বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ

বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ ও বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ

সোহেল মেহেদী ও রাশেদ-আল-মাহফুজ  
বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই বাংলাদেশের জন্ম। বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুকে ব্যাতিরেখে বাংলাদেশের চিন্তা করা অসম্ভব। বাংলাদেশের জন্মের সাথে বঙ্গবন্ধু ওতপ্রোতভাবে জড়িত এবং বিশ্বদরবারে বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার একমাত্র কান্ডারি তিনি। বাঙ্গালির দীর্ঘদিনের শোষণ ও বঞ্চনার মুক্তিদাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে আমরা স্বাধীনতা পেতাম না, বিশ্বদরবারে বাঙালি বলে পরিচয় দিতে পারতাম না। কাজেই বঙ্গবন্ধু শব্দটি বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাথে এমন ভাবে জড়িত, যেখানে বঙ্গবন্ধু শব্দটি ব্যাতিরেখে অন্য দুটির ব্যাখ্যা করা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। 
বাঙ্গালী জাতিকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নেওয়ার পথ মসৃণ ছিল না। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙ্গালীর অধিকার আদায়ের সকল আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুশূল হন এবং বারবার কারাবরণ করেন। ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হলে সমগ্র বাঙ্গালী নতুন উদ্দীপনায় উজ্জীবিত হয়। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের অসাধারণ গুণ ছিল তিনি মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও অনুভূতিকে বুঝতে পারতেন। দলটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েই বাঙ্গালীর মুক্তির সনদ নামে খ্যাত ছয় দফা ঘোষণা করেন, যেটি ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর সামনে ছুড়ে দেওয়া বাঙ্গালীর স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক পদযাত্রার দলিল।  ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়ের পরেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙ্গালির হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি। বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন এবং ৭ মার্চ জাতির উদেশ্যে এক মহাকাব্যিক ভাষণ দিয়ে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেন “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”।    
টুঙ্গিপাড়ার খোকা যে বাঙ্গালীর দুঃখ-কষ্ট-দুর্দশা হৃদয় দিয়ে অনুভব করবেন এবং জাতির পিতা হিসেবে বাঙ্গালীর মণিকোঠায় স্থান করে নিবেন বঙ্গবন্ধুর জন্মের সময় সে বিষয়টি হয়তো কেউ উপলব্ধি করেনি। জাতির পিতা তাঁর দৃঢ়নেতৃত্ব দিয়ে পলিমাটির এই মানুষগুলোর মাঝে স্বাধীনতার বীজবপন করতে পেরেছিলেন। বাঙ্গালীর প্রতি ছিল তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসা ও বিশ্বাস। একজন মানুষ কতটা তাঁর দেশ ও জাতিকে ভালবাসতে পারে সেটি তাঁর জীবনদর্শন থেকে বোঝা যায়। শেখ মুজিব থেকে জাতির পিতা ও বিশ্বনেতা হয়েছিলেন বাঙ্গালী জাতির জন্য মহান আত্মত্যাগের কারণে।  বাঙ্গালীর অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তিনি ১৪ বছর জেল খেটেছেন। বাঙ্গালীর স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তৎকালীন অনেক নেতাই কথা বলেছেন, কিন্তু বাঙ্গালীর স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির ব্যাপারে কেউ জোরালো দাবি তুলতে পারেননি। বাঙ্গালীর দুঃখ, কষ্ট, শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তির ব্যাপারে একমাত্র বঙ্গবন্ধুই জোরালো দাবি তুলেছিলেন। দীর্ঘ সংগ্রাম ও লড়াইয়ের মধ্যদিয়ে বাঙ্গালীর হৃদয়ে স্বাধীনতার স্বাদ আস্বাদনের সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা তৈরি করেছিলেন। এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, পাকিস্তানি শৃঙ্খল ভেঙ্গে দুইশত বছরের পরাধীনতার গ্লানি মুছে স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। সকল অন্যায়,  অত্যাচার ও অবিচার রুখে দিয়ে বাঙ্গালীর ভাষা ও সংস্কৃতি কে রক্ষা করতে হবে। দু’বেলা পেটপুরে খাওয়ার ব্যবস্থাসহ অর্থনৈতিক মুক্তির সোনালী স্বপ্নের অঙ্কুরোদগম ঘটিয়েছিলেন বাঙ্গালীর হৃদয়ে।  সেই স্বপ্নকে ভর করেই বঙ্গবন্ধুর ভালবাসায় সিক্ত বাঙ্গালী জাতি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে বিজয় অর্জন করে। 
৮ই জানুয়ারী ১৯৭২ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডন ও দিল্লি হয়ে ১০ই জানুয়ারী স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন।ঐদিন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন পুরোজাতি,  কখন তাঁদের নেতা দেশের মাটিতে পা রাখবেন। এ যেন হৃদয় দিয়ে হৃদ্রতার অনুভব ও অনুভূতির মঞ্চে দাঁড়িয়ে জাতির পিতাকে বরণ করে নেওয়ার অপেক্ষা। জাতির পিতা স্বাধীন দেশে পা রেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন এবং বলেন, আমি প্রস্তুত ছিলাম; আমি বলেছিলাম, আমি মানুষ, আমি মুসলমান- এক বার মরে দু’বার মরেনা। আমি আমার বাঙ্গালী জাতিকে অপমান করে যাব না, তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব না। বঙ্গবন্ধু ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়েও বাংলাদেশ ও বাঙ্গালী জাতির কথা হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছেন, বাঙ্গালীর প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, তোমরা আমার সাত কোটি বাঙ্গালীকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না, আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হবেই"। বঙ্গবন্ধুর এই দৃঢ়চেতা নেতৃত্ব, সাহসিকতা, এবং বঞ্চিত ও নিগৃহীত বাঙ্গালীর মুখে হাসি ফুটানোর দৃঢ়প্রত্যয়ই তাঁকে বাঙ্গালী জাতির পিতার আসনে বসিয়েছে। 
সদ্য প্রতিষ্ঠিত যুদ্ধবিধ্বস্ত, সীমিত ভুমি ও বিশাল জনগোষ্ঠীর বাংলাদেশকে টিকে থাকতে হলে যে খুব সূক্ষ্মভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে তা সুদক্ষ রাষ্ট্রপরিচালক হিসেবে বঙ্গবন্ধু ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন।  বঙ্গবন্ধু পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে দেশে ফিরে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়ভার গ্রহণ করার পরপরই বার্মা, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও সোভিয়েত ব্লকের অনেক দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।  প্রথম চার মাসেই বিভিন্ন দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের জন্য অতিবজরুরী বিষয়াদি সম্পর্কে সহায়তা নিশ্চিত করেছিলেন। দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলার পাশাপাশি তাঁর উদার কূটনৈতিক তৎপরতা পাকিস্তানে আটক বাংলাদেশের বিভিন্ন পেশাজীবীর মানুষকে দেশে ফিরিয়ে আনে। ১৯৭২ সালের মার্চের প্রথম সপ্তাহে মস্কো সফরে আন্তর্জাতিক বিষয়াদি এবং দেশের পুনর্গঠন নিয়ে সোভিয়েত নেতাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বৈঠক করেন।  ১৯৭৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করে এবং  ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে বাঙালি জাতিয়তাবাদকে সম্মানজনক আসনে অধিষ্ঠিত করেন। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদাশীল ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন। খুব স্বল্প সময়ে ১১৬ টি দেশের স্বীকৃতি এবং ওআইসি, কমনওয়েলথ ও  জাতিসংঘসহ ২৭ টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ অর্জনের মধ্যদিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর উদার ও দক্ষ বিশ্বনীতির মাধ্যমে পিতা হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের জন্য ভবিষ্যতের শক্ত-মজবুত ভিত্তি স্থাপন করেন। 
বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে বিশ্ব ইতিহাসের সেরা সংবিধান উপহার দিয়ে ছিলেন। চারটি মূলনীতি-বাঙালি জাতিয়তাবাদ, ধর্ম নিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র এর সমন্বয়ে সংবিধান বাঙ্গালির আত্নপরিচয়, সম্প্রীতির বন্ধন, সম্পদের সুষম বণ্টন ও জনগণের দাঁরা নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, তারই প্রত্যয় বহন করে। বাঙালি জাতিয়তাবাদ বাঙ্গালির আত্নপরিচয়, আর এই আত্নপরিচয়ের উপজীব্য বিষয় বাঙ্গালির ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মহান মুক্তিযুদ্ধের গৌরব গাঁথা । বাঙ্গালির আত্নপরিচয়ের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু নিহিত, উজ্জীবিত। কাজেই এই আত্নপরিচয়ের উপজীব্য বিষয়গুলোকে রক্ষা করতে হবে, চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে, তরুণ প্রজন্ম যাতে এই বিষয়গুলো ধারন ও লালন করে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তবেই বঙ্গবন্ধু যুগে যুগে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন জাতির পিতা হিসাবে, বাঙ্গালির মুক্তির কাণ্ডারি হিসাবে।  
 লেখকদ্বয় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যথাক্রমে হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগ এবং কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। 

What's Your Reaction?

like
1
dislike
0
love
1
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0