বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ নেতারা বিশ্বাসঘাতকতা করেন : মানস ঘোষ

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ নেতারা বিশ্বাসঘাতকতা করেন : মানস ঘোষ

বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের সবই জানতেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। পারিপার্শ্বিক ঘটনা থেকে স্পষ্ট মনে হয়, জিয়া এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তিনি সবকিছু জানতেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বাঁচাতে পারতেন। এই জঘন্য হত্যাকাণ্ড থেকে ইতিহাসকে নিষ্কৃতি দিতে পারতেন। কিন্তু জেনারেল জিয়া এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেননি। বরং চুপ থেকে খুনিদের মৌন সমর্থন দিয়ে গেছেন। শোকাবহ পনের আগস্ট ঘিরে ষড়যন্ত্র এবং তাতে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের সম্পৃক্ততা নিয়ে এমনটিই বললেন ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক, মহান মুক্তিযুদ্ধের বিদেশি বন্ধু মানস ঘোষ।

বাংলা ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে এক সেমিনারে যোগ দিতে সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছেন ভারতের ইংরেজি দৈনিক স্টেটসম্যানের সাবেক সম্পাদক মানস ঘোষ। রাজধানীর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ভোরের কাগজের সঙ্গে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, মোশতাক-জিয়া চক্র, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর পশ্চিমবাংলার অবস্থা, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান বাংলাদেশের ইতিবাচক এগিয়ে যাওয়া নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন মুক্তিযুদ্ধের এই বিদেশি বন্ধু। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই জিয়াকে আমি চিনি। একাত্তরে তার সঙ্গে রৌমারীতে কিছুদিন ছিলাম। তিনি এমন কিছু যুদ্ধও করেননি। শেষে খামোখা একটা জেড ফোর্স করেছিলেন। আর খন্দকার মোশতাক সুযোগসন্ধানী এবং অত্যন্ত চতুর। তার আচরণ ছিল ব্যাঙ্গাত্মক। চিবিয়ে চিবিয়ে কথা বলতেন আর আমাকে দেখলেই ‘বাবু’ বলে একটা ক্রুর হাসি দিতেন।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের আগে বাংলাদেশের সার্বিক পরিবেশ কেমন ছিল- এমন প্রশ্নের জবাবে মানস ঘোষ বলেন, ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে স্টেটসম্যানের বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে আমি ঢাকার সেগুনবাগিচায় থাকতাম। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের শেষের দিকে হঠাৎ করে বঙ্গবন্ধু এবং তার সরকারের বিরুদ্ধে নানাধরনের অপপ্রচার শুরু হয়। এতে জনমানুষের ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আমি এখানকার সমাজে একটা বিষয় খেয়াল করেছি, কিছু হলেই মানুষ প্রথমে বলে, ফাঁসি চাই। আরে আগে বিচার করো! বিচার যদি বলে, ফাঁসি, তাহলে ফাঁসি দিতে হবে। খালি বলে, কল্লা চাই, কল্লা চাই। তখনই আঁচ করতে পেরেছিলাম, খারাপ কিছু একটা হচ্ছে। আমার দেশের অনেকেই খারাপ কিছু আশঙ্কা করছিলেন এবং সেগুলো নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে সতর্ক করছিলেন। কিন্তু সেই খারাপ কিছুর মানে যে সপরিবারে তাকে মেরে ফেলা হবে এটা ভাবতেই পারিনি।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রভাব পশ্চিমবঙ্গে পড়েছিল কি না এর জবাবে তিনি বলেন, আগস্টের হত্যাকাণ্ড ছিল আমাদের কাছে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। মেঘ ছিল, কিন্তু বজ্রপাত অবিশ্বাস্য ছিল। আমার স্ত্রী যখন সকালে আমাকে জানালেন আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। কলকাতা গণমাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের মর্মান্তিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। রাস্তায় মানুষ নেমেছিল। অনেকেই কান্নাকাটি করেছেন। আমাকে অফিস বলল, তুমি একটু নর্থ বেঙ্গল দিয়ে খবর সংগ্রহের চেষ্ট করো; রংপুর দিয়ে মানুষ আসছে কি না! অনেক আওয়ামী লীগ নেতা তখন রংপুর দিয়ে ভারতে পালিয়েছিলেন। আমি তখন শিলিগুড়িতে যাই। সেখানে কয়েকজনের সঙ্গে দেখা হয়। কিছু খবর পাই। সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতারা যাদের অনেকেই বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন তারা কিভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন, এসব কিছু খবর পাই এবং প্রতিবেদন তৈরি করি। পরে ভারতে আশ্রয় নেয়া নাসিমসহ বেশ কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে আমার যোগাযোগ হয়েছিল। তাদের কাছ থেকেও তথ্য পেয়েছিলাম। আপনার দৃষ্টিতে কেমন ছিলেন বঙ্গবন্ধু- এর উত্তরে প্রবীণ এই সাংবাদিক বলেন, বঙ্গবন্ধুকে যথেষ্ট কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তার সঙ্গে অসংখ্যবার অনেক জায়গায় আমার দেখা হয়েছে। অত্যন্ত উদার মানুষ ছিলেন বঙ্গবন্ধু। দেখা হলেই প্রথমে জিজ্ঞেস করতেন কেমন আছি।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করে মানস ঘোষ বলেন, সংশ্লিষ্ট সোর্সের তথ্য পেয়ে আমি একটা প্রতিবেদন করি, পাকিস্তানি ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচার করবেন না বঙ্গবন্ধু। এ নিয়ে তো একেবারে হইচই কাণ্ড। খবর পড়ে ইন্দিরা গান্ধী ফোন করলেন বঙ্গবন্ধুকে। ফোন পেয়ে বিচলিত বঙ্গবন্ধু। তখন আমাদের হাইকমিশন ছিলেন সুবিমল দত্ত। তিনি ফোন করলেন, তুমি কি লিখেছ বলো? আর কে তোমাকে এই তথ্য দিয়েছে? আমি বললাম, কে দিয়েছে এই তথ্য আমি বলব না। আমি সমর্থনযোগ্য জায়গা থেকে তথ্য পেয়েছি। জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান তখন বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারি ছিলেন। আর সহকারী প্রেস সেক্রেটারি ছিলেন আমিনুল হক বাদশা। বাদশা ভোর ৬টায় আমার বাড়িতে এসে হাজির। বললেন, আপনাকে বঙ্গবন্ধু ৯টার সময় ডেকেছেন। পুরনো গণভবনে। আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান। বঙ্গবন্ধু আমাকে চিনতেন। তখন রোজ সন্ধ্যাবেলায় পুরনো গণভবনে প্রেসের সঙ্গে কথা বলতেন। বিরাট বারান্দায় আমাদের ডেকে বসিয়ে প্রেস কনফারেন্স করতেন। তো আমি গেলাম। বললেন, ও হ্যাঁ। তোমাকে তো দেখেছি। তুমি তো পোলাপান। তুমি কী লিখছ? কে দিয়েছে তোমাকে খবর? বললাম, স্যার সেটা তো বলা যাবে না। বললেন, তোমাদের তো আবার কিসব এথিকস-টেথিকস আছে। আমি জানি তুমি বলতে পারবে না। কী খাবে বল? থাকো কই? থাকার কোনো অসুবিধা নেই তো? বললাম সেগুনবাগিচায় থাকি। ভালোই আছি। বললেন, আচ্ছা মিয়া, একটা কথা কই, যা শোনো, সবই নিউজ করতে হয়? রিপোর্ট করতে হয়? বললাম, যার কাছ থেকে সংবাদটা পেয়েছি, তিনি তো বলেছেন আপনি মনস্থ করে ফেলেছেন। বললেন, খবরটা সত্য নয়। জিজ্ঞেস করলেন, বেকড হিলসা খাইছ কখনো? আমার এখানে ভালো বেকড হিলসা বানায়। তখন উনার জন্য সকালের নাস্তা তৈরি করা হচ্ছিল। আমাকে পাশে বসে খাওয়ালেন। আমাকে খাইয়ে দাইয়ে বাদশাকে বললেন, ও এখন যাবে। কোনো উষ্মা প্রকাশ করেননি।

বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখার মধ্যে সবচেয়ে সুখকর স্মৃতি কোনটা, যা এখনো আপনাকে নাড়া দেয়- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন অভিভাবক। তার দ্বার সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। তার প্রেস কনফারেন্সে বলা নেই, কওয়া নেই লোকজন চলে আসত। পায়ে পড়ে বলত, স্যার, কষ্ট করে এসেছি। মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিলাম, কেউ পাত্তা দিচ্ছে না। আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার এই অসুখ হয়েছে। যদি আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন! উনি দুহাত ধরে তুলে পাশের সিটে বসাতেন, যা কোনো প্রধানমন্ত্রী করবেন না। তার সেক্রেটারিকে ডেকে চা, খাবারের ব্যবস্থা, চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিতেন। মেডিকেল কলেজ হোক, মিটফোর্ড হোক, যেখানে পারো ভালো ব্যবস্থা কর। পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা উর্দুভাষী দম্পতি ওয়াসিউদ্দীনকেও সহায়তা করতে দেখেছি। এগুলো আমাকে নাড়া দেয়। মানস ঘোষ বলেন, ‘আমাকে কেউ কিছু করবে না’ বঙ্গবন্ধুর এই ওভার কনফিডেন্সটাই আমার অবাক লাগত। বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে আমাকে আর বাংলাদেশে আসতে দেয়া হয়নি। জিয়া আসতে দেয়নি। ১৯৭৮ সালে যখন রেফারেন্ডম করল, তখন ছাড় দিয়েছিল, ওই সময় ফের আসি। এরশাদের সময় আমাকে বের করে দেয়া হয়েছিল এদেশ থেকে। খালেদা জিয়াও আমাকে আসতে দেয়নি। পুরো পাঁচ বছর। ব্লু্যাক লিস্টে ছিলাম।

বর্তমান বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশকে সোনার বাংলা গড়তে চেয়েছিলেন। আর বর্তমানে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের মর্যাদা দিতে চান। বঙ্গবন্ধুকন্যা সঠিক পথেই এগুচ্ছেন। তবে উনাকে একটু মূল্যবোধের রাজনীতিটা ফিরিয়ে আনতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চর্চাটা আরো ব্যাপক আকারে হওয়া উচিত। স্কুলের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

প্রসঙ্গত, মানস ঘোষের জন্ম ১৯৪৩ সালের ৩০ আগস্ট দিল্লিতে। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজিতে স্নাতক । দি স্টেটসম্যান পত্রিকায় কাব রিপোর্টার হিসেবে সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িত হন ১৯৬৬ সালে। ৫৫ বছর সাংবাদিকতা শেষে ২০১৫ সালে অবসরে যান বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রণাঙ্গনের প্রথম সচিত্র প্রতিবেদন তৈরি করা এই সাংবাদিক।

প্রকাশঃ ভোরের কাগজ, রবিবার, ৪ আগস্ট ২০১৯
লিঙ্কঃ www.bhorerkagoj.com/print-edition/2019/08/04/264280.php

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0