজনীতিবিদ ও দার্শনিক টনি বেন (লর্ড ওয়েজউড বেন) লিখেছেন, ‘নেহরু–জিন্নাহ দুজনেই পশ্চিমা দেশে পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে, ব্রিটিশ সেক্যুলার রাজনীতিতে দীক্ষা নিয়ে দেশে ফিরে সর্বভিত্তিতে ভারতকে হিন্দু, ভারত ও মুসলিম ভারতে ভাগ করেছিলেন।
কিন্তু বঙ্গবন্ধু মুজিব বিদেশে শিক্ষা লাভ না করেও দেশের মাটিতে বড় হয়ে উপমহাদেশে প্রথম একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। মুজিব বললেই সারা বিশ্বের মানুষ চেনে স্বাধীন বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ মানেই মুজিব। মুজিব মানেই বাংলাদেশ। শেষ কথা, বঙ্গবন্ধু আজ আর শুধু বাংলাদেশের নেতা নন, তিনি বিশ্বের নেতা, বিশ্ববন্ধু।
বঙ্গবন্ধু মৃত্যুঞ্জয়ী। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের কাঠামোর সব স্তরে, জাতীয় পতাকায়, জাতীয় সংগীতে, শস্য খেতে দোল খাওয়া ফসলে, নদীর কলতানে, পাখির কুজনে তিনি আছেন এবং থাকবেন। তিনি আছেন এবং থাকবেন বাঙালির মননে, চেতনায়, ভালোবাসায় অমর অক্ষয় এবং অব্যয় হয়ে। বাস্তবে ফুল ফুটুক, সৌরভ ছড়াক বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশের। জয় হোক মানবতার, জয় হোক সভ্যতার। সফল হোক মুজিব বর্ষ উদ্‌যাপন। অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাক আমাদের মাতৃভূমি।

লেখক: পিএইচডি ফেলো।

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0