বঙ্গবন্ধু : জাতির আত্মপ্রকাশের প্রতীক

বঙ্গবন্ধু : জাতির আত্মপ্রকাশের প্রতীক

ড. শিরীন আকতার

ছাত্র রাজনীতিতে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান আমল থেকেই আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তান সরকার পূর্ব পাকিস্তানের ওপর যে অকথ্য অত্যাচার, নির্যাতন ও শোষণ করেছে, তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে প্রচণ্ড প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিল। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই বুঝতে পেরেছিলেন, এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি। ব্রিটিশ শাসনের জাঁতাকল থেকে মুক্তি পেয়ে বাঙালিরা নতুন করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তার আজ্ঞাবাহকদের দ্বারা শোষিত ও নির্যাতিত হতে থাকবে। পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে সমাবর্তন উৎসবে ঘোষণা দেন, উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। শেখ মুজিবসহ আরও দু'জন ছাত্রনেতা তাৎক্ষণিকভাবে 'না না না' ধ্বনি দিয়ে এর প্রতিবাদ জানান।

এ থেকে শুরু হয় প্রতিবাদী চেতনার নতুন রূপ। তমুদ্দন মজলিশ নামক সংগঠনটি ঢাকায় গঠিত হওয়ায় বঙ্গবন্ধু ওই সংগঠনসহ ছাত্র ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে গঠন করেন 'রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ'। এই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ পালিত হয় 'ভাষা দিবস'। ১৯৪৮ সালের শেষ দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক নৌযাত্রায় বিখ্যাত গায়ক আব্বাসউদ্দীনের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দেখা হয়।

বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ''তিনি আমাকে বলেছিলেন- 'মুজিব, বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে বিরাট ষড়যস্ত্র চলছে। বাংলা রাষ্ট্রভাষা না হলে বাংলার কৃষ্টি, সভ্যতা সব শেষ হয়ে যাবে। আজ যে গানকে তুমি ভালোবাস, এর মাধুর্য ও মর্যাদাও নষ্ট হয়ে যাবে। যা কিছু হোক, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতেই হবে।' আমি কথা দিয়েছিলাম এবং কথা রাখতে চেষ্টা করেছিলাম" ('অসমাপ্ত আত্মজীবনী', পৃষ্ঠ ১১১)।

১৯৪৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সংগঠিত করার আন্দোলনে আইনের ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি বহিস্কৃত হন। ভারত বিভক্তির পর পাকিস্তানের, বিশেষ করে বাঙালি জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগের পরিধি কমেনি। প্রদেশব্যাপী চলছিল পাকিস্তানি শাসক বাহিনীর অত্যাচার ও নির্যাতন। বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও চেতনাকে মুছে ফেলতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী একের পর এক ষড়যন্ত্র চালিয়ে যেতে থাকে। বঙ্গবন্ধু মানুষের আবেগ সম্পর্কে সম্যকভাবে অবগত ছিলেন। মুসলিম লীগের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে ঢাকার রোজ গার্ডেনে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন গঠিত হয় প্রথম নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ। এতে মওলানা ভাসানী সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও শেখ মুজিব যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। মুসলিম লীগবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে একত্র করার ব্যাপারে দলীয়ভাবে তৎপর হন তিনি। গঠন করেন নির্বাচনী মোর্চা যুক্তফ্রন্ট। সম্মিলিত বিরোধী দলের অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে ১৯৫৪ সালে মুসলিম লীগ রাজনীতির ভরাডুবি ঘটে। কিন্তু কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকার আদমজীতে বাঙালি-অবাঙালি দাঙ্গার অজুহাতে ৯২ (ক) ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট সরকারের পতন ঘটায়। শেখ মুজিব মন্ত্রী থাকাকালে দলের স্বার্থে মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে ২১ দফা কর্মসূচি ছিল পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে আঞ্চলিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য থেকে বের হয়ে আসার নীতিচিত্র। বঙ্গবন্ধুর জবানিতে- 'কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল জানে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসনের জন্য জনমত সৃষ্টি করেছে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দিন দিন বেড়ে চলেছে, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মিলিটারিতে বাঙালিদের স্থান দেওয়া হচ্ছে না- এ সম্বন্ধে আওয়ামী লীগ সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে কতগুলি প্রচারপত্র ছাপিয়ে বিলি করেছে সমস্ত দেশে' ('অসমাপ্ত আত্মজীবনী', পৃষ্ঠা ২৫৮)।

এ সময় থেকে বাঙালির স্বাধিকারের বীজ বপন করতে থাকেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৬১ সালের শুরুতে আন্দোলন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টির এক গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিব সেদিন স্বাধীনতার দাবিকে আন্দোলনের কর্মসূচিতে রাখার জন্য অনুরোধ করেন কমরেড মণি সিংহকে। কমিউনিস্ট পার্টির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক খোকা রায় তার 'সংগ্রামের তিন দশক' গ্রন্থে লিখেছেন, 'শেখ মুজিব তুললেন এক মৌলিক প্রশ্ন। তিনি বললেন, এসব দাবি-দাওয়া কর্মসূচিতে রাখুন, কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু একটা কথা আমি খোলাখুলি বলতে চাই, আমার বিশ্বাস, গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন এসব কোনো দাবিই পাঞ্জাবিরা মানবে না। কাজেই স্বাধীনতা ছাড়া বাঙালীদের মুক্তি নেই। স্বাধীনতার দাবীটা আন্দোলনের কর্মসূচিতে রাখা দরকার' ('স্বাধীনতার সশস্ত্র প্রস্তুতি :মুহাম্মদ শামসুল হক, পৃষ্ঠা ১৪)।

'৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, '৬৪-এর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিরোধী আন্দোলন, '৬৫-এর মৌলিক গণতন্ত্রীপন্থায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ইত্যাদি কর্মকাণ্ডে তিনি ব্যক্তিগত ও দলীয়ভাবে সক্রিয় থাকেন। এ সময় পূর্ব বাংলায় সেনাবাহিনী বা নৌবাহিনীর কোনো সদর দপ্তর ছিল না। এ ছাড়া পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক বৈষম্য ছিল পাহাড়সমান। এ বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে তিনি জাতির সামনে বাঙালির ন্যায্যতা ও শাসন সংবলিত ৬ দফা দাবি পেশ করেন।

শেখ মুজিবুর রহমান এ সময় শত বিরোধিতা, কারাবাস, নির্যাতন উপেক্ষা করে আন্দোলন এগিয়ে নেন। শাসকগোষ্ঠী শেখ মুজিবুর রহমানসহ বাঙালি আমলা, সেনাবাহিনীর মেধাবী সদস্য, ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদদের ফাঁসানোর জন্য আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা রুজু করে। কিন্তু ছাত্রসমাজ ১১ দফা দাবিতে রাজপথে নামে। আন্দোলনের উত্তাল তরঙ্গে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করা হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ রেসকোর্সে এক সংবর্ধনায় তাকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি প্রদান করে। ১৯৭০ সালে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান দেশব্যাপী সাধারণ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধু '৭০-এর নির্বাচনকে '৬ দফার প্রতি গণভোট' হিসেবে গ্রহণ করেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। কিন্তু ইয়াহিয়া-ভুট্টোর চক্রান্তে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসতে না দিয়ে সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে বাঙালিরা রাস্তায় নামে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। সেখান থেকে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। তাঁর সুদৃঢ় ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বের বুকে অভ্যুদয় ঘটেছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের।

বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ-তিতিক্ষা, কারাজীবন, চারিত্রিক দৃঢ়তা, সাহসিকতা তথা জনগণকে বোঝার দূরদৃষ্টি ও সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষিপ্রগতি আমাদের চলার পথের পাথেয়। একটি অসাম্প্রদায়িক শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকুক, এটাই প্রত্যাশা করি। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদের এই লড়াকু নেতা বেঁচে থাকবেন আমাদের মেধা, মননে ও আদর্শে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরুর বিখ্যাত 'নিয়তির সঙ্গে অভিসার' অভিভাষণটির একটি কথা মনে করতে পারি- 'কোনো কোনো মুহূর্ত আসে, ইতিহাসে হয়তো তা খুব কমই আসে, যখন আমরা পুরোনো থেকে নতুনের দিকে যাত্রা করি- যখন কোনো যুগের অবসান হয়, তখন কোনো জাতির অবদমিত আত্মপ্রকাশের ভাষা খুঁজে পায়।' বাঙালি জাতির আত্মাও যখনি অবদমিত হয়েছে, শোষণ-বঞ্চনার শিকার হয়েছে, তার প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভাষা খুঁজে পেয়েছে বঙ্গবন্ধুর মধ্যে। বাঙালি জাতির অনুপ্রেরণার আরেক নাম তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0