বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ ও চোখের জলে ভেজা একটি চিঠি

বঙ্গবন্ধু, আওয়ামী লীগ ও চোখের জলে ভেজা একটি চিঠি

অজয় দাশগুপ্ত:

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র দু’ বছরও পূর্ণ হয়নি। কিন্তু এ সময়ের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও নানাভাবে বঞ্চিত। বিশেষভাবে প্রকট হয়ে উঠেছে রাষ্ট্র ভাষার প্রশ্ন। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি প্রত্যাখান হওয়ার ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল পালিত হয়। কলিকাতা থেকে ঢাকায় সবেমাত্র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র স্থানান্তরিত করে আসা তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান এই হরতালের দিনে গ্রেফতারবরণ করেন। তবে তারও দুই মাস ৭ দিন আগে ৪ জানুয়ারি তিনি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামের নতুন ছাত্র সংগঠন জন্ম দিয়েছিলেন, যে সংগঠনকে পাকিস্তানে প্রথম সরকারবিরোধী বলিষ্ঠ কণ্ঠ বললে অত্যুক্তি হবে না। ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ সংগঠন নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগকে এভাবে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য অপরিমেয় সাহস ও দূরদর্শিতা প্রয়োজন ছিল। তিনি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ সংগঠনের দিকে নজর দিলাম। প্রায় সকল কলেজ ও স্কুলে প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠল। বিভিন্ন জেলায়ও শক্তিশালী সংগঠন গড়ে উঠতে থাকল। সরকারি ছাত্র প্রতিষ্ঠানটি শুধু খবরের কাগজের মধ্যে বেঁচে রইল। ছাত্রলীগই সরকারের অন্যায় কাজের প্রতিবাদ ও সমালোচনা করেছিল। কোনো বিরুদ্ধ দল পাকিস্তানে না থাকায় সরকার গণতন্ত্রের পথ ছেড়ে একনায়কত্বের দিকে চলছিল।’ [পৃষ্ঠা ১০৯]

ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার পরও বঙ্গবন্ধুর ছাত্রজীবন চলছে। তিনি আইন বিভাগের ছাত্র। ১৯৪৯ সালের এপ্রিল মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিম্নবেতনভুক কর্মচারীদের আন্দোলনের সমর্থন করার অভিযোগে তাঁর ছাত্রত্ব চলে যায়। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের অবসান ঘটে এভাবে। কিন্তু জীবন থেকে যে পাঠ তিনি নিয়েছেন তা কাজে লাগিয়ে ক্রমে হয়ে ওঠেন জননন্দিত নেতা। জনগণ তাকে বরণ করে নেয় বঙ্গবন্ধু হিসেবে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব প্রদানের মধ্য দিয়ে বরণীয় হন জাতির পিতা শ্রেষ্ঠ মর্যাদার আসনে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দুঃখ-কষ্টে থাকা কর্মীদের পাশে দাঁড়ানোর ‘অপরাধে’ তাঁর স্থান হয়েছিল কারাগারে। এই কারাবাসের সময়েই জন্ম নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। মওলানা আবদুল হামিদ খান সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক ও শেখ মুজিবুর রহমান জয়েন্ট সেক্রেটারি। কিন্তু শুরু থেকেই দলের প্রাণপুরুষ তিনি। আওয়ামী লীগ গঠনের তিন দিন পর ২৬ জুন তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। জেলগেটে তাকে অভ্যর্থনা জানাতে মওলানা আবদুল হামিদ খানা ভাসানিসহ বিপুল সংখ্যক রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও ছাত্ররা হাজির হয়েছিল। ছিল ব্যান্ড পার্টি। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেছেন, প্রকৃতপক্ষে সেদিনই আওয়ামী লীগে ‘যুবরাজের অভিষেক’ সম্পন্ন হয়েছিল, আর তা করেছিলেন সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানি। তিনিও যে ভবিষ্যৎ দেখতে পেয়েছিলেন!

দলের প্রাণপুরুষ দলকে গণভিত্তি প্রদানের জন্য, তৃণমূলে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য এই ভূখণ্ডের এক প্রান্ত— থেকে অপর প্রান্তে— ছুটে গেছেন। একবার-দু’বার নয়, বার বার। সে সময়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্গম ছিল। কিন্তু তিনি সংকল্পবদ্ধ ছিলেন ‘এ তুফান ভারি, দিতে হবে পাড়ি...।’

আমরা জানি, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ ভূখণ্ড পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত থাকার দুই যুগের অর্ধেকের বেশি সময় কাটিয়েছেন কারাগারে। বাকি সময় নিবেদিত থেকেছেন দলের জন্য, স্বাধীনতার জন্য। দলে তখন অনেক নেতা। কিন্তু তিনিই অগ্রণী, বাংলার মানুষকে সুখী করার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগস্বীকারে এগিয়ে গেছেন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রথম যুগে তিনি কোথায় কোথায় গিয়েছেন, কী বলেছেন সেটা জানার জন্য আমি Secret Documents of Intelligence Branch (IB) on Father of the Nation Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman শিরোনামে যে পাঁচ খণ্ড গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোর সহায়তা নিয়েছি। এতে ১৯৪৮ সালের জানয়ারি থেকে ১৯৫৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত— সময়ের তথ্য রয়েছে। ষাটের দশকের রাজনৈতিক দৃশ্যপট ছিল ভিন্ন। পঞ্চাশের দশকে যে সংগঠন তিনি গড়ে তুলেছেন, ততদিনে তা প্রস্তুত পাকিস্তনের শাসকগোষ্ঠীকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য। তাঁর নামে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ জনগণকে সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ করে ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্নভিন্ন করে দিতে পেরেছে। নেতৃত্ব দিয়েছে মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে।

পাকিস্তনের গোয়েন্দা বিভাগ ১৯৪৮ সালের শুরুতে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিদিনের প্রতি মুহূর্তের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের ওপর নজর রাখার জন্য ব্যক্তিগত ফাইল খোলে, যার নম্বর ছিল পি.এফ. ৬০৬-৪৮। গোয়েন্দারা তাকে প্রকাশ্যে ও গোপনে অনুসরণ করত। তিনি কী করছেন, কী বলছেন; জানাতে হতো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে। যখন তাকে পাকিস্তানের জন্য বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তখন বয়স ২৮ বছর পূর্ণ হয়নি। কিন্তু পাকিস্তান সরকার ও মুসলিম লীগ নেতৃত্ব ‘শত্রু’ চিহ্নিত করতে একটুও ভুল করেনি। তিনি ঢাকায় অবস্থান করেন, কিন্তু গোটা পূর্ব পাকিস্তান হয়ে ওঠে কাজের এলাকা।

অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে রাজনৈতিক-সাংগঠনিক সফর প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আতাউর রহমান সাহেব ও আমি পাবনা, বগুড়া, রংপুর ও দিনাজপুরে প্রোগ্রাম করলাম। নাটোর ও নওগাঁয় কমিটি করতে পেরেছিলাম, কিন্তু রাজশাহীতে তখনও কিছু করতে পারি নাই। দিনাজপুরে সভা করলাম, সে দিন বৃষ্টি ছিল। তাই লোক বেশি হয় নাই। রাতে এক কর্মী সভা করে রহিম সাহেবের নেতৃত্বে একটা জেলা কমিটি করলাম। এইভাবে বিভিন্ন জেলায় কমিটি করতে পারলাম। কিন্তু রাজশাহীতে পারলাম না। পাবনায়ও কেউ এগিয়ে আসল না।... এইভাবে উত্তরবঙ্গ সেরে আবার দক্ষিণবঙ্গে রওনা করলাম। কুষ্টিয়া, যশোরে ভাল কমিটি হল। খুলনায় কোন বয়েসী লোক পাওয়া গেল না।... জুন, জুলাই, আগস্ট মাস পর্যন্ত— আমি বিশ্রাম না করে প্রায় সমস্ত জেলা ও মহকুমা ঘুরে আওয়ামী লীগ শাখা গঠন করতে সক্ষম হয়েছিলাম।’ [পৃষ্ঠা ২২০]

কীভাবে তাকে অনুসরণ করা হতো তার বিবরণ পাই ১৯৫২ সালের ২৮ এপ্রিলের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। এর দুদিন আগে দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব অর্পিত হয় তাঁর ওপর। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয় : শেখ মুজিব মানিক মিয়াকে নিয়ে সাড়ে নয়টার বাড়ি থেকে বের হন এবং ৯টা ৫৫ মিনিটে ৯ হাটখোলার প্যারামাউন্ট প্রেসে পৌঁছান। ১০টা ৫ মিনিটে শেখ মুজিব প্রেস থেকে বের হয়ে ১০টা ২৫ মিনিটে ৯৪ নওয়াবপুর রোডের আওয়ামী লীগ অফিসে পৌছান। সেখানে ১২টা ১৫ মিনিট থেকে ১২ টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত— আলী আমজাদ তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। ১২ টা ৩৫ মিনিটে তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগ অফিস ত্যাগ করেন এবং ১ টা ১৫ মিনিটের দিকে ১৫০ মোগলটুলিতে পৌছান। ২ টা ১৫ মিনিটের দিকে তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে বাসে ওঠে চকের দিকে যান। এ কারণে আইবি ওয়াচার তাকে সাইকেলে অনুসরণ করতে পারেনি। ৪ টার দিকে তিনি মোগলটুলিতে ফিরে আসেন। ২৭ এপ্রিল বার লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠেয় সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রায় ৪০ জন এ অফিস থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন। রাত ১১ টা ৩০ মিনিটের দিকে তিনি বাড়ি ফেরেন। [গোয়েন্দা প্রতিবেদন, দ্বিতীয় খণ্ড পৃষ্ঠা ১৭০]

জেলায় জেলায় ঝটিকা সফরের একটি পর্যায়েই তাঁর জীবনে বড় আনন্দের খবর আসে; তৃতীয় সন্তানের জন্ম। নাম রাখা হয় শেখ জামাল। ১৩ মে (১৯৫৩) ঢাকার গোয়েন্দা বিভাগ পোস্ট অফিস থেকে ৭১ রাধিকা মোহন বসাক লেন ঠিকানার সহিদ নামের এক ব্যক্তির লেখা একটি চিঠি হস্তগত করে। প্রাপকঃ ভাবি, সি/ও, মৌলভী মুসা মিঞা, টুঙ্গিপাড়া শেখ বাড়ি, পাটগাতি, ফরিদপুর। চিঠিতে ৫ মে, ১৯৫৩ তারিখ দেওয়া ছিল। চিঠিটি গোয়েন্দারা আটকে রাখেনি, তবে কপি রেখে দিয়েছিল। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের তৃতীয় খণ্ডে এ চিঠিটি প্রকাশ করা হয়েছে ২৩৪ পৃষ্ঠায়। গোয়েন্দা বিভাগের অনুমান, এই ভাবি হচ্ছেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। চিঠিতে লেখা হয়, ‘ভাবি, একটু আগেই ভাইজান এসে সংবাদ দিল যে কামালের একটি ছোট ভাই হয়েছে। ... ভাইজান এখুনি বেরিয়ে গেলেন পাবনা ট্যুরে, ২ দিন পরে ফিরে আসবেন। সেখান থেকে এসে ফরিদপুর ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের ইলেকসন-এর জন্য ফরিদপুর যাবেন। ফরিদপুর থেকে ২/১ দিন পর ঢাকায় ফিরে একদিন পর মৌলানা ভাষানীকে নিয়ে আপনাদের বাড়ী যাবেন বেড়াতে অবশ্য ২ দিনের জন্য। মৌলানা ভাষানী ২ দিন আপনাদের বাড়ী বিশ্রাম নেবেন। সুতরাং আপনি সেইমত প্রস্তুত হয়ে থাকবেন। মৌলানা সাহেবের সঙ্গে হয়ত ২/৪ জন অন্য অতিথিও থাকতে পারে। ইতি- সহিদ। পূনঃ : ভাইজান একখানা চিঠি যাবার বেলায় লিখে দিয়ে গেল, সঙ্গে পাঠালাম।

ভাইজান অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর চিঠিটি নিম্নরূপ :

স্নেহের রেণু। আজ খবর পেলাম তোমার একটি ছেলে হয়েছে। তোমাকে ধন্যবাদ।... খুব ব্যস্ত, একটু পরে ট্রেনে উঠব।... ইতি তোমার মুজিব।

শেখ জামালের জন্মের পর এ চিঠিটি লেখা, তাতে সন্দেহ নেই। প্রিয়তম স্ত্রী, সদ্য জন্ম নেওয়া পুত্র সন্তান; সংবাদ পেয়ে তাদের দেখতে কে না তাৎক্ষণিক ছুটে যায়! কিন্তু ৫ মে শেখ মুজিবুর রহমান মওলানা ভাসানীসহ পাবনায় রয়েছেন, সেটা আমরা এই গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ২২৪ পৃষ্ঠাতেই পাই।

মাত্র কয়েকদিন আগে সন্তান জন্ম দেওয়া স্ত্রীর কাছে অনুরোধ করা হয়েছে, দলের সভাপতি গোপালগঞ্জের বাড়িতে ২/৪ জন অতিথি নিয়ে ২ দিন থাকবেন। তিনি যেন সেই মত প্রস্তুত থাকেন। বার্তা স্পষ্ট থাকা-খাওয়া-যত্নে যেন ত্রুটি না হয়। বঙ্গমাতা জীবনের যে কোনো কঠিন সময়েও, কর্তব্যে অটল, সর্ব গুণে গুণাণ্বিত! তাঁর ওপরে ভরসা রাখা যায়।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের নানা স্থানে স্ত্রী এবং কন্যা শেখ হাসিনা (তিনি লিখেছেন হাচিনা) ও শেখ কামালের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার মর্মস্পশী বিবরণ রয়েছে। ২১০ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘হাচিনা ও কামাল আমাকে ছাড়তে চায় না, ওদের উপর আমার দুর্বলতা বেড়ে গেছে। রওনা করার সময় দুই ভাইবোন খুব কাঁদল।’

৫ মে’র লেখা চিঠি কি বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হাতে পেয়েছিলেন? পেয়ে থাকলে কতটা চোখের জলে চিঠিটি ভেসেছিল, সে বিবরণ নেই গোয়েন্দা প্রতিবেদনে। মওলানা ভাসানী বঙ্গবন্ধুর টুঙ্গিপাড়া বাড়িতে ওই সময়ে গিয়েছিলেন কীনা, সেটাও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে পাওয়া গেল না। কিন্তু ‘সহিদ’ ও ‘মুজিব’ নামের দু’জনের চিঠির প্রতিটি শব্দে স্পষ্ট জাতির পিতার কাছে বরাবরই ‘সবার ওপরে দেশ, তাহার ওপরে নাই...।’ পরিবারের সান্নিধ্য, ব্যক্তিজীবনে সুখ শান্তি— সব কিছু তিনি ত্যাগ করেছিলেন বাংলাদেশ নামে ভূখণ্ডটি প্রতিষ্ঠার বহু আগেই।

কিন্তু এ তো বাইরের রূপ। জাতির পিতা মনে-প্রাণে সর্বদা চেয়েছেন বাবা-মা, প্রিয়তম স্ত্রী ও সন্তানদের সান্নিধ্য। এ জন্য যে ব্যাকুলতা, সেটা রেখে দিয়েছেন নিজের ভেতরে। ১৯৬৭ সালে যখন তিনি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ লিখছেন, তখন প্রকৃতই ফাঁসির দণ্ডের শঙ্কা। কারাগারের ভেতরে-বাইরে শ্বাপদের আস্ফালন, হুঙ্কার। সেই গ্রন্থেই তিনি ১৭ বছর আগের একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তাকে ২৬ অক্টোবর (১৯৫০) গোপালগঞ্জ পাঠানো হচ্ছিল স্থানীয়ভাবে দায়ের করা একটি মামলার বিচারের জন্য। সে সময় খুলনাগামী স্টিমার নারায়ণগঞ্জ থেকে ছেড়ে বরিশাল শহর হয়ে গোপালগঞ্জের মধুমতি নদীতে পাটগাতি গ্রামে থামত। এ স্টিমারেই তাকে কড়া পুলিশী প্রহরায় গোপালগঞ্জে পাঠানো হয়। তিনি রাতে স্টিমার থেকে নেমে স্টেশন মাস্টারের কাছে বাড়ির খবর জানতে চান। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘যা ভয় করেছিলাম তাই হল, পূর্বের রাতে আমার মা, আব্বা, রেণু ছেলেমেয়ে নিয়ে ঢাকায় রওনা হয়ে গেছেন আমাকে দেখতে। এক জাহাজে আমি এসেছি। আর এক জাহাজে ওরা ঢাকা গিয়েছে। দুই জাহাজের দেখাও হয়েছে একই নদীতে। শুধু দেখা হলো না আমাদের। এক বৎসর দেখি না ওদের।’ [পৃষ্ঠা ১৭৬]
ভালবাসার গল্প, জীবনের গল্প, মানবতার উপখ্যান নিয়ে বিশে।ব কত চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। কারাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের বয়স তখন ত্রিশ বছর। চলেছেন আদালতে হাজিরা দিতে নিজের এলাকায়। অন্যদিকে স্ত্রী সন্তান ও শ্বশুর-শাশুরি নিয়ে চলেছেন ঢাকা কারাগারে রাজবন্দির সঙ্গে দেখা করতে। বিপরীতমুখী দুই জাহাজ পরস্পরকে অতিক্রম করে গেলেও তাদের দেখা হলো না! মহত্তম মানবিক চলচ্চিত্রের কী নিঁখুত চিত্রনাট্যই তুলির আচরে এঁকেছেন আমাদের জাতির পিতা!

আর কী মর্মস্পশী বিবরণ! কী চমৎকার উপস্থাপনা! যখন এ ঘটনা, তখন বঙ্গবন্ধু কারাবন্দি। যখন স্মৃতিচারণ করেছেন, তখনও কারাবন্দি। কিন্তু কেবল স্মৃতিচারণ নয়, সাহিত্যের দাবি পূরণেও পূর্ণ মাত্রায় সচেতন তিনি। রাজনীতির কবি বা পোয়েট অব পলিটিক্স অভিধা যারা দিয়েছেন, সন্দেহ নেই রাজনীতিবিদ ও মানবিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যথার্থ উপলব্ধি করতে পেরেছেন।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭১ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি জন্ম শতবর্ষে বিনম্র শ্রদ্ধা।

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0