পাকিস্তানিদের হাতে আটক বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন

পাকিস্তানিদের হাতে আটক বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন
মাহবুবুল আলম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দি করে ২৯ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার পর তাকে কোথায় বা কোনখানে আটক রাখা হয় তা কারো জানা ছিল না। বঙ্গবন্ধু নিজেও জানতেন না তিনি কোথায় আছেন। তাকে যেখানে আটক রাখা হয়, সেখানে শুধু খাবার সময় হলেই পাহারাদার এসে খাবার দিয়েই বিদ্যুৎ গতিতে চলে যায়। তবে বঙ্গবন্ধু বোঝতে পারছিলেন এবার হয়তো আর বাঁচার আশা নেই। পাকিস্তানিরা তাকে চিরতরে শেষ করে দেবেই। বঙ্গবন্ধুকে যে ঘরটিতে রাখা হয়েছিল সেটি ছিল সংকীর্ণ একটা কুঠুরি। সেখানে তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার জন্য পাকিস্তানি শাসক ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। তবে যেখানে বঙ্গবন্ধুকে বন্দি করে রাখা হয় সেখানের কারাপ্রহরীরা এটাই জানত যে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ বন্দি এবং তার আয়ু বেশি দিন নেই। সেই কারা কর্তৃপক্ষ দু-চার দিন পরপরই বন্দির আচার-আচরণ সম্পর্কে ইসলামাবাদে বিস্তারিত রিপোর্ট পাঠাতেন। এই রিপোর্টে খাবার থেকে শুরু করে ঘুমানো পর্যন্ত আদ্যপান্ত বিবরণ লিপিবদ্ধ থাকত। কেননা, ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর আচার-আচরণ সম্পর্কে জানতে বেশ উৎসুক ছিলেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগারে এতটাই নিঃসঙ্গ রাখা হয়েছিল যে, তিনি বাইরের দুনিয়ার কোনো খবরা-খবরই পেতেন না। তবে তিনি এটুকু বুঝেছিলেন, পাকিস্তানের সামরিক এক নায়ক ইয়াহিয়া সরকারের ইচ্ছার ওপর তার বাঁচা-মরা নির্ভর করছে। তিনি সব সময় মৃত্যুর জন্য তৈরি ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন মানুষ যখন মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকে তখন তাকে কেউ হত্যা করতে পারে না। এ কথা বঙ্গবন্ধু অনেকবারই বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘জনগণের সঙ্গে আমার আত্মিক সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয়নি, এক মুহূর্তের জন্যও নয়। কোনো কিছু যদি আপনার মনকে অধিকার করে রাখে এমনকি নিরবচ্ছিন্নভাবে এমন সার্বিক ও তীব্রভাবে, তাহলে সেটা আপনার অস্তিত্বেও অংশ হয়ে ওঠে এবং আপনিও হয়ে ওঠেন এর অংশ। সংগতভাবেই এর বহুমুখী দিক সম্পর্কে আপনারও কিছুটা জানা রয়েছে। কোনো একটি বিশেষ সময়ে ঠিক কী ঘটেছিল, সেটা আমি সঠিকভাবে জানতাম না। তবে এর একটি আভাস আমি পেতাম। বাস্তব যোগাযোগের অনুপস্থিতিতে জনগণের মধ্যে প্রোথিত আমার মন আলোকিত করেছিল। উদাহরণত, যখন বিপদ আমাকে আচ্ছন্ন করত, আমি বুঝতে পারতাম আমার জনগণ তীব্র যন্ত্রণা ভোগ করছে। যখন আমার মনের দিগন্তে দেখা দিত চকিত আশার ঝলকানি, আমি জানতাম তারা সেই দুর্ভোগ অতিক্রম করছে...।’

বঙ্গবন্ধু যখন ইয়াহিয়ার কারাগারে আটক, তখন উৎকণ্ঠিত বাঙালি জাতির সঙ্গে সারা বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষ এই মহান নেতার ওপর কারানির্যাতনের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করতে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে দাবি জানিয়ে আসছিল। সেসব প্রতিষ্ঠান সেমিনার সিম্পোজিয়াম ও সম্মেলনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য দাবি জানায়। এরমধ্যে গান্ধী শান্তি ফাউন্ডেশনের

সেমিনার, মার্কিন আন্তর্জাতিক কাউন্সিল সম্মেলন, বুদাপেস্ট শান্তি সম্মেলন, আন্তর্জাতিক জুরিস্টস কমিশন এবং বহু সমাবেশ সংগঠন বাংলাদেশ প্রশ্নে আন্তরিক সমবেদনা প্রকাশ করে। সেসব সমাবেশ ও অনুষ্ঠানের দাবি ছিল, শেখ মুজিবের মুক্তি, সামরিক নির্যাতন রোধ, পাকিস্তানকে সাহায্যদান বন্ধসহ বিভিন্ন বিষয়ে সোচ্চার হয়ে ওঠে। এ ব্যাপারে মার্কিন কংগ্রেস ও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে অত্যন্ত জোরালো জনমত গড়ে ওঠে।

তার পরও পাকিস্তানের দানব শাসক ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে বিচারের নামে প্রহসন শুরু করে। ইয়াহিয়া দম্ভ করে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবকে মরতেই হবে।’ বঙ্গবন্ধুর জীবন নিয়ে স্বাধীনতাকামী বাঙালি ও বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ যখন বঙ্গবন্ধুর অবস্থান ও শারীরিক খবরা-খবর জানতে উদগ্রীব, ঠিক তখন ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, ‘বাঙালি নেতা পশ্চিম পাকিস্তানে এক কারাগারে সুস্থ ও জীবিত আছেন। তবে আজকের পরে কাল শেখ মুজিবের ভাগ্যে কী ঘটবে, সেটা আমি হলফ করে বলতে পারব না। তার বিচার করা হবে এবং এর মানে এই নয়, আগামীকালই আমি তাকে গুলি করব। তার স্বাভাবিক মৃত্যুও ঘটতে পারে। তাকে কোনো শ্রম করতে হয় না। বিছানা ও গরম পানির ব্যবস্থাসহ একটি ছোট ঘর তার রয়েছে, দেখাশোনার জন্য একজন ডাক্তারও তার রয়েছেন। সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের বিচার ও মৃত্যুদন্ডের ব্যবস্থা করার জন্য আমার জেনারেলরা চাপ দিচ্ছেন। আমি সম্মত হয়েছি এবং খুব শিগগিরই বিচার অনুষ্ঠিত হবে।

২ আগস্ট ১৯৭১ পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের সদর দফতর থেকে প্রচারিত এক প্রেসনোটে বলা হয়, ‘পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা ও অন্যান্য অপরাধের জন্য বিশেষ সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের বিচার করা হবে।’ একইভাবে ৩ আগস্ট ১৯৭১ পাকিস্তান টেলিভিশনে ইয়াহিয়া ঘোষণা করেন, ‘শেখ মুজিবের বিচার করা হবে এবং পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের আইন অনুসারে তার বিচারের ব্যবস্থা হবে।’

একদিকে চলছিল পাকিস্তান সামরিক জান্তা কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর প্রহসনের বিচারের আয়োজন, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী এই প্রহসনমূলক বিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ওঠে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শরণ সিং এ বিষয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন এবং পাকিস্তানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, মুজিবের কোর্ট মার্শাল করা হলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। লোকসভায় ভাষণদানকালে শরণ সিং বলেন, ‘শেখ মুজিবের প্রহসনমূলক বিচার অনুষ্ঠান মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন এবং গোটা বিশ্ব দ্বারা নিন্দিত হওয়ার দাবি রাখে।’

সাড়ে সাত কোটি বাঙালির কাছে বঙ্গবন্ধু ছিলেন ত্রাণকর্তা। তিনি শারীরিকভাবে মুক্তিযুদ্ধে অনুপস্থিত থাকলেও তিনিই ছিলেন সবার প্রেরণার উৎস। তার নামেই মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়। তাই তিনি সশরীরে অনুপস্থিত থেকেও বিদ্যমান ছিলেন সবার প্রাণের গভীরে। প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধা রণাঙ্গনে লড়াই করে তার নামে এবং এবং মৃত্যুবরণও করেছিল এই একই নাম উচ্চারণ করেই। তাই যুদ্ধের ময়দানে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি বাঙালি জাতিকে কোনোভাবেই নিরুৎসাহিত তো করতেই পারেনি বরং তার বন্দিদশা মুক্তিপাগল বাঙালিকে আরো উজ্জীবিত করেছে। আর বঙ্গবন্ধু কারান্তরালে বসে সারাক্ষণ তার প্রিয় দেশের প্রিয় মানুষের কথা ভেবে ভেবে সময় কাটিয়েছেন। বাঙালির ঈদসহ কোনো উৎসবই উপভোগ করতে পারেনি।

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদন্ড নিয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে প্রচ্ছন্ন মতবিরোধ ছিল। তাই ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যা না করার পরামর্শ দেন। কিন্তু এক নায়ক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তার ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সেসব কথা বলেছিলেন তা নিচের বর্ণনা থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে :

‘ডেক্সে একগাদা ফাইল নিয়ে বসেছিলেন ইয়াহিয়া। তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন এক সহযোগী, প্রেসিডেন্ট সেসব কাগজ একে একে স্বাক্ষর করছিলেন। জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ঘরে প্রবেশ করতে দেখে ইয়াহিয়া বললেন, আমার সই করে যাওয়ার সময়ে আপনি কথা চালিয়ে যেতে পারেন। আমি এখন খুব ব্যস্ত। দুপুরে লাঞ্চ করার জন্য চীনা রাষ্ট্রদূত এখানে আসছেন। ভুট্টো বললেন, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমার মনে হয় আমাদের পরস্পরের ভাবনা বিনিময় করে দেখার সময় হয়েছে। তিনি আরো বললেন, আপনি ভালোভাবেই জানেন প্রেসিডেন্ট, আমি কোন বিষয়ের কথা বলছি। দেশের গভীর দুর্গতি চলছে ।... সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। আমাদের নিজেদের কথা ব্যক্ত করার কোনো সুযোগ না দিয়ে প্রতিটি অপোগন্ড সাংবাদিক সভ্য জাতি হিসেবে আমাদের সুনামকে ভূলুণ্ঠিত করছে। আমাদের দরকার নতুন ভাবনা। কল্পনাদীপ্ত নীতি।...

প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এখন যা দরকার সেটা হচ্ছে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি- পূর্ব অংশে শান্তি, শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তিদান, করের বোঝা হ্রাস, দুর্নীতির অবসান। সামরিক অভিযান অনেক দীর্ঘ সময় ধরে চলছে এবং এটা ঘটা আদৌ উচিত ছিল না। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, আপনি এতে সম্মতি দিয়েছিলেন। বস্তুত আপনিই প্রথম এর প্রস্তাব করেছিলেন।... আপনি জানেন আপনি তা করেছিলেন। আপনি সম্পূর্ণভাবে এর সঙ্গে ছিলেন, যদিও এটা আপনার আমার উভয়েরই সময় নষ্ট করবে, তবে আমি আপনার বক্তব্য উদ্ধৃত করে দেখাতে পারি। আপনি যদি এখন নিজের দায়দায়িত্ব অস্বীকার করতে চান, তবে জানবেন সেটা হবে গাঁজাখুরি ব্যাপার। শেখ মুজিবের মুক্তিদান অথবা দুর্নীতি নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে আসবেন না। আমাদের মধ্যে কোনো দুর্নীতি নেই এবং যতক্ষণ আমার দেহে শ্বাস আছে, আমি শেখ মুজিবকে মুক্তি দিচ্ছি না।’

শেখ মুজিব কি বেঁচে আছেন? এই প্রশ্নের উত্তরে প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘অবশ্যই সে বেঁচে আছে। যখন তার মৃতুদন্ড হবে, সেটা অবশ্য ঘোষণা দেওয়া হবে। এ কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘আল্লাহর দোহাই, তাকে হত্যা করবেন না। কারণ এটা দেশের পক্ষে ক্ষতিকর। তাকে একজন শহিদ বানিয়ে আমাদের কিছু অর্জিত হবে না। আপনার হাতে নিহত হওয়ার চাইতে অনেক বড়মাপের মানুষ তিনি। তেমন ঘটলে সারা পৃথিবী বিশেষ করে আমেরিকা এতে বিরক্ত হবে।’

ভুট্টোর এই কথায় দম্ভভরে ইয়াহিয়া বলেছিলেন, ‘আমেরিকানদের আমি পকেটে পুরে রাখি! আমেরিকানরা কী করবে, কী করবে না সেটা আমাকে বলতে হবে না। আপনি কি মনে করেন, শেখের কি হলো নিক্সন তার কোনো পরোয়া করে। আর আমি যখন কিসিঞ্জারকে শেখের কথা বলেছিলাম তখন তিনি বলেছিলেন, সেটা আপনাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার এবং এটা তাই হতে চলেছে।’

ভুট্টো ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার মধ্যে আলাপ চলাকালে প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে একজন কর্মী এসে ঢুকল প্রেসিডেন্টের দফতরে। ডেক্সের কাছে এসে বাজখাঁই গলায় ঘোষণা করল চৈনিক রাষ্ট্রদূতের গাড়ি ড্রাইভওয়ে দিয়ে এগিয়ে আসছে। প্রেসিডেন্ট তার আসন ছেড়ে লাফিয়ে উঠলেন, মৃদু হেসে তিনি এক গম্ভীর ও শান্তভাব ধারণ করলেন এবং ঘর থেকে বের হতে উদ্যত হলেন।

ভুট্টো এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন, মুজিব শহিদের মৃত্যু বেছে নিয়েছে এবং তার কবরের ওপর বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটবে বলে আশা করছেন। সম্ভবত এটা ছিল মুজিবের সম্ভ্রম উদ্রেককারী চেহারা ও অদম্য সাহস, যা ২৫ মার্চ রাতে তাকে গুলি করে শেষ করা থেকে ইয়াহিয়ার সৈন্যদের বিরত করেছিল। তবে একবার যখন তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং ইয়াহিয়া সে কথা প্রকাশ করেছেন, তখন মৃত্যুদন্ডের আগে কিছু একটা বিচার করতে হবে। আর সম্ভবত সেই বিচারের জন্য হলেও তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

চারদিকে প্রচারণা ও গুজব ছিল শেখ মুজিবের ফাঁসির জন্য নির্ধারিত সেই রাতে জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার সফঙ্গ দেখা করে শেখ মুজিবকে ফাঁসি না দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি ইয়াহিয়াকে বোঝাতে চেষ্টা করেন, যদি মুজিবকে ফাঁসি দেওয়া হয়, তবে তাদের ক্রোধের লক্ষ্য হবে পূর্বাঞ্চলে মোতায়েনকৃত পাক বাহিনীর সর্বোচ্চ অফিসার থেকে সর্বনিম্ন সৈনিক পর্যন্ত সবাই। ভুট্টোর পরামর্শ অনুযায়ী ইয়াহিয়া বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির আদেশ স্থগিত রাখেন। এভাবে বঙ্গবন্ধুর জন্য তিনবার কবর খুঁড়ে তিনবারই ভরাট করা হয়। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসি দেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য ইয়াহিয়া খান কারা কর্তৃপক্ষের কাছে নির্দেশ পাঠিয়েছিলেন। সেই নির্দেশে জানিয়েছিলেন, মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার জন্য বিশেষ টেলিগ্রাম যাবে তাদের কাছে। কিন্তু তার আগেই ঢাকা পতনের মাধ্যমে পরাজিত হলো ইয়াহিয়া সেনাবাহিনী।

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাঙালির জীবনে উপস্থিত হয় ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাঙালি জাতি জয়লাভ করে মুক্তিযুদ্ধে। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে জেনারেল নিয়াজি যখন আত্মসমর্পণের দলিলে মাথা নত করে স্বাক্ষর করছিলেন বাঙালির স্বাধীনতার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের কারাগারে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন। ইয়াহিয়াকে বঙ্গবন্ধু হত্যার চিন্তা এতটাই আচ্ছন্ন করে রেখেছিল যে, ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে তিনি ভুট্টোকে বলেছিলেন, ‘এখন আপনাকে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে অনুগ্রহ করে পেছনের তারিখ দিয়ে নির্দেশ জারি করে মুজিবকে মেরে ফেলার সুযোগ আমাকে দিন। কিন্তু তার এ প্রস্তাবে ভুট্টো রাজি না হলে ইয়াহিয়া খান আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘মুজিবকে শুরুতে না মেরে সবচেয়ে বড় ভুল করেছি আমি।’

বিচারকাজের সপ্তম দিনে আনুষ্ঠানিক বিচারকার্য শুরু হওয়ার আগে মামলার কৌঁসুলি এগিয়ে এসে বঙ্গবন্ধুর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললেন, আপনি কি নিজের পক্ষে কোনোই অবস্থান নেবেন না?

বঙ্গবন্ধুর তেজোদীপ্ত উত্তর ছিল ‘না’-

সঙ্গে সঙ্গেই কৌঁসুলি বললেন, ‘আমার কাজ জটিল করে তুলছেন আপনি।’ প্রতি উত্তরে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তা জানি। তবে আমি কি করতে পারি? আমি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। আমাকে অথবা আমার জনগণকে বিচার করার কোনো অধিকার এদের নেই। আইনের দিক দিয়ে এ আদালতের কোনো বৈধতা নেই।’

বঙ্গবন্ধুর কৌঁসুলি ব্রোহীকে নিয়োগ করা হলেও আদালতে ইয়াহিয়া খানের ২৬ মার্চের ভাষণের টেপ শোনার পর বঙ্গবন্ধু কোনো ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থন করতে অস্বীকার করেন এবং ব্রোহীকে অব্যাহতি দেন। সরকার পক্ষ ১০৫ জন সাক্ষীর তালিকা জমা দিয়েছিল। কিন্তু এ তালিকার অর্ধেক সাক্ষীকেও হাজির করা হয়নি, বা করতে পারেনি।

এমন এক বিভীষিকাময় সময়ের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু পার করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন পুরো ৯ মাস। এই ৯ মাস ছিল যেন তার শুধুই মৃত্যুর ক্ষণগণনার পালা। কিন্তু পাকিস্তানি একনায়ক শত চেষ্টা করেও বাঙালিদের ভালোবাসা ও আন্তর্জাতিক চাপে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারেনি। বরং মুক্তিযুদ্ধের মহান বিজয়ের পর তাকে সসম্মানে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল মাথা নত করেই।

লেখক : কবি-কথাসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ ও গবেষক

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0