প্লাজমা থেরাপি :কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে

প্লাজমা থেরাপি :কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে

ডা. কামরুল হাসান খান
ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক অদৃশ্য অণুজীব করোনাভাইরাস। ইতোমধ্যে ২১৩টি দেশ-অঞ্চলে ভয়াবহতা ছড়িয়ে দিয়েছে প্রাণঘাতী এ ভাইরাস। ক্রমাগত বেড়েই চলেছে সংক্রমণ আর মৃত্যুর মিছিল। ধ্বংস করে চলেছে সভ্যতা, অর্থনীতি, জনজীবন। কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে বিজ্ঞানকে, বিশেষ করে চিকিৎসাবিজ্ঞানকে। বিশ্বব্যাপী গবেষণা অব্যাহত থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের কোনো কোনো ওষুধ বা ভ্যাকসিন আবিস্কৃত হয়নি। মুমূর্ষু রোগীর জন্য পরীক্ষণ চলছে রেমডিসিভির ওষুধের আর প্লাজমা থেরাপি ব্যবহারের। ক্লোরোকুইন ব্যবহারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ অনেক দেশ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে অ্যান্টিভাইরাস ওষুধই কার্যকর হয়, অন্য কিছু নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে ভ্যাকসিন তৈরির প্রার্থী ১১৪টি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের চারটি, চীনের পাঁচটি, যুক্তরাজ্যের একটিসহ মোট ১০টি পরীক্ষার দ্বিতীয় পর্যায়ে আছে। পাশের দেশ ভারতও পিছিয়ে নেই। চলছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের পরস্পরবিরোধী সংবাদের ব্যাপকতা, রয়েছে ওষুধ কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা।

গবেষকরা আশা করছেন, কনভালেসেন্ট প্লাজমা মুমূর্ষু কভিড রোগীর শরীরে সঞ্চালন করলে তার ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পাবে। এভাবে রোগীদের উপকার হওয়ার সম্ভাবনা আছে। যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) কভিড-১৯ জরুরি জনস্বাস্থ্য চলাকালে সেবা প্রদানকারী ও গবেষকদের জন্য কভিড-১৯ কনভালেসেন্ট প্লাজমা ব্যবহার এবং পরীক্ষা করার জন্য একটি নির্দেশনা দিয়েছে। এখন পর্যন্ত এফডিএ কভিড-১৯ কনভালেসেন্ট প্লাজমা ব্যবহারের কোনো অনুমতি দেয়নি। এফডিএ কনভালেসেন্ট প্লাজমা সংগ্রহ এবং ব্যবহারের জন্য সরবরাহ করে না। এফডিএ বলেছে, যদিও প্রতিশ্রুতিশীল, কভিড-১৯ চিকিৎসায় কনভালেসেন্ট প্লাজমার ব্যবহার এখনও ক্লিনিক্যালি নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণ হয়নি। এ কারণে বর্তমানে এটিকে বলা হয় 'জরুরি পরীক্ষণমূলক নতুন ওষুধ' বা ইআইএনডি। যুক্তরাষ্ট্রের যেসব চিকিৎসক বা প্রতিষ্ঠান আইএনডিতে অংশগ্রহণ করতে আগ্রহী, তাদের একটি নির্দিষ্ট ফরমে এফডিএর অনুমতি নিতে হয়।

প্লাজমা প্রয়োগে এমন রোগী হতে হবে, যারা ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত কভিড-১৯ আক্রান্ত এবং মারাত্মক অথবা জীবন হুমকির সম্মুখীন। মারাত্মক বলতে বোঝায়- শ্বাসকষ্ট, শ্বাস-প্রশ্বাসের হার প্রতি মিনিটে ৩০ বারের বেশি, রক্তে অক্সিজেনের সম্পৃক্ততা শতকরা ৯৩ ভাগের কম, ফুসফুসের অকার্যকারিতা ২৪-৪৮ ঘণ্টায় ৫০ ভাগের বেশি। জীবন হুমকির সম্মুখীন বলতে বোঝায়, শ্বাস-প্রশ্বাস অকার্যকর, সেপটিক শক, শরীরের একাধিক জরুরি অঙ্গ অকার্যকর।

প্লাজমা প্রদানের ক্ষেত্রেও দাতার রক্তদানের সব সাধারণ যোগ্যতা থাকতে হবে। রক্তবাহিত সংক্রামক রোগের পরীক্ষা অবশ্যই করতে হবে। ল্যাবরেটরিতে কভিড-১৯ শনাক্ত পরীক্ষা নিশ্চিত থাকতে হবে। রক্তদানের অন্ততপক্ষে ১৪ দিন আগে সম্পূর্ণভাবে উপসর্গ মুক্ত হতে হবে। একান্ত জরুরি ক্ষেত্র ছাড়া রক্তে অ্যান্টিবডির পরিমাণ (টাইটার) দেখে নিতে হবে। জরুরি ক্ষেত্রেও পরে দেখে নিতে হবে।

প্লাজমা (রক্তরস) এটি হালকা হলুদাভ তরল, যা সাধারণত দেহের বিভিন্ন প্রকার রক্তকোষ ধারণ করে। মানবদেহের রক্তের প্রায় শতকরা ৫৫ ভাগ হচ্ছে প্লাজমা। এর ৯৫ শতাংশ হচ্ছে পানি এবং ৬-৮ শতাংশ হচ্ছে বিভিন্ন প্রোটিন, গ্লুকোজ, রক্ত জমাট বাঁধার উপাদান, ইলেক্ট্রোলাইটস, হরমোন, কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অক্সিজেন।

কনভালেসেন্ট প্লাজমা : মানবদেহে যখন কোনো জীবাণু প্রবেশ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই এক ধরনের রোগ প্রতিরোধ গড়ে ওঠে এবং প্রস্তুত হয় অ্যান্টিবডি। এই অ্যান্টিবডি শরীরে রোগ জীবাণুকে প্রতিরোধ করে, ধ্বংস করে এবং প্রত্যাহার করে। একজন আক্রান্ত রোগী সুস্থ হলে তার শরীরের প্লাজমাকে কনভালেসেন্ট প্লাজমা বলা হয়, যার মধ্যে ওই জীবাণুর নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি থাকে। এই প্লাজমা যদি একই জীবাণুতে আক্রান্ত অন্য রোগীর দেহে সঞ্চালিত করা হয়, তাহলে একইভাবে ওই রোগীর শরীরেও এই অ্যান্টিবডি রোগ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এর আগেও ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লুতে, পরবর্তীকালে সার্স, ইবোলা, এইচওয়ান এনওয়ানসহ বিভিন্ন রোগে প্লাজমা থেরাপি ব্যবহার করা হয়েছে।

গত ফেব্রুয়ারি মাসেই চীনের চিকিৎসকরা মুমূর্ষু কভিড রোগীদের প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করে, যা ওই সময়েই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে কার্যকর এবং জীবন রক্ষাকারী বলে মন্তব্য করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য সরকার মুমূর্ষু কভিড রোগীর জন্য প্লাজমা থেরাপি ট্রায়ালের অনুমতি দিয়েছে। গত ৮ মে ভারতের মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল (আইসিএমআর) ট্রায়ালের অনুমতি দিয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশেই প্লাজমা থেরাপির ট্রায়াল চলছে।

বাংলাদেশ সরকার প্লাজমা থেরাপি ট্রায়ালের জন্য একটি টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করে দিয়েছে। কমিটি ইতোমধ্যে প্রস্তুতিমূলক অনেক কাজ করেছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগও করেছে। এ ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন হাসপাতাল প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করছে।

মনে রাখতে হবে, পল্গাজমা থেরাপি মুমূর্ষু কভিড রোগীদের জন্য একটি পরীক্ষণমূলক (ট্রায়াল) ব্যবস্থা। কেন্দ্রীয়ভাবে এর একটি নিয়ন্ত্রণ থাকতেই হবে। প্রধানত এটি রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের দায়িত্ব। বাংলাদেশে গর্ব করার মতো দেশব্যাপী রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের অবকাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ, কর্মপরিকল্পনা এবং নেটওয়ার্ক রয়েছে। এ বিভাগের নেতৃত্বে সংশ্নিষ্ট সব মহলের সমন্বয়ের মাধ্যমে প্লাজমা থেরাপির ট্রায়ালের কাজটি হতে হবে।

এ ক্ষেত্রে দ্রুত টেকনিক্যাল কমিটির মাধ্যমে সংশ্নিষ্ট সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সমন্বয় স্থাপন করতে হবে। গণমাধ্যমে উপযুক্ত ডোনারের মোটিভেশনের জন্য প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্লাজমা প্রয়োগের আগে অ্যান্টিবডির পরিমাণ দেখতে হবে। জরুরি ক্ষেত্রে না পারলে পরে দেখে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, সব রোগীর ক্ষেত্রে যথাযথ অ্যান্টিবডি প্রস্তুত নাও হতে পারে। মোটিভেশন এবং প্লাজমা সংগ্রহের জন্য সন্ধানীর সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। টেকনিক্যাল কমিটিকে অবহিত করেই সব হাসপাতালে প্লাজমা থেরাপি প্রয়োগ করতে হবে।

বাংলাদেশেও করোনা সংক্রমণের হার বেড়ে চলেছে, প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে নতুন মৃত্যু তালিকা। সরকারকে জীবন-জীবিকা দুটি বিষয় নিয়েই ভাবতে হয়, দায়িত্ব নিতে হয়। ১ জুন থেকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই খুলে গেছে অফিস-আদালত, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। স্বাস্থ্যবিধি মেনে সরকারকে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। সরকারের একার পক্ষে এ ভয়ংকর মহামারি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে আমাদেরই।

সাবেক উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও প্যাথলজি বিশেষজ্ঞ 

What's Your Reaction?

like
1
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0