বঙ্গবন্ধুর অন্তঃকক্ষ ভাষণে ভাষা

বঙ্গবন্ধুর অন্তঃকক্ষ ভাষণে ভাষা

ড. শ্যামল কান্তি দত্ত

শুক্রবার , ২০ মার্চ, ২০২০

পাকিস্তান গণপরিষদে শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম ভাষণ দেন ২৫ আগস্ট ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দ। গণপরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণেই তিনি পাকিস্তানকে এক ইউনিট করবার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ জানিয়ে দক্ষ এ রাজনীতিবিদ তাঁর বক্তব্যের উপসংহারে একটি শর্ত জুড়ে দেওয়ার রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করেন। আর এ শর্ত না মানলে পরিণাম কী হতে পারে সে হুমকি দিতেও ভোলেননি। তিনি বলেন: ‘বাংলা নামের নিজস্ব ইতিহাস আছে, ঐতিহ্য আছে। …আপনারা যদি এটা পরিবর্তন করতে চান, আপনাদের বাংলায় ফিরে যেতে হবে এবং তাদেরই জিগ্যেস করতে হবে তারা এটা পরিবর্তন চায় কি না। … জুলুম মাৎ করো ভাই। যদি এই বিল আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন তাহলে বাধ্য হয়েই আমাদের অসাংবিধানিক পথ বেছে নিতে হবে। আপনারা সাংবিধানিক পথে এগোবার চেষ্টা করেন।
এই বক্তব্যে তিনি আরও যুক্তি সহকারে পূর্ববাংলা নাম পাল্টিয়ে পূর্ব পাকিস্তান নামকরণের প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন।
১৯৫৫ সালের ২১ শে সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানানো ছাড়াও তিনি বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগ চান। স্পিকার ওহাব খান পশতু ভাষা না-জানা সত্ত্বেও একজন সদস্যকে ওই ভাষায় বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করার সুযোগ চান। কিন্তু অনুমতি না পেয়ে-কিছুক্ষণ ইংরেজিতে ভাষণ দিয়ে আবার বাংলায় তিনি বলতে শুরু করেন: ‘আমরা ইংরেজি বলতে পারবো, তবে বাংলাতেই আমরা বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। যদি পরিষদে আমাদের বাংলায় বক্তৃতার সুযোগ না দেওয়া হয় তবে আমরা পরিষদ বয়কট করবো। … বাংলাকে অবশ্যই প্রতিষ্ঠা করবো। বলা বাহুল্য বঙ্গবন্ধুর বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করবার সংগ্রাম এখনও অব্যাহত আছে। তাঁর দেওয়া সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদে: ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’ উৎকলিত আছে বটে তবে সর্বস্তরে তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এরপর পশ্চিম পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ এক করে পশ্চিম পাকিস্তান ঘোষণা করবার বিলের সমাপ্তি আলোচনায় ৩০ শে সেপ্টেম্বর ১৯৫৫ খ্রি. তিনি আরও সোচ্চার কণ্ঠে বলেন, ‘এদের কাছ থেকে মধু আমরা আশা করতে পারি না। তাদের কাছ থেকে বরাবরই বিষ আশা করতে পারি। পাকিস্তানের জনগণ আরো বিষ আশা করতে পারেন। বঙ্গবন্ধুর এই বক্তব্যও কাব্যগুণে সমৃদ্ধ। তাঁর এই বক্তব্যে উপমা-রূপক ও সাহিত্যগুণ কতোটা তার উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়: গত শতকের আশির দশকের শেষদিকে চট্টগ্রামের বহুল জনপ্রিয় আঞ্চলিক গান লিখেন আহমেদ বশির; গানের কথা: মধু কই কই বিষ খওয়াইলা (অনেকে লিখেন: মধু হই হই বিষ হাওইলা)। বাংলার লোকসাহিত্যের মধু-বিষ উপমার এই সাদৃশ্য থেকে সহজেই অনুমান করা যায় শেখ মুজিবের বক্তব্য কতোটা আকর্ষণীয়, কতোটা বাংলার জনগণের চির চেনা, কতোটা আপন।
ঊনিশশো বাহাত্তরের ৪ঠা নভেম্বর জাতীয় সংসদে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত হবার মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের স্বরূপ উন্মোচিত হয়। অতি সাধারণ ভাষায় বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন: ‘ভাষাই বলুন, শিক্ষাই বলুন, সভ্যতাই বলুন, আর কৃষ্টিই বলুন, সকলের সাথে একটা জিনিস রয়েছে, সেটা হলো অনুভূতি। …এই সংগ্রাম হয়েছিল যার উপর ভিত্তি করে সেই অনুভূতি আছে বলেই আজকে আমি বাঙালি, আমার বাঙালি জাতীয়তাবাদ। সংবিধানের আরেকটি স্তম্ভ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে ধর্মহীনতা নয়।’ এ প্রসঙ্গে তপন পালিত যথার্থই লিখেছেন: ‘এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু ইংরেজি সেক্যুলারিজম এর বাংলা করেছিলেন ধর্মনিরপেক্ষতা এবং এর নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, যার বিরোধিতা মৌলবাদীরা যেমন করেছে, বামপন্থীরাও করেছে। মৌলবাদীরা বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মহীনতা বলেছে। আরবি ও উর্দু অভিধানে সেক্যুলারিজম-এর অনুবাদ করা হয়েছে লা দ্বিনীয়া এবং দুনিয়াঈ। এ দুটি শব্দের বাংলা অনুবাদ হচ্ছে ধর্মহীনতা ও ইহজাগতিকতা। বঙ্গবন্ধু সেক্যুলারিজম-এর বাংলা করেছেন ধর্মনিরপেক্ষতা, যার অর্থ রাষ্ট এবং রাজনীতি থেকে ধর্ম পৃথক থাকবে। বামপন্থীরা বলেছেন সেক্যুলারিজম-এর বাংলা অনুবাদ হবে ইহজাগতিকতা, ধর্মনিরপেক্ষতা নয়। তিনি জেনে বুঝেই সেক্যুলারিজম-এর বাংলা ধর্মনিরপেক্ষতা করেছেন।’র এখানে বঙ্গবন্ধু কেবল তাঁর রাজনৈতিক দর্শন ব্যাখ্যা করেননি, একজন সফল পরিভাষাবিদ হিসেবেও তাঁর স্বাক্ষর রেখে গেছেন।
ভাষাবিজ্ঞানে পরিভাষা মানে সংজ্ঞার্থ শব্দ। যথাযথ পরিভাষা না থাকার কারণেই রাষ্ট্রের সর্বত্র বাংলা ভাষা ব্যবহারে সমস্যা দেখা দিতে পারে-একথা অনুধাবন করে ১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন- ‘আমি ঘোষণা করছি, আমাদের হাতে যেদিন ক্ষমতা আসবে, সেদিন থেকেই দেশের সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হবে। বাংলা ভাষার পণ্ডিতরা পরিভাষা তৈরি করবেন, তারপর বাংলা ভাষা চালু হবে, সে হবে না। পরিভাষাবিদরা যত খুশি গবেষণা করুন, আমরা ক্ষমতা হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষা চালু করে দেব, সে বাংলা যদি ভুল হয়, তবে ভুলই চালু হবে, পরে তা সংশোধন করা হবে।’ (ঢাকা : দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১)। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে বঙ্গবন্ধু যে কত আন্তরিক ছিলেন, ওপরের ভাষ্য থেকে তা সম্যক উপলব্ধি করা যায়। অথচ অপ্রিয় হলেও সত্য, তাঁর এ অঙ্গীকার বাস্তবায়ন আজও অসমাপ্ত। ৭ই মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু কেবল স্বাধীনতার কথাই বলেননি, আমাদের মুক্তির কথাও বলেছিলেন; সেই মুক্তির অঙ্গীকারই ৭২-এর সংবিধানের চারটি মূল স্তম্ভরূপে প্রকাশ পেয়েছে। তাইতো বাঙালির প্রথম সংবিধান উপস্থাপনে রাষ্ট্রপতির ভাষণটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শেষ করেছিলেন এই বলে: ‘…ভবিষৎ বংশধররা যদি সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে শোষণহীন সমাজ গঠন করতে পারে, তাহলে আমার জীবন সার্থক, শহীদের রক্তদান সার্থক।
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে গণভবনে মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে এবং আরও কিছু ভাষণে বঙ্গবন্ধুর বুলি-মিশ্রণ ও বুলি-লম্ফন প্রয়োগের প্রমাণ মেলে। বুলি-মিশ্রণ (code mixing) ও বুলি-লম্ফন (code shifting / code switching) দুটি ভাষাবিজ্ঞানের পরিভাষা। ভাষাবিজ্ঞানে বুলি-মিশ্রণ হল ‘একটা ভাষার কথাবার্তায় অন্য ভাষার শব্দ বা পদবন্ধ মিশিয়ে ভাষাটাকে একটা মিশ্র চরিত্র দেয়, কিন্তু অন্য ভাষার একটানা বাক্য বলে না। …আর বুলি-লম্ফন হল এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় চলে যাওয়া। তাতে অন্য ভাষার অন্তত একটা পুরো বাক্য থাকবে। অর্থাৎ একটা বক্তব্য অন্তত সে ভাষার ব্যাকরণ মেনে পুরো বাক্যে প্রকাশিত হবে। যেমন-‘খবরের কাগজে যা পড়ি তিন দিন পরে পুলিশ রিপোর্টে তা আসে নাথিং মোর দ্যান দ্যাট। এই সম্বন্ধে একটু মেহেরবানি করে আপনাদের এজেন্সিকে স্ট্রং করে ফেলেন। এই সম্বন্ধে আপনাদের কাছে অনুরোধ আপনারা যারা হাই অফিসিয়াল আছেন অনুরোধ করবো শ্রম দেন। … This is Bangladesh. This is not Pakistan. Independent country. …, যদি কেউ না পারে…। যদি একচ্যুয়াল খবর অ্যাডমিনিস্টটররা যদি একচ্যুয়াল খবর না পায় তাহলে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন চলতে পারে না, ডিসিশন নিতে পারে না এবং এক্সপ্লেইন ভুল হয়।’ (১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৩, ঢাকা, পৃ. ২১৭)।
এই উদ্ধৃত ভাষণের বাক্যগুলোতে বাংলা বর্ণমালায় লিখিত বাক্যগুলো বুলি-মিশ্রণের উদাহরণ, আর ইংরেজি বর্ণমালায় লিখিত বাক্যগুলো বুলি-লম্ফনের উদাহরণ। এছাড়াও এসব ভাষণেও কিছু অসম্পূর্ণ বাক্য কিংবা এমন কিছু বাক্য পাওয়া যায় যেগুলো বাংলা ভাষার ব্যাকরণ সম্মতও নয়। তবে এ বিষয়গুলো বিচারে আধুনিক ভাষাতাত্ত্বিক দর্শন (modern linguistc philosophy) বিবেচনায় নিয়ে এগুতে হবে। কেননা, ভাষাবিজ্ঞানী (linguist) মাত্রেই স্বীকার করবেন: ‘প্রকৃত বাক্য পর্যালোচনা করে একজন ভাষাভাষীর প্রয়োগ বা সম্পাদনা রীতি পর্যালোচনা করা যেতে পারে কিন্তু সেইটে থেকে তার ভাষাজ্ঞানের আংশিক উদ্ঘাটন সম্ভব মাত্র। একজন মানুষের ভাষা ক্ষমতা এবং ভাষা প্রয়োগের মধ্যে পার্থক্য এই কারণেও গুরুত্বপূর্ণ যে আমরা যখন কথা বলি তখন তা প্রায়শই ব্যাকরণ সম্মত হয় না। সে কারণেই ব্যাকরণের লক্ষ্য মানুষের ভাষা ব্যবহার নয় বরং ভাষাজ্ঞান। আর তাই ভাষণের ভাষায় অপূর্ণ বাক্যের ব্যবহার দেখানো-তা যতই বস্তুুনিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে হোক না কেন-ব্যাকরণের লক্ষ্য নয়। সে আলোচনাও ভাষাবিজ্ঞান (linguistics) নয়। সুতরাং, সমাজভাষাবিজ্ঞানীর দৃষ্টিতে বর্তমান বাঙালি সমাজের দিকে তাকালেও দেখা যাবে এমন বাংলিশ গোছের ভাষা এখন অনেকেই অহরহ বলছেন। বাংলা বাক্যে ইংরেজি শব্দ মিশিয়ে কিংবা বাংলা সংলাপে দুএকটা ইংরেজি বাক্য ঢুকিয়ে দিয়ে নিজের আভিজাত্য জাহির করছেন। এর কারণ সম্পর্কে বাংলাদেশের ভাষাবিজ্ঞানীর অব্যর্থ অবলোকন: ‘ইংরেজি শিক্ষিত বাঙালির অসচেতন ভাষা-অভ্যাসে এ ধরনের কথা শোনা যায়, এতে বোঝা যায় যে, দ্বিভাষিকতার মধ্যে তাঁরা দুটি ভাষার ব্যাকরণকে আলাদা রাখতে পারেন না, তার ফলে প্রায়ই এই রকম একটা মধ্যবর্তী ভাষা (intermediate language) বলে চলেন।’রর অনুমান করতে অসুবিধা হয় না এর কারণ, দুশো বছরের ইংরেজ শাসন থেকে মুক্ত হলেও ইংরেজি ও বাংলার মধ্যে আধিপত্য ও অধীনতার মাত্রাভেদ রয়ে গেছে। উপরন্তু বিনোদন মাধ্যমের প্রভাবে হাল আমলে বাংলা ভাষায় হিন্দি ভাষার আধিপত্য বাড়ছে। বাংলাদেশের নিজস্ব ভাষানীতি (language policy) প্রণীত না হওয়া এবং সুনির্দিষ্ট ভাষা-পরিকল্পনার (language planning) অভাবে এবিষয়ে বাঙালির সতর্কতা নেই বললেই চলে। বাঙালির গৌরবময় ভাষা-আন্দোলন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনার বিকাশ, ভাষাভিত্তিক জাতি-রাষ্ট্র অর্জন, সংবিধানে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি, অহংকারের একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস রূপে স্বীকৃতি লাভ ইত্যাদি এতো কিছু হলেও ইংরেজি ও হিন্দি-উর্দু ভাষার প্রতি বাঙালির অকারণ সমীহ আর মাতৃভাষা বাংলার প্রতি অনাবশ্যক হীনম্মন্যতার অমানিশা আজও কাটানো গেছে বলে মনে হয় না। সে কারণে দেশের তথা জাতির ভাষাপরিস্থতি অনুধাবনের লক্ষ্যেই প্রয়োজন জাতির পিতার ভাষাজ্ঞানের বিশ্লেষণ; তাঁর ভাষার শৈলী অনুসন্ধান।
বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বাঙালি জাতীয়তাবাদ এর ভিত্তিতে। বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষার জন্য জেলে গেছেন। এই ভাষা-আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তিনি বাংলাদেশ গঠনের স্বপ্ন দেখেছেন। হাজার বছর ধরে বাঙালি জাতি নিজেদের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছে। সেই জাতির জন্য একটি দেশ এনে দিয়েছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। তিনি মাতৃভাষার ঋণের কথা ভুলে যাননি। ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৩৬তম সদস্য দেশের মর্যাদা লাভ করে। এর আট দিন পর, ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেন মাতৃভাষা বাংলায়। জাতিসংঘে এটি ছিল প্রথম বাংলায় ভাষণ। এতে করে বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে পেয়েছে সম্মানের আসন, আর এই ভাষাভাষী মানুষেরা পেয়েছে গর্ব করার অবকাশ।
বিশ্বপরিসরে এর আগে এমন করে বাংলাভাষাকে কেউ পরিচয় করিয়ে দেননি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বাঙালি হিসেবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তাঁর অবদানে বিশ্বের দরবারে প্রথম বাংলা ভাষা পরিচিত পেয়েছিল। কিন্তু জানামতে, বিশ্বাঙ্গনের কোথাও তিনি বাংলায় বক্তব্য রাখেননি। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে চীনের বেইজিং-এ আয়োজিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর প্রতিনিধিদের শান্তি সম্মেলনে ভারতের মনোজ বসু আর পূর্ব পাকিস্তানের শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেন, যা ইংরেজি, চিনা, রুশ ও স্পেনিশ ভাষায় অনুবাদ করে উপস্থিত প্রতিনিধিদের শোনানো হয়। ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে অমর্ত্য সেন অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। তিনিও তাঁর বক্তব্যটি রেখেছিলেন ইংরেজিতে। ড. মুহম্মদ ইউনুস ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পান। তিনি তাঁর ৩৫ মিনিটের ভাষণের মধ্যে মাত্র দেড় মিনিট বাংলায় বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর পরে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে চেতনায় ধারণ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিতে পেরেছেন সুদৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ে। এরপর তিনি যতবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গিয়েছেন, ততবার বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি করেছেন। অন্তর্জাল থেকে জানা যায়: বিশ্বব্যাপী ৩৫ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। তবে বাংলা ভাষা বলতে বিশ্ব বাংলাদেশকেই বুঝে। মাতৃভাষা বিবেচনায় বাংলা এখন চতুর্থ। ভাষাভাষী জনসংখ্যার দিক দিয়ে সপ্তম। ইউনেসকো ২০১০ সালে বাংলা ভাষাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুরেলা ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বিশ্বের ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা পড়ানো হয়। বাংলা ভাষার এত গৌরব সত্ত্বেও সারা বিশ্বে তার তেমন কোনো প্রচারের ব্যবস্থা নেয়নি বাংলাদেশ সরকার। তারচেয়েও বেদনার কথা এদেশের শতাধিক সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগই নেই। অন্যন্য বিষয়ও পড়ানো হয় ইংরেজি মাধ্যমে। ইংরেজি মাধ্যমে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে বাঙালি জনসাধারণের সেবার চাকুরিতে তাঁরা এখন নিয়োগ পান!
জাতির পিতার মাতৃভাষায় জাতিসংঘে দেয়া ভাষণটিতে একাত্তরে বাংলাদেশ কেন সংগ্রামের পথ বেছে নিয়েছিল, কী তার সেক্রিফাইস, কোন্‌ ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জন্ম হয় স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রটির এসব ইতিহাস চমৎকারভাবে উঠে আসে। রাষ্ট্রপরিচালনার নীতি ব্যাখ্যা করে সারাবিশ্বের নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন বাঙালির মহান নেতা। নাতিদীর্ঘ ভাষণের সূচনায় বঙ্গবন্ধু বলেন ‘আজ এই মহামহিমান্বিত সমাবেশে দাঁড়াইয়া আপনাদের সঙ্গে আমি এই জন্য পরিপূর্ণ সন্তুষ্টির ভাগিদার যে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ এই পরিষদে প্রতিনিধিত্ব করিতেছেন। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের পূর্ণতা চিহ্নিত করিয়া বাঙালি জাতির জন্য ইহা একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। বাঙালির দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘স্বাধীনভাবে বাঁচিবার অধিকার অর্জনের জন্য এবং একটি স্বাধীন দেশে মুক্ত নাগরিকের মর্যাদা নিয়া বাঁচিবার জন্য বাঙালি জনগণ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী সংগ্রাম করিয়াছেন, তাঁহারা বিশ্বের সকল জাতির সঙ্গে শান্তি ও সৌহার্দ্য নিয়া বাস করিবার জন্য আকাঙ্ক্ষিত ছিলেন। যে মহান আদর্শ জাতিসংঘ সনদে রক্ষিত আছে, আমাদের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেই আদর্শের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করিয়াছেন।’ ভাষণে তিনি স্বাধীন বাংলার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেয়া বীর শহীদদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। একইসঙ্গে বাংলাদেশের সংগ্রামে সমর্থনকারী সকল দেশ ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম সার্বিক অর্থে শান্তি এবং ন্যায়ের সংগ্রাম ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আর সে জন্যই জন্মলগ্ন হইতেই বাংলাদেশ বিশ্বের নিপীড়িত জনতার পাশে দাঁড়াইয়া আসিতেছে।’
সেই সময়ের বিশ্ব রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ পাওয়া যায় তাঁর সেই ভাষণে। বাঙালির মহান নেতা বলেন, ‘একদিকে অতীতের অন্যায় অবিচারের অবসান ঘটাইতে হইতেছে, অপর দিকে আমরা আগামী দিনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হইতেছি। আজিকার দিনের বিশ্বের জাতিসমূহ কোন পথ বাছিয়া নিবে তাহা লইয়া সঙ্কটে পড়িয়াছে। এই পথ বাছিয়া নেওয়ার বিবেচনার উপর নির্ভর করিবে আমরা সামগ্রিক ধ্বংসের ভীতি এবং আণবিক যুদ্ধের হুমকি নিয়া এবং ক্ষুধা, বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে মানবিক দুর্গতিকে বিপুলভাবে বাড়াইয়া তুলিয়া আগাইয়া যাইব অথবা আমরা এমন এক বিশ্ব গড়িয়া তোলার পথে আগাইয়া যাইব যে বিশ্ব মানুষের সৃজনশীলতা এবং আমাদের সময়ের বিজ্ঞান ও কারিগরি অগ্রগতি আণবিক যুদ্ধের হুমকিমুক্ত উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের রূপায়ণ সম্ভব করিয়া তুলিবে এবং যে বিশ্ব কারিগরিবিদ্যা ও সম্পদের পারস্পরিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে সর্বক্ষেত্রে সুন্দর জীবন গড়িয়া তোলার অবস্থা সৃষ্টি করিবে।’ এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রথম হইতেই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও সকলের প্রতি বন্ধুত্ব এই নীতিমালার উপর ভিত্তি করিয়া জোট নিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করিয়াছে।’ কেবলমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশই কষ্টলব্ধ জাতীয় স্বাধীনতার ফল ভোগ করতে সক্ষম করে তুলবে বলে মত দেন তিনি।
প্রতিবেশি রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস বাংলাদেশের অভ্যুদয় বস্তুতপক্ষে এই উপমহাদেশে শান্তির কাঠামো এবং স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অবদান সৃষ্টি করিবে। ইহা ছাড়া আমাদের জনগণের মঙ্গলের স্বার্থেই অতীতের সংঘর্ষ ও বিরোধিতার পরিবর্তে মৈত্রী ও সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।’ বাঙালির উদারতার সবটুকু বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে বক্তৃতায় তিনি বলেন ‘আমরা আমাদের নিকটতম প্রতিবেশি ভারত ও নেপালের সঙ্গে শুধুমাত্র প্রতিবেশিসুলভ সম্পর্কই প্রতিষ্ঠা করি নাই, অতীতের সমস্ত গানি ভুলিয়া গিয়া পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক করিয়া নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করিয়াছি।’ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি শ্রদ্ধা এবং অন্যের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করার ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিবেশী সকল দেশের সঙ্গে সৎ প্রতিবেশিসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখিবে। আমাদের অঞ্চলের এবং বিশ্বশান্তির অন্বেষায় সকল উদ্যোগের প্রতি আমাদের সমর্থন অব্যাহত থাকিবে।’
বাঙালির ক্ষমতা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানতেন বঙ্গবন্ধু। সে কথা বিশ্ববাসীকে আরও একবার জানিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, ‘জনাব সভাপতি, মানুষের অজেয় শক্তির প্রতি বিশ্বাস, মানুষের অসম্ভবকে জয় করার ক্ষমতা এবং অজেয়কে জয় করার শক্তির প্রতি অকুণ্ঠ বিশ্বাস রাখিয়া আমি আমার বক্তৃতা শেষ করিতে চাই। আমাদের মতো যেইসব দেশ সংগ্রাম ও আত্মদানের মাধ্যমে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে, এই বিশ্বাস তাঁহাদের দৃঢ়। আমরা দুঃখ ভোগ করিতে পারি। কিন্তু মরিব না। টিকিয়া থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করিতে জনগণের দৃঢ়তাই চরম শক্তি। আমাদের লক্ষ্য স্বনির্ভর। আমাদের পথ হইতেছে জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও যৌথ প্রচেষ্টা।’ বক্তৃতার শেষ অংশে খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গের অবতারণা করে তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজেদের শক্তির উপর আমাদের বিশ্বাস রাখিতে হইবে। আর লক্ষ্য পূরণ এবং সুন্দর ভাবীকালের জন্য আমাদের নিজেদেরকে গড়িয়া তুলিবার জন্য জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমেই আমরা আগাইয়া যাইব।’ এমন চমৎকার ভাষায় অদ্ভুত সুন্দর স্বপ্নের কথা জানিয়ে বক্তৃতা শেষ করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাতিরজনক শেখ মুজিবুর রহমান।
বঙ্গবন্ধুর অধিকাংশ ভাষণেই কথ্যভাষার ব্যবহার বহুল। সমালোচকের ভাষায়: ‘তিনি ছিলেন রাজনীতির কবি- Poet of Politics। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য মধ্যবিত্তের শাহরিক ভাষার পরিবর্তে তিনি ব্যবহার করেছেন লোকভাষা। তাঁর লেখা ও বক্তৃতায় লোকভাষা-আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের বিস্ময়কর সার্থকতা লক্ষ্য করা যায়। সমালোচক এখানে লোকভাষা ও আঞ্চলিক ভাষাকে হাইফেন দিয়ে ব্যবহার করেছেন। আমাদের কথা বঙ্গবন্ধু ভাষণে লোকভাষা ব্যবহার করেছেন তবে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেনি-বড়জোর দুএকটি আঞ্চলিক ক্রিয়াপদের গঠন-সাদৃশ্য আছে বটে। আমরা জানি, লোকভাষা (folk language) কোনো বিশেষ অঞ্চলের উপভাষা নয়। নাগরিক ভাষার সঙ্গে-বাংলার ক্ষেত্রে মান্য মার্জিত কলকাতার বা শহরের ‘শিষ্ট’ ভাষার সঙ্গে বিরোধে যে ভাষা গ্রাম্য বলে চিহ্নিত হতে পারে তা-ই লোকভাষা। কারো মতে, কথ্য উপভাষার এই অংশের অতীতচারী ঐতিহ্যানুসারিতার মধ্যে কাজ করে নানা ধরনের লোকায়ত প্রবণতা। তাই কথ্য উপভাষার এই অংশের নাম দেওয়া যেতে পারে লোকভাষা। আর আঞ্চলিক ভাষা (regional language) হচ্ছে কথ্য ভাষার আঞ্চলিক বৈচিত্র্য। একই ভাষার বিভিন্ন অঞ্চলে কথ্য ভাষার মধ্যে কমবেশি পার্থক্য থাকে এগুলিকেই আঞ্চলিক উপভাষা (regional dialect) বলা হয়। অবশ্য বাংলাদেশে বেশিরভাগ লেখক-গবেষক আঞ্চলিক ভাষা বোঝাতেই উপভাষা (dialect) ব্যবহার করেছেন। সে-অর্থেও বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভাষা আঞ্চলিক নয়। বরং তা হতে পারে ব্যক্তিনিষ্ঠ উপভাষা বা নিভাষা (idiolect)।
বাংলার সাধারণ লোকের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের ভাষায় কথা বলতে বলতে যখন বঙ্গবন্ধু ময়দানকে মাতিয়ে তোলতেন তখন তাঁর একটা নিজস্ব ভাষাভঙ্গি সৃষ্টি হতো। অথচ, জাতিসংঘের সাধরণ পরিষদে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি আলংকারিক সাধু ভাষারীতি ব্যবহার করলেন। এই সাধুভাষা সম্পর্কে রূপকথার সুয়োরানী দুয়োরানীর উদাহরণ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন: তেমনি বাংলাবাক্যধীপেরও আছে দুই রানী-একটাকে আদর করে নাম দেওয়া হয়েছে সাধু ভাষা; … সাধু ভাষা ঘষামাজা, সংস্কৃত ব্যাকরণ অভিধান থেকে ধার-করা অলংকারে সাজিয়ে তোলা। চলতি ভাষার আটপৌরে সাজ নিজের চরকায় কাটা সুতো দিয়ে বোনা। বিশ্বসভায় দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু মাতৃভাষায় ভাষণ দিলেও ভাষার আটপৌরে সাজ পরিহার করে একটু অলংকারে সাজিয়ে সাধুভাষায় বললেন। এই অলঙ্কার আতিশয্যের কারণেই বঙ্গবন্ধুর সরল বাক্য গঠনের ব্যত্যয় ঘটে। জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণটিতে বঙ্গবন্ধু জটিল সংগঠনভিত্তিক বাক্য ব্যবহার করেছেন। এর কারণ হতে পারে এখানে আন্তরিকতা থেকে আনুষ্ঠানিকতা বেশি। আবার আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে তো আর আটপৌরে পোশাক পরে যাওয়া হয় না, একেটু আলংকারিক জমকালো পোশাক চাই। বঙ্গবন্ধু ভাষা ব্যবহারেও তাই করেছেন। অনেক সময় লিখিত ভাষণে স্বতঃস্ফূর্ততা থেকে কৃত্রিমতা জেঁকে বসে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে কিন্তু তা ঘটেনি-ভাষার প্রতি তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসার কারণে।
জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুই প্রথম রাষ্ট্রনায়ক, যিনি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেন। বঙ্গবন্ধুকে প্রথমেই অনুরোধ করা হয়েছিল, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি ইংরেজিতে বক্তৃতা করবেন।’ কিন্তু প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার প্রতি সুগভীর দরদ ও মমত্ববোধ থেকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করতে চাই।’ জাতিসংঘে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সম্পর্কে বলা হয়, ‘বক্তৃতায় ধ্বনিত হয়েছে মুজিবের মহৎ কণ্ঠ’। জাতিসংঘ মহাসচিব ড. কুর্ট ওয়াল্ডহেইম তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় আমি আনন্দিত ও গর্বিত। বক্তৃতাটি ছিল সহজ, গঠনমূলক এবং অর্থবহ’। জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণের প্রত্যক্ষদর্শী নেতা তোফায়েল আহমদের ভাষায়: ‘মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা প্রদানে বঙ্গবন্ধুর এই সিদ্ধান্তটি ছিল তাঁর সমগ্র জীবনের স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক পরিণতি। সেদিন বক্তৃতারত বঙ্গবন্ধুর দিকে তাকিয়ে কেবলই মনে হয়েছে, তিনি যেন বহু যুগ ধরে এমন একটি দিনের অপেক্ষায় নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ১৯৪৮-এর ১১ মার্চ, ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্বের আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু মুজিব ছিলেন সর্বাগ্রে। তাঁর নেতৃত্বেই সেদিন অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রামী ছাত্রসমাজ সফল ধর্মঘট পালন করেছিল। এর পর ্তু৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি, মহান ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তিনি কারাগারে বন্দি অবস্থাতেই আমরণ অনশন শুরু করেছিলেন।
১৯৭০ এর নির্বাচনোত্তর ২১ শে ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ খ্রি. কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন: ‘রক্তের বিনিময়ে বাংলা রাষ্ট্রভাষা করবো, ইনশাল্লাহ্‌ বাংলা রাষ্ট্রভাষা হয়েছে। সে রাষ্ট্রভাষার সম্মান বাংলা ভাষাকে কতুটুকু আমরা দিতে পারছি সে প্রশ্নে আজ আর নয়। বাংলা ভাষায় হিন্দি-ইংরেজি শব্দ মিশছে দেখে ভাষা দূষিত হচ্ছে বলে আমরা আদালতের দ্বারস্থ হই, অন্যদিকে সর্বোচ্চ আদালতে যে বাংলা ব্যবহৃত হয় না সেকথা বেমালুম ভুলে যাই। অথচ ভাষা যে পরিবর্তনশীল ও নদীর স্রোতের মতে প্রবহমান সেকথা বঙ্গবন্ধুর ভাষণেও আছে। ১৫ই ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ খ্রি. বাংলা একাডেমি আয়োজিত ভাষা-আন্দোলনের স্মরণ সপ্তাহের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন : ‘মুক্ত পরিবেশেই ভাষার বিকাশ হয়। ঘরে বসে ভাষার পরিবর্তন-পরিবর্ধন করা যায় না। এর পরিবর্তন-পরিবর্ধন হয় ব্যবহারের ভিতর দিয়ে। ভাষার গতি নদীর স্রোতধারার মতো। ভাষা নিজেই তার গতিপথ রচনা করে নেয়। কেউ এর গতি রোধ করতে পারে না। এই মুক্ত পরিবেশে বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের অতীত ভূমিকা ভুলে স্বাজাত্যবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে বাংলা ভাষাকে গণমুখী ভাষা হিসেবে গড়ে তুলেন।’(ঢাকা : দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১)। ভাষা নিয়ে বঙ্গবন্ধুর এই উপলব্ধি ও স্বচ্ছ ধারণা-ভাবনা পাঠে-তাঁকে একজন ভাষাতাত্ত্বিকের মতোই মনে হয়।
সেই ভাষণগুলোর আরও বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ পাবার আশায় আমরা পথ চেয়ে রইনি, শুধু আবছা একটি পথরেখা আঁকবার প্রয়াসে এই সমাজের দিকে তাকাতেই দেখি: একুশের ‘বইমেলা’ কখন যে হয়ে গেল বাংলা একাডেমি ‘গ্রন্থমেলা’ সে খেয়াল নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত দোসরা ফেব্রুয়ারি ২০২০ বাংলা একাডেমিতে গ্রন্থমেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বলেন: বইমেলা না গ্রন্থমেলা বলেন ? বইমেলা বলতেই আপন আপন মনে হয় বেশি।’ অথচ আপন শব্দগুলোই আমাদের মাতৃভাষায় আমরা আজকাল ব্যবহার করছি না। এ অবস্থা যেমন ঢাকায় তেমনি কলকাতায়। ওখানেও ‘বইমেলা’কে ‘পুস্তকমেলা’ অভিধা দিয়ে স্বনির্ভর বাংলা ভাষাকে সংস্কৃতের দুহিতা প্রমাণের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা প্রবহমান। এই গড্ডলিকা প্রবাহে পড়েও আমরা বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ভাষা বিশ্লেষণ করতে বর্তমান ভাষা পরিস্থিতির সাথে সমন্বয় সাধনের কথা যেনো ভুলে না যাই। তাত্ত্বিক গবেষণা বা গবেষণা-মডেল ব্যবহার করতে হবে অবশ্যই তবে সে গবেষণার সলিল-ধারা যেন সমকালীন সমাজ-জমিনকে স্নাত করে-অন্তত সিক্ত করে। তবেই বাংলা ভাষাবৃক্ষ এদেশের মৃত্তিকা-রসে সিক্ত-সতেজ হয়ে সগৌরবে বেড়ে উঠবে-আমাদের ছায়া দেবে। সে-ভাষাবৃক্ষের ছায়ায় আমাদের আগামী প্রজন্ম দাঁড়াবার জায়গা খুঁজে পাবে। আর উপলব্ধি করবে মাতৃভূমি ও মাতৃভাষায়-‘কী শোভা, কী ছায়া গো’। এতে দূর হবে বাংলা ভাষা নিয়ে সমকালীন নানান হীনম্মন্যতা।
তথ্যসূত্র

১.উদ্ধৃত, আতিউর রহমান, বাংলাদেশের আরেক নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ঢাকা: সাহিত্য প্রকাশ, ২০১০, পৃ. ২৭-২৮।
২. উদ্ধৃত, বিশ্বজিৎ ঘোষ, ‘বঙ্গবন্ধুর ভাষা ও সাহিত্যচিন্তা’, চট্টগ্রাম: দৈনিক আজাদী, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, পৃ. ৬।
৩. উদ্ধৃত, আতিউর রহমান, প্রগুক্ত।
৪. উদ্ধৃত, অনুপম সেন, ইতিহাসে অবিনশ্বর, ঢাকা: বাতিঘর, ২০১৬, পৃ. ১৭
৫.তপন পালিত, ‘বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রদর্শন’, ইতিহাসের খসড়া, (মুহম্মদ শামসুল হক সম্পা.), চট্টগ্রাম: অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৯, পৃ. ১৯।
৬. বিশ্বজিৎ ঘোষ, প্রগুক্ত।
৭.উদ্ধৃত, অনুপম সেন, প্রগুক্ত, পৃ. ২১।
৮. পবিত্র সরকার, চমস্কি ব্যাকরণ ও বাংলা বানান, কলকাতা: পুনশ্চ, ২০১৩, পৃ. ১৮৫-১৮৬।
৯.রফিকুল ইসলাম, ভাষাতাত্ত্বিক প্রবন্ধাবলী, ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৯৮, পৃ. ১১।
১০.এম. মনিরুজ্জামান, ‘বাংলা ও ইংরেজি’, প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (২য় খণ্ড), (রফিকুল ইসলাম প্রমুখ সম্পা.), ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০১১, পৃ. ১৩৭।
১১. শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ঢাকা: দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ২০১২, পৃ. ২২৮।
১২. তোফাজ্জল লিটন, ‘বঙ্গবন্ধু ৭৪ সালে শুরু করেছিলেন, তবে…’, দৈনিক সমকাল, ঢাকা: ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২০: ৫৭।
১৩. বিশ্বজিৎ ঘোষ, প্রগুক্ত।
১৪. পবিত্র সরকার, লোক ভাষা সংস্কৃতি নন্দনতত্ত্ব, কলকাতা: চিরায়ত প্রকাশন, ২০১৪, পৃ. ১৪৩।
১৫. নির্মল দাশ, লোকভাষা থেকে ভাষালোক, কলতাতা: দেজ পাবলিশিং, ২০১০, পৃ. ১২।
১৬. রফিকুল ইসলাম প্রমুখ, প্রমিত বাংলা ব্যবহারিক ব্যাকরণ, ( রফিকুল ইসলাম প্রমুখ সম্পাদিত), ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০১৪, পৃ.৭।
১৭. উদাহরণ: মনিরুজ্জামান (২০১৩) চট্টগ্রামের উপভাষা, শ্যামল কান্তি দত্ত (২০১৮) সিলেটের উপভাষা ইত্যাদি।
১৮ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ‘বাংলাভাষা-পরিচয়’, রবীন্দ্র-রচনাবলী (ষড়্‌বিংশ খণ্ড), কলকাতা: বিশ্বভারতী, ১৩৫৫, পৃ. ৩৯৩।
১৯. মিথুন ব্যানার্জী, বঙ্গবন্ধুর ভাষণের ডিসকোর্স বিশ্লেষণ, ঢাকা: তাম্রলিপি, ২০২০, পৃ. ৪১।
২০. তোফায়েল আহমেদ, ‘জাতিসংঘে জাতির পিতার বাংলা ভাষণ: ফিরে দেখা’, দৈনিক সমকাল, ঢাকা: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯।
২১. শেখ মুজিবুর রহমান, ওঙ্কারসমগ্র, নির্ঝর নৈঃশব্দ্য (সম্পাদিত), ঢাকা: ঐতিহ্য, ১৯১৭, পৃ. ১১।
২২.শ্যামল কান্তি দত্ত, ‘ভুলগুলো ফুল হোক’, চট্টগ্রাম: দৈনিক আজাদী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০, পৃ. ৬।
র তপন পালিত, ‘বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রদর্শন’, ইতিহাসের খসড়া, (মুহম্মদ শামসুল হক সম্পা.), চট্টগ্রাম: অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১৯, পৃ. ১৯।
ররএম. মনিরুজ্জামান, ‘বাংলা ও ইংরেজি’, প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (২য় খণ্ড), (রফিকুল ইসলাম প্রমুখ সম্পা.), ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ২০১১, পৃ. ১৩৭।

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0