করোনায় কৃষি বিপণনের ভাবনা

করোনায় কৃষি বিপণনের ভাবনা

করোনাভাইরাসে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিশেষ করে উৎপাদনশীল খাতে মারাত্মকভাবে ধস নেমেছে। শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলো সব কর্মকাণ্ড বন্ধ করে লকডাউনে আছে। বিশ্ব অর্থনীতিতে পূর্ণ নিয়োগ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। বাংলাদেশ এর বাইরে নয়।

করোনাভাইরাস যেমন মৃত্যুর কারণ হতে পারে, ঠিক সেভাবেই অভাব, ক্ষুধা, হতাশা ও মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে পারে। অর্থনীতিকে, বিশেষ করে কৃষি অর্থনীতি উজ্জীবিত রাখা করোনা প্রতিরোধে গঠিত পদক্ষেপের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এই ক্ষেত্রে যথাযথ ভূমিকা পালন করা যেতে পারে কৃষি উৎপাদন ও বিপণনের ওপর জোর দিয়ে।

দুর্যোগকালে কৃষি বিপণনের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিশেষ করে পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থার ওপর কড়াকড়ি আরোপের ফলে উৎপাদিত পণ্য ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না। অন্যদিকে ক্রেতারাও লকডাউনে থাকায় নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ঘরে অবস্থান করে নিয়ম করে বাজারে যান এবং হিসাব করে পণ্য কেনেন। দেশের সব জায়গায় সব পণ্য উৎপাদিত হয় না, তাই পরিবহনব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের বিপণনে ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

আমাদের দেশের বাজারব্যবস্থার গঠন সুবিন্যস্ত নয়। অভাব যথাযথ অবকাঠামোর। উৎপাদক ও ভোক্তার মধ্যে সংযোগ স্থাপনের জন্য বাজার বা হাটের অবস্থান। কিন্তু সব সময় সব পণ্যের চাহিদা সমান থাকে না। বর্তমান সময়ে সব ধরনের খাদ্যদ্রব্যের চাহিদা সমান নয়। এখন চাল, ডাল, আলু, ডিমসহ কিছু খাদ্যের চাহিদা যেমন অনেক বেশি; দুধ, মাংসসহ কিছু খাদ্যের চাহিদা ততটা নয়। এই মুহূর্তে মিষ্টির দোকানগুলো বন্ধ, তাই দুধের চাহিদা স্বাভাবিক কারণেই কম। আবার হোটেলগুলো বন্ধ ও মানুষের আয় কমার কারণে মাছ-মাংসের চাহিদাও কমেছে। বেশির ভাগ পণ্য পচনশীল, তাই তাদের প্রক্রিয়াকরণ ও যথাযথ সংরক্ষণ প্রয়োজন। প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের অভাবে চাহিদার তুলনায় জোগান বেশি থাকায় এবং পচনশীল বিধায় অনেক শাকসবজি ও কৃষিপণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে, যা পরে কৃষি উৎপাদকদের কৃষিবিমুখ করতে পারে।

বিআইডিএসের গবেষণায় দেখা যায়, আমাদের দেশে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ সংগৃহীত খাদ্য নষ্ট হয়। যার মধ্যে ৩ শতাংশ প্রক্রিয়াজাতকরণ পর্যায়ে নষ্ট হয়। তাই প্রয়োজন সংরক্ষণের সুব্যবস্থা করা, বিশেষ করে গুদামজাতকরণ বা কোল্ড স্টোরেজের ব্যবস্থা করা।

উৎপাদিত শস্য সংগ্রহে শ্রমিকের সংকট। অধিক পরিশ্রম, তুলনামূলক কম আর্থিক সুবিধা ও সব সময় কাজের ব্যবস্থা না থাকার কারণ হিসেবে শ্রমিকের সংকটকে ধরা হয়। বর্তমানে আমাদের দেশে কৃষিশ্রমিকের তুলনায় অন্যান্য খাতে শ্রমিকের সংখ্যা বেশি। মানুষ এখন অটোরিকশা চালায়, চায়ের দোকান পরিচালনা বা ছোট মুদি দোকানে অনেক বেশি আগ্রহী হচ্ছে। অনেকে শিল্প খাতে স্থানান্তর হচ্ছেন, যেমন: মিল, কলকারখানায় কাজ করছেন, যাঁদের বেশির ভাগই কৃষি খাতের সঙ্গে একসময় সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে দেখা গেছে কৃষিশ্রমিকের হার ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ। যেখানে সেবামূলক খাতে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩৬ দশমিক ৯৫ শতাংশ। অন্যদিকে শিল্প খাতে কিছুটা কমে হয়েছে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ।

আমাদের দেশে অনিয়ন্ত্রিত বাজারব্যবস্থা বিরাজমান। ফলে অসাধু মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করার প্রয়াস পায়। নিয়ন্ত্রণের অভাবে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা ও উচ্চ মূল্যে পণ্য বিক্রয় করার সুযোগ পায়। যার কোনো সুফল প্রান্তিক কৃষক বা প্রকৃত ছোট উৎপাদকেরা কখনোই পান না। অন্য কোনো খাত এতটা অস্থিতিশীল হয় না, যতটা হয় কৃষি খাত। তাই তো কখনো কখনো মরিচের দাম, পেঁয়াজের দাম, বেগুনের দাম, পটোলের দাম, আদার দাম, রসুনের দাম, মসলার দাম আকাশ ছুঁয়ে ফেলে। তাই বাজারব্যবস্থায় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের নিয়ন্ত্রণ আবশ্যক।

বাংলাদেশের কৃষি খাতে বিপণনের জ্ঞানের প্রয়োগের ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। এই খাতের সংশ্লিষ্টরা বাজারের প্রকৃত চাহিদা ও জোগান সম্বন্ধে কম ওয়াকিবহাল। অর্থাৎ তাদের বিপণন জ্ঞানের অভাব থাকার কারণে সঠিক সময়ে সঠিক পণ্য উৎপাদন ও তা সঠিক ভোক্তাদের নিকট পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়। তাই কখনো কখনো বাঁধাকপি গরু দিয়ে খাওয়াতে হয় বা টমেটো রাস্তায় ফেলে কৃষকের কান্নাকাটি করতে হয়। বাজার গবেষণার মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য নিরূপণ করে এলাকাভিত্তিক কৃষকদের মধ্যে জানানোর মাধ্যমে জোগান ও চাহিদা ভারসাম্য আনয়ন সম্ভব। আর সেটা না করা গেলে যথাযথ সংরক্ষণের মাধ্যমে রপ্তানির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন ৪১টি দেশে টমেটো, গাজর, শিম, বেগুন, আলু রপ্তানি করে থাকে। যার বাজারমূল্য প্রায় ১০৫ দশমিক ৩৯ মিলিয়ন ডলার। বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন, সব দেশেই এই মুহূর্তে সমস্যা মোকাবিলা করছে এবং তাদের কৃষি খাতের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তাই আমদানি করে দেশীয় চাহিদা মেটানো সম্ভব নয়। সম্পূর্ণ স্থানীয় উৎপাদনে দেশীয় অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে হবে।

বাংলাদেশ কৃষি বিপণন ও সমবায় বিপণন খুবই ফলপ্রসূ ধারণা। আমাদের কৃষি উৎপাদকেরা তুলনামূলক কম শিক্ষিত। আর্থিকভাবেও তারা খুব বেশি সচ্ছল নয়। তাই সমবায় বিপণনের মাধ্যমে নিজেরা লাভবান হতে এবং উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে পারবে। সেই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগী দালাল, ফড়িয়া ও আড়তদারদের কারসাজি দূর করতে পারবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালে দেখা যায় অনেকে এই ধারণা অনুসরণ করে সফল। নেদারল্যান্ডসের সবজির বাজার ১০০ শতাংশ, ফলের বাজার ৭০ শতাংশ, জাপানে ৭০ শতাংশ, আমেরিকায় ২৩ শতাংশ সমবায় বিপণনের মাধ্যমে বিক্রি হয়ে থাকে। সুতরাং সরকারের কৃষি বিপণন অধিদপ্তর, কৃষি বিভাগ ও সমবায় বিভাগ সম্মিলিতভাবে কাজ করে কৃষকদের মধ্যে সমবায় বিপণন গঠন করতে ভূমিকা পালন করতে পারে।

কৃষকদের অর্থের অপ্রতুলতা কৃষি বিপণনের অনেক বড় বাধা। বেশির ভাগ কৃষক এখন বর্গাচাষি। পরের জমিতে চাষাবাদ করে নিজেদের জীবন যাপন করেন বলে তাঁদের সঞ্চয় কম। আর চাষাবাদে তাঁরা অর্থ সংগ্রহ করেন স্থানীয় সুদ কারবারিদের কাছ থেকে। পরে ফসল বিক্রি করে তাঁরা চড়া মূল্যে শোধ করে থাকেন। তাঁরা ফসল ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সংগ্রহ করে তুলনামূলক কম মূল্যে কারবারিদের কাছে বিক্রি করতে বাধ্য হন। দুর্যোগ বা করোনাকালে সেটা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। কারণ, চারদিকে তারল্য সংকট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের ব্যবস্থা ও সরকারি সহায়তা তাদের উৎপাদিত পণ্য সঠিকভাবে বিপণন করতে সক্ষম করে তুলতে পারবে।

কৃষি উৎপাদন ও বিপণন সুনিশ্চিত করতে হলে Backward Linkage কার্যক্রম গতিশীল রাখতে হবে। স্বল্পমাত্রায় হলেও সার, বীজের সরবরাহ যাতে সচল থাকে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন যাঁরা মাছ চাষ করেন, তাঁরা যদি প্রয়োজনীয় ফিড বা মাছের খাবারের জোগান না পান, তাহলে তাঁদের মাছ চাষের কার্যক্রম ব্যাহত হবে। একই অবস্থা পোলট্রি মুরগি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরও। অন্যথায় বাজারে জোগান ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষা করা যাবে না।

বর্তমান সময়ে সরকার আরেকটি কাজ করতে পারে, তা হলো স্টেট ট্রেডিং অর্থাৎ সরকারি কিছু বিভাগ, কৃষি মন্ত্রণালয় কিছু খাদ্যপণ্য, যার চাহিদা বেশি জোগান বেশি, তা কিনে সংরক্ষণ করতে পারে। ইতিমধ্যে টিসিবির মাধ্যমে সরকার চাল, ডাল, তেল বাজারে কম দামে জনগণের কাছে বিক্রি করছে। সঙ্গে সঙ্গে প্রাইমারি মার্কেট থেকে অন্যান্য পণ্য সংগ্রহ করে নিজ পরিবহনব্যবস্থার মাধ্যমে যেখানে সরবরাহ কম, সেখানে সরবরাহ করতে পারে। মনে রাখতে হবে, খাদ্যপণ্যের কোথাও অপ্রতুলতা আছে, আবার কোথাও প্রাচুর্য আছে। সুতরাং এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা করোনাকালে বিশেষ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

আশা করছি, প্রধানমন্ত্রীর সুদূরপ্রসারী দিকনির্দেশনা কৃষিবিদ হিসেবে কৃষিমন্ত্রীর অর্জিত জ্ঞান ও অন্যান্য কৃষি, অর্থনীতি ও বিপণন বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ এবং আমাদের কৃষি উৎপাদকদের কষ্টের ফলে আমরা কৃষি বিপণনের সৃষ্ট সমস্যা কাটিয়ে উঠে গতিশীলতা আনতে পারব।

*লেখক: শিক্ষক, মার্কেটিং বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0