বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন ভাবনা

বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন ভাবনা

বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার এই অঞ্চলে যে স্বল্প সংখ্যক ক্ষণজম্মা ও প্রকৃত অর্থে মানবপ্রেমী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে সক্রিয় ও সফল ভূমিকা এবং অসামান্য অবদান লক্ষ্য করা যায়, তাঁদের মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কেবল অন্যতমই নন, সম্ভবত তাঁর অবস্থান সবার শীর্ষে। ক্ষণজম্মা বললাম এজন্য যে, বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাসে এরকম রাজনৈতিক মনীষীর জম্ম হয়নি। তাই তিনি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি। তাঁর জীবন ও রাজনীতি বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহাসিক বিবর্তন ও ক্রমবিকাশমান ধারায় ভৌগলিক সীমারেখায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক আর্থ-সামাজিক ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। বাঙালির হাজার বছরের লালিত আশা-আকাক্সক্ষা, বেদনা-বিক্ষোভ; সর্বোপরি আবহমান বাংলার বৈশিষ্ট্যকে তিনি নিজের জীবনে আত্মস্থ করেছেন। তাঁর কণ্ঠে বাঙালি জাতির সার্বিক মুক্তির আকাক্সক্ষা প্রতিধ্বনিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সার্থক মূর্ত প্রতীক। তিনি বিশ^শান্তি আন্দোলনের একজন মহান সৈনিক এবং সমকালীন বিশ্বের মানব জাতির মুক্তি সংগ্রামে নিবেদিতপ্রাণ শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্থপতি, বাঙালি জাতির জনক ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা। বাঙালি জাতীয়তাকে বঙ্গবন্ধু আমাদের চিন্তা-চেতনা ও মননে গেঁথে দিয়েছেন। তাই বঙ্গবন্ধুর নামে ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায় রচিত হয়।

ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য কোনো কিছুই তাঁর প্রয়োজন হয়নি। পাকিস্তানি শাসকবর্গের চাপিয়ে দেওয়া দীর্ঘ সময়ের বঞ্চনা, নিপীড়ন ও অবিচার থেকে বাঙালি জাতিকে মুক্ত করে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার বিরামহীন সংগ্রামে তিনি তাঁর সমগ্র জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। জেল-জুলুম, ভয়-ভীতি, লোভ-লালসা, ষড়যন্ত্র কোনো কিছুই তাঁকে তাঁর মানুষদের কাছে থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি। তাই বলা হয়, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ অবিচ্ছেদ্য। মনে রাখতে হবে যে, বঙ্গবন্ধু পূর্বাপর একজন অনমনীয় ও অনন্য সংগ্রামী ব্যক্তিত্ব। এ ক্ষেত্রে তাঁকে ভারতীয় উপমহাদেশের স্বস্বাধীনতা সংগ্রামের ধারায় ১৮৫৭ এর প্রথম স্বস্বাধীনতা যুদ্ধের বীর-সংগ্রামীদের এবং তিতুমীর প্রমুখের সংগ্রামী ঐতিহ্য ধারার উত্তর-সাধক বলা চলে নিশ্চিত ভাবেই। আশৈশব সংগ্রামী ভূমিকায় তিনি কখনোই কোথাও কোনো আপোষ করেননি। একারণেই তাঁকে বারংবার কারাবন্দি হতে হয়েছে।

অঁদ্রে মঁশিয় মালরো। ফরাসি দেশের খ্যাতনামা কবি, দার্শনিক এবং একই সঙ্গে একজন সৈনিক। বঙ্গবন্ধুকে দেখে তাঁর মনে হয়েছিল “এক অশ্বারোহী সেনানায়ক যিনি ক্রুসেডের কালে অনায়াসে সেনাবাহিনীতে স্থান পেতে পারতেন। সেই পুরনো দিনের সেনানায়কদের মতোই তিনি মর্যাদামন্ডিত, উদারমনা এবং ভাবপ্রবণ।” ঘাতকের বুলেটে নিহত বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে কাব্যিক রূপকের ভাষায় মালরোর একটি উক্তির ভাবার্থ ছিল এরকম : “ধ্যানী বুদ্ধ মানব সেবা শেষ করে যখন মোক্ষ লাভ করেন এবং আলোর জগতে প্রবেশ করেন তখন আকাশে সারসরা উড়ছিল। একই সারসরা যখন পৃথিবীর এক সেনাপতি এবং কর্মযোগীর দিকে উপর থেকে তাকাল তখন তিনিও আলোয় উদ্ভাসিত হলেন।” শত্রুরা বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। কিন্তু মৃত বঙ্গবন্ধু শতগুণ আলোকিত হয়ে প্রতিটি বাঙালির মননে গ্রোথিত হয়ে রয়েছেন। মালরোর চেতনায় তিনি এক ঐতিহাসিক বিজয়ীদের’ মিছিলে স্থান নিয়েছেন যে মিছিল এরকম – মুজিব-গান্ধী, গান্ধী-নেহেরু, নেহেরু-শার্ল দ্য গল, শার্ল দ্য গল-মালরো।

দুই
ইতিহাসের আলোচনায় আবেগ পরিহার্য। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কোনো আলোচনায় আবেগ অনিবার্য, অন্তত বাঙালি জনমানুষের কাছে। যাই হোক, এবার মূল বিষয়ের দিকে ফেরা যাক – অবশ্যই সাধ্য ও সক্ষমতায় যতটা সম্ভব।
বঙ্গবন্ধুর জীবনবোধ এবং সমাজ ও রাষ্ট্রদর্শন থেকে তাঁর উন্নয়ন চিন্তা চেতনার কিছু উপাদান খুঁজে পাওয়া যায়। সামষ্টিক বিচারে বঙ্গবন্ধুর সমগ্র রাজনৈতিক কর্মকান্ডের মূল অনুষঙ্গ হলো তাঁর দেশের মানুষ এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তাদের ভাগ্যের উন্নয়ন। তাঁর সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখার ইতিকথা কেবল পাকিস্তান আমলের অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময়ের নয়, তারও আগের। বঙ্গবন্ধু সর্বভারতীয় রাজনীতি অপেক্ষা বাংলার রাজনীতি, বাংলার ভাগ্য নিয়ে বেশি ভাবতেন। বাংলার দুঃখী মানুষের কথা তাঁর রাজনৈতিক কর্মে ও ভাবনায় কৈশর থেকেই স্থান করে নিয়েছিল। তাই বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মের ইতিহাস একাধারে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে পরস্পর সম্পর্কিত এবং সমসাময়িক কালে প্রবিষ্ট ও বিকশিত।
স¦স্বাধীনতা উত্তর সময়ে বাংলাদেশের প্রায় ৮০ ভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করত এবং তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ ভাগ মানুষ ছিল ক্ষুদ্র কৃষক, ভূমিহীন কৃষি শ্রমিক ও দিন মজুর এবং অর্থনীতি ছিল কৃষি নির্ভর। এই বিপুল দরিদ্র জনগোষ্ঠির জীবনমান উন্নয়ন ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাই এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সরকার গ্রাম উন্নয়নের এক সামষ্টিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছিল- যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষি জমিতে সেচ ও সারের ব্যবহার বৃদ্ধি, শস্য উৎপাদনের বিকেন্দ্রীকরণ, গ্রাম সমবায়, ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষি জমির খাজনা মওকুফ, গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ এবং কর্ম সুযোগ বৃদ্ধির জন্য গ্রামীণ কুটির শিল্প স্থাপনে উৎসাহ প্রদান। তাছাড়া কৃষকের কাছে তার শস্যের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তির সুযোগ সৃষ্টির জন্য ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছিল। সে সময়ে গ্রামীণ খাতে উৎপাদন সম্পর্ক প্রতিকূল থাকায় ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে আয় ও সম্পদের বণ্টনে বিরাট বৈষম্য ছিল। এ বিষয়টি নিয়ে বঙ্গবন্ধু পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন।
স্বস্বাধীনতার অব্যবহিত পরে পরিত্যক্ত বড় শিল্প কারখানা, ব্যাংক, বিমা ও বৈদেশিক বাণিজ্যের একাংশ জাতীয়করণ করা হয়। কিন্তু পরিচালন ব্যবস্থার ক্রুটি ও শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বঙ্গবন্ধু সরকারের শিল্প জাতীয়করণ নীতি সম্পূর্ণ সফল হয়নি। দীর্ঘকাল যাবত অব্যাহত বাণিজ্য ঘাটতির প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর সময়ে রপ্তানি বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রচলিত পণ্যের পাশাপাশি অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির পদক্ষেপ গৃহীত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে আমাদের রপ্তানি বৃদ্ধিতে অপ্রচলিত পণ্যের অবদান অনেক বেড়েছে। তবে শিল্প, বাণিজ্য যাই বলা হোক না কেন, বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় গ্রাম উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন, কৃষক ও খেটে খাওয়া দরিদ্র মানুষের আয় ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, সমগ্র অর্থ ব্যবস্থায় সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস বিশেষ অগ্রাধিকার পেয়েছিল।

নতুন রাষ্ট্রের বিকাশ ও অগ্রগতি বহুলাংশে শিক্ষা ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল- এই উপলব্ধি থেকে বঙ্গবন্ধু দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, বিজ্ঞান সম্মত ও মানসম্মত করার লক্ষ্যে দেশের প্রথিতযশা বিজ্ঞানী ড. কুদরত-ই-খুদাকে প্রধান করে ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই ১৯ সদস্য বিশিষ্ট শিক্ষা কমিশন গঠন করেন। ১৯৭৪ সালে ৩০ মে ৩৬ টি অধ্যায়ে বিভক্ত ৪৩০ পৃষ্ঠা নিয়ে ‘খুদা কমিশন’ রিপোর্ট প্রকাশিত হয় যা আজ পর্যন্ত একটি চমৎকার শিক্ষানীতি হিসেবে সর্বমহলে বিবেচিত ও প্রশংশিত হয়। কমিশনের রিপোর্টে বঙ্গবন্ধুর অবদান সম্পর্কে বলা হয় : “প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগ্রহ, উৎসাহ ও সাহায্য ব্যতিরেকে কমিশনের পক্ষে এ দুরুহ কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হত না। আমরা তার কাছে বিশেষভাবে ঋণী ও কৃতজ্ঞ।” এতেই বোঝা যায়, নিজের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু ব্যক্তিগতভাবে কতটা আগ্রহী ছিলেন। জাতির দুর্ভাগ্য, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বস্বাধীনতা বিরোধী ঘাতক চক্রের দ্বারা বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরে কুদরত-ই-খুদা শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন স্থগিত করা হয়।

তিন
গণমুখি শিক্ষা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর দৃষ্টি ছিল অত্যন্ত স্বচ্ছ। ‘সবার জন্য শিক্ষা’ ব্যতিত আমাদের উন্নতি অগ্রগতির যে উপায় নেই তা তিনি যর্থাথই উপলব্ধি করেছিলেন। শিক্ষাকে তিনি উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করেছেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বেতার ও টেলিভিশন ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “সুষ্ঠু সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য শিক্ষাখাতে পুঁজি বিনিয়োগের চেয়ে উৎকৃষ্ট বিনিয়োগ আর কিছু হতে পারে না।” জাতীয় উৎপাদনের শতকরা কমপক্ষে ৪ ভাগ সম্পদ শিক্ষাখাতে ব্যয় হওয়া উচিত বলে তিনি বলেন। কলেজ ও স্কুল শিক্ষকদের বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি এবং দ্রুত মেডিকেল ও কারিগরি শিক্ষা প্রসারের জন্য তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। মাধ্যমিক শিক্ষার দ্বার সকল শ্রেণির জন্য খোলা রাখতে হবে মর্মে তিনি তার ভাষণে উল্লেখ করেন।
স্বস্বাধীনতা উত্তর বঙ্গবন্ধু সরকার গণমুখি শিক্ষার বিষয়কে শুধুমাত্র সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েই থেমে থাকেননি, বরং নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এ লক্ষ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। খুদা কমিশনের রিপোর্ট সম্পন্ন হওয়ার আগেই ১৯৭৩ সালে দেশের ৩৬ হাজার ১৬৫ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারিকরণ করা হয়। এছাড়াও প্রায় ১১ হাজার নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকার সরকারি করা হয়। বঙ্গবন্ধু সরকার ৫৪ হাজার নতুন প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ করেন। বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
তিনি দেশের ৫টি বড় সরকারি কলেজের মান উন্নয়ন করে সেগুলোকে পর্যায়ক্রমে ডিগ্রি প্রদানকারী বিশ^বিদ্যালয় কলেজে রূপান্তরিত করতে চেয়েছিলেন। তাঁর সরকার ১৯৭৩ সালে ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয়ের কালাকানুন বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়ন করে। মুক্ত জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে বঙ্গবন্ধু বিশ^বিদ্যালয়গুলোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, ‘বিশ্বের উন্নত ও প্রগতিশীল দেশসমূহে শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের পাঠ্যসূচি ও শিক্ষাক্রম সম্পর্কে যে ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে – আমাদের দেশ এখনও তা থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে।’ তিনি আরও মনে করতেন, বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা শুধু যে জীবন-বিমুখ তা নয়, গণতন্ত্রের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত ক্ষীণ, শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, পাঠ্যপুস্তক রচনা, শিক্ষাদান পদ্ধতি ও শিক্ষা প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনায় গণতন্ত্রের অভাব বেশ প্রকট। বাঙালি জাতির দীর্ঘকালের শিক্ষা সমস্যার প্রতিকারের আগ্রহ থেকেই বঙ্গবন্ধুর চেতনায় এসব কথা স্থান পেত।
সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীদের প্রতি তাঁর ছিল সুদৃষ্টি ও সচেতনতা। রবীন্দ্র সঙ্গীতকে তিনি জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দিয়েছেন। নজরুলের কবিতাকে করেছেন বাংলাদেশের রণগীতি। বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামকে নিয়ে এসেছেন কোলকাতা থেকে ঢাকায়। সর্বোচ্চ সম্মানের সাথে তাঁকে বাসভবন ও ভাতা প্রদান করেছেন। কবির নাম অনুসারে ঢাকার একটি সড়কের নাম দিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ। জেলখানা থেকে মুক্তি দিয়ে তিনি কবি আল মাহমুদকে চাকরি দিয়েছেন। নাটকের উপর থেকে প্রমোদ কর ও সেন্সর প্রথা সহজ করে তিনি সংস্কৃতি চর্চার দ্বার প্রসারিত করেন।
বঙ্গবন্ধু প্রাদেশিক মন্ত্রী থাকাকালে ১৯৫৫ সালের ৩ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৫৭ সালের ৪ এপ্রিল তিনি প্রাদেশিক আইন পরিষদে চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা বিল উত্থাপন করেন। তিনি বাংলাদেশের ছায়াছবি নির্মাণের গোড়াপত্তন করেন।
বঙ্গবন্ধুর একান্ত উদ্যোগে ১৯৭৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে যে আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে সোভিয়েট ইউনিয়ন, জার্মানি, হাঙ্গেরী, মঙ্গোলিয়া ও ভারতসহ কয়েকটি দেশের কবি-সাহিত্যিকগণ অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনটি উদ্বোধন করে বঙ্গবন্ধু গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। তিনি বলেন, “দীর্ঘকালব্যাপি নানামুখি শোষণ ও বঞ্চনার ফলে আমরা আজ দরিদ্র, ক্ষুধার্ত ও নানা সমস্যায় জর্জরিত হলেও আমরা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দিক থেকে দরিদ্র নই। আমাদের ভাষায় দু’হাজার বছরের একটি গৌরবময় ইতিহাস আছে। যারা এদেশে সাহিত্য সাধনা করছেন তাঁদেরকে দেশের জনগণের চিন্তা-চেতনা, আনন্দ-বেদনা এবং সামগ্রিক অর্থে তাদের জীবন প্রবাহ দেশের শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবশ্যই ফুটিয়ে তুলতে হবে।”
বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির আদি সাহিত্যকর্ম ও ইতিহাস সংরক্ষণ, গণমানুষের সঙ্গীত ও নাট্যচর্চা এবং জাতীয় ঐতিহ্যের সাথে সংগতিপূর্ণ শিল্পকর্মের প্রতি কেবল শ্রদ্ধাশীলই ছিলেন না, সেগুলোকে তিনি আবেগের সাথে সযতেœ মনের গভীরে লালন করতেন।
বঙ্গবন্ধু আজ আমাদের মাঝে নেই। তবে মানব প্রেমিক এই মহান নেতা তাঁর দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির উন্নয়নে তাঁর নিজস্ব চেতনা ও নির্দেশনা রেখে গেছেন।

চার
বঙ্গবন্ধু বৈষম্যহীন সমাজ ও কল্যাণ রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রবর্তনে বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। তিনি অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থায় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। তিনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করে গেছেন। বিশ^বিখ্যাত আইনজীবী ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সন ম্যাকব্রাইড বলেছিলেন, “শেখ মুজিব বুঝতে পেরেছিলেন, স্বস্বাধীনতা শুধু পতাকা পরিবর্তন ও দেশের নতুন নামকরণ বোঝায় না, তাঁর দৃষ্টিতে স্বস্বাধীনতার অর্থ হলো সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও নীতিবোধ সম্পন্ন আদর্শবাদ।”
বাংলাদেশের সংবিধানে গৃহীত স্বস্বাধীনতার আদর্শ ও মূল্যবোধের মূল নীতিগুলো হলো- গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। বঙ্গবন্ধুর সকল কর্মযজ্ঞে এই চার নীতির প্রতিফলন থাকত। বঙ্গবন্ধু কল্যাণধর্মী ও উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেছেন সারা জীবন। কিন্তু গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় কি না তা তিনি চেষ্টা করে দেখতে চেয়েছিলেন। এ প্রেক্ষিতে অনেক বিশ্লেষকদের মতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন মূলত একজন সমাজতান্ত্রিক এবং একই সঙ্গে একজন উৎসাহী জাতীয়তাবাদী।
বঙ্গবন্ধু প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনা গ্রহণ করেন- যাতে স্থানীয় ভাবে ক্ষমতা ও সম্পদ ন্যস্ত করার উদ্যোগ গৃহীত হয়। এ কর্মসূচি বঙ্গবন্ধুর বাধ্যতামূলক গ্রাম সমবায়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট – যা তাঁর একটি অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ছিল।

জেলা, থানা ও গ্রাম এ তিন স্তর ভিত্তিক প্রশাসন ব্যবস্থার লক্ষ্য হবে রাজধানীতে কেন্দ্রীভুত ক্ষমতা ও সম্পদকে প্রত্যন্ত এলাকায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা যেখানে স্থানীয় উন্নয়নের প্রকৃত কাজকর্ম চালু থাকবে। উন্নয়নের মূল একক হবে গ্রাম। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত গ্রাম সরকার স্থানীয় ভাবে কর সংগ্রহ ও জেলা থেকে বরাদ্দ পাবে। গ্রাম সরকারের প্রধান দায়িত্ব হবে- গ্রামীণ জনশক্তির ব্যবহার, ভূমি সংস্কারের প্রাথমিক কর্মসূচি প্রণয়ন, উফসি চাষের সম্প্রসারণ, পরিপূরক উপকরণ সরবরাহ, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রসার, পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং গ্রামীণ কৃষি ভিত্তিক শিল্প স্থাপনে উৎসাহ প্রদান। গ্রাম পরিকল্পনার ভিত্তিতে থানা পরিকল্পনা প্রণীত হবে। জেলা সরকার থানা ও গ্রাম পর্যায়ে গৃহীত এসব উন্নয়ন কর্মসূিচ তদারক ও সমন্বয় করবে। জেলা পর্যায়ের শিল্পগুলোর জন্য ‘জেলা শিল্পায়ন সংস্থার’ হাতে ক্ষমতা ও সম্পদ থাকবে।
এই প্রশাসনিক সংস্কারের ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে স্থানীয় সরকারের এবং গ্রামের সঙ্গে শহরের ব্যবধান কমবে। উৎপাদনশীল সম্পর্ককে বাইরে থেকে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে উৎপাদনের প্রত্যক্ষ স্বস্বাধীনতা দেয়ার ফলে উদ্যোক্তা দক্ষতার বিকাশ ঘটবে। প্রশাসন এবং জনগণের এসব দক্ষতা উৎপাদনশীল খাতের দিকে প্রবাহিত হবে।

পাঁচ
অতীব দুঃখের বিষয়, বঙ্গবন্ধুর ধারণা সৃষ্ট প্রস্তাবিত এই প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নীতি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। কেননা বাস্তবে এর অনুশীলন কেমন করে সম্ভব তা জানা ছিল না। উল্লেখ্য, উপরে বর্ণিত বিকেন্দ্রীকরণ কর্মসূচি কেবল একটি বিশ্লেষণ মাত্র। এটাকে বঙ্গবন্ধুর মৌলিক পরিকল্পনার ব্লু -প্রিণ্ট হিসেবে ধরে নেয়া ঠিক হবে না।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিকভাবে বিপ্লবী ছিলেন না। আবার তিনি ধনবাদী অর্থনীতির একনিষ্ঠ সমর্থকও ছিলেন না। তাই দেখা যায়, স্বস্বাধীনতার পরে তিনি জাতীয়করণ নীতি পরিহার করেননি। আবার ব্যক্তিখাতে ছোট ছোট উৎপাদক প্রতিষ্ঠান চালু রাখার সিদ্ধান্তও গৃহীত হয়েছিল। অর্থাৎ স্বস্বাধীনতার পরে বঙ্গবন্ধুর সময়ে বাংলাদেশে মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল- যদিও ১৯৭৫ পরবর্তী সময়ে জাতীয়করণ নীতি পরিহার করে মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে দেশকে পরিচালনা করা হয়।
স্বাধীন বাংলাদেশের চার বছরের অভিজ্ঞতা ছিল নিদারুণ। দেশ পরিচালনায় বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পরাজিত ও দেশবিরোধী শক্তির ষড়যন্ত্রে দেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট ঘণীভুত হচ্ছিল। বঙ্গবন্ধু বুঝতে পেরেছিলেন, নতুন পথ খুঁজে বের করতে না পারলে মুক্তি নেই। স্বনির্ভর হতে হলে এবং স্বস্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে হলে প্রথমে দরকার ঔপনিবেশিক উৎপাদন ও প্রশাসন কাঠামোর পরিবর্তন। তাই তিনি দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন গোটা অর্থনৈতিক- সামাজিক ব্যবস্থার আমুল পরিবর্তন, চেয়েছিলেন ঔপনিবেশিক নির্ভরতা থেকে মুক্তি। হয়তো সেটা স্বল্প সময়ে সম্ভব না ও হতে পারে, কিন্তু তা নিরাপদ ভবিষ্যত সৃষ্টি করবে নিশ্চিতভাবে- এভাবেই চিন্তা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু।
সা¤্রাজ্যবাদী চক্র মেনে নেয়নি দরিদ্র বাংলাদেশের আত্মনির্ভর হয়ে ওঠার প্রস্তুতি। পরিণতি কী হয়েছে তা আমরা জানি। বীরের মত মৃত্যুবরণ করেছেন বঙ্গবন্ধু, যীশু খ্রীষ্টের মত, মহাত্মা গান্ধীর মত। ঘাতক হরণ করতে পারেনি তাঁর আত্মমর্যাদা।
জনৈক গবেষকের ভাষায়- “বঙ্গবন্ধুকে আজ আমরা পেয়েছি এই ইতিহাসের পাদপীঠে- যেখানে তাঁর আশা- আকাক্সক্ষায়, ভালবাসা- বেদনায় আর কর্মের প্রবাহে তিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন আবহমান বাংলা ও বাঙালিকে। বঙ্গবন্ধুকে আমরা হারিয়েছি – এই মর্মান্তিক কথাটি কখনও আমাদের অন্তরে সত্য হতে পারে না।”

মহাকবি শেলীর ভাষায়
“সে বেঁচে আছে, সে জেগে আছে –
মৃত্যুই গতায়ু আজ, সে নয় কখনই।”
বাংলাদেশের আপামর মানুষের ভালবাসায় বঙ্গবন্ধু মৃত্যুঞ্জয় হয়ে আছেন। কালের চিরন্তন বেলায় তাঁর নীতি, আদর্শ ও মূল্যবোধ তাঁকে দিয়েছে অমরত্বের গৌরব।
(১৮ আগস্ট ‘বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় পঠিত প্রবন্ধ)
লেখক : মো. নূরল আলম, প্রাক্তন চেয়ারম্যান, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ড ও সভাপতি, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, রাজশাহী মহানগর

সোনার দেশ, ১৩ জানুয়ারি, ২০২০

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0