ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বঙ্গবন্ধু

ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বঙ্গবন্ধু

কাজী মুফতি আতাউর রহমানঃ ‘পৃথিবীতে সেই উত্তম ব্যক্তি যে মানুষের কল্যাণ করে’ (আল-হাদিস)। বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একজন ঈমানদার মুসলিম ছিলেন। অন্যদিকে ছিলেন অসাধারণ একজন নিখাদ দেশপ্রেমিক। ইসলামের প্রতি তাঁর ছিল অতুলনীয় ভক্তি ও শ্রদ্ধা। তিনি চেয়েছিলেন এ দেশের মানুষের মধ্যে প্রকৃত ইসলামি শিক্ষা ও মর্মবাণী প্রচার ও প্রসার লাভ করুক। তিঁনি চেয়েছিলেন অসাম্প্রদায়িকতা ও ন্যায় বিচারের মতো মৌলিক আদর্শের প্রচার ও প্রসার হউক।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের পূর্বে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান মারফত প্রদত্ত ভাষণে জাতির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন- ‘আমরা লেবাছ সর্বস্ব ইসলামে বিশ^াসী নই, আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হযরত রাসূলে করীম (সা.) এর ইসলাম। যে ইসলাম জগতবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র। ইসলামের প্রবক্তা সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বার বার যারা অন্যায়-অবিচার, শোষণ-বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছেন, আমাদের সংগ্রাম সেই মুনাফেকদের বিরুদ্ধে।

তিনি দেশের আলেম সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি অভিন্ন প্লাটফর্ম থেকে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর তথা ইসলামের প্রচার ও প্রসারের উদ্দেশ্যে ১৯৭৫ সালে ২২ শে মার্চ এক অধ্যাদেশবলে ইসলামি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন।

২৮শে মার্চ ১৯৭৫ সালে ইসলামি ফাউন্ডেশন এ্যাক্ট প্রণীত হয়। বঙ্গবন্ধুর প্রতিষ্ঠিত ইসলামি ফাউন্ডেশন এখন সরকারি অর্থে পরিচালিত মুসলিম বিশে^র অন্যতম একটি বৃহৎ ইসলামি সংস্থা হিসাবে পরিচিত ও প্রশংসিত। ইসলামি ফাউন্ডেশন আইন ২৮শে মার্চ ১৯৭৫ সাল হতে অদ্যাবধি বলবৎ রয়েছে। এই আইন অনুযায়ী সরকার ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক নিয়োগ করেন। তিনি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী। ফাউন্ডেশনের ২১টি ধারা রয়েছে। এর ৬নং ধারায় ইসলামি ফাউন্ডেশন বোর্ড অব গভর্ন্যান্স গঠন সম্পর্কে বিধি-বিধান বর্ণিত হয়েছে। ১১নং ধারায় ইসলামি ফাউন্ডেশনের কার্যাবলী সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়। নি¤েœ ইসলামি ফাউন্ডেশনের কার্যাবলী সংক্ষিপ্ত আকারে বর্ণনা করা হলো।

১. মসজিদ ও ইসলামি কেন্দ্র, একাডেমী এবং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা ও রক্ষণা-বেক্ষণ করা।
২. মসজিদ ও ইসলামি কেন্দ্র, একাডেমী, ইনস্টিটিউট এবং সমাজ সেবায় নিয়োজিত সংগঠন সমূহকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া।
৩. সাংস্কৃতিক চিন্তা, বিজ্ঞান ও সভ্যতার ক্ষেত্রে ইসলামের অবদানের উপর গবেষণা পরিচালনা করা।
৪. ইসলামের মৌলিক আদর্শ, বিশ^ ভাতৃত্ববোধ, পরমত সংহিষ্ণুতা, ন্যায় বিচার প্রভৃতি প্রচার করা ও প্রচারের কাজে সহযোগিতা করা এবং সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের সুপারিশ করা।
৫. ইসলামি মূল্যবোধ ও নীতিমালা বিস্তৃতি করার লক্ষ্যে ইসলামের ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি, আইন ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কিত গবেষণার আয়োজন করতঃ তার প্রসার ঘটানো এবং জনপ্রিয় ইসলামি সাহিত্য সুলভে প্রকাশ করা এবং সেগুলির বিলি-বন্টনকে উৎসাহিত করা।
৬. ইসলাম ও ইসলামের বিষয় সম্পর্কিত বই-পুস্তক, সাময়িকী ও প্রচার পুস্তিকা অনুবাদ করা, সংকলন করা ও প্রকাশ করা।
৭. ইসলামের ইতিহাস, দর্শন, সংস্কৃতি, আইন ও বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কিত বিষয়াদির উপর সম্মেলন, বক্তৃতামালা, বিতর্ক ও সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা।
৮. ইসলাম সম্পর্কিত প্রকল্পের উদ্যোগ নোওয়া, প্রকল্প গ্রহণ করা কিংবা তাতে সহায়তা করা ইত্যাদি।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু আলেম-উলামাদের সংগঠিত করে মহানবী (সা.) জীবন ও কর্ম জনগণের মাঝে তোলে ধরার জন্য ঢাকায় একটি সিরাত মজলিশ প্রতিষ্ঠা করেন। এই সিরাত মজলিশের উদ্যোগে ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালে রবিউল আউয়াল মাসে জাতীয় পর্যায়ে ১ম ঈদে মিল্লাদুন্নবী (সা.) পালন করা হয় এবং বঙ্গবন্ধুই সর্বপ্রথম বাংলাদেশের হজ¦ যাত্রীদের জন্য সরকারি তহবিল হতে অনুদানের ব্যবস্থা করেন।

বাংলাদেশ হতে সমুদ্র পথে পবিত্র মক্কায় যাওয়ার জন্য স্বল্প ব্যয়ে হজ¦ সম্পাদন করার জন্য হিজবুল বাহার নামে একটি জাহাজ ক্রয় করেন। মাদ্রাসার ছাত্রদের শিক্ষার মান বাড়ানোর জন্য তিনি মাদ্রাসা বোর্ডকে শায়িত্ব শাসন প্রদান করেন। এর নাম রাখে বাংলাদেশ মাদ্রাসা বোর্ড।

ঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই বাংলাদেশে সর্বপ্রথম বেতার ও টিভিতে কোরআন তিলাওয়াত ও তাফসীর প্রচার শুরু হয় এবং তিনিই প্রথম বাংলাদেশে ইসলামি ধর্মীয় দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের লক্ষ্যে ঈদে মিল্লাদুন্নবী (সা.), শবে ক্বদর, শবে বরাত উপলক্ষে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। তাবলীগ জামাতের দাওয়াতি কাজ প্রচার ও প্রসারের সুবিধার জন্য বঙ্গবন্ধু ঢাকার কাকরাইলে মারকাজ মসজিদের জন্য জমি বরাদ্ধ এবং মসজিদটি সম্প্রসারণ করার নির্দেশ প্রদান করেন। এমনকি বিশ^ ইজতেমার জন্য টঙ্গিতে সুবিশাল জায়গা বরাদ্ধ দেন। শুধু তাই নয় সুদ ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিবর্তে শরীয়া ভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে আইডিবি চার্টার-এ স্বাক্ষর করেন।

উপরে উল্লেখিত আলোচনা থেকে এটাই স্পষ্ট হয় যে, ইসলামের খেদমতে বঙ্গবন্ধু ছিলেন অত্যন্ত নিবেদিত এক মহান ব্যক্তিত্ব। তাঁর সাড়ে তিন বৎসরের শাসনামলে ইসলামের খেদমতে যে যুগান্তকারী অবদান রেখে গেছেন বর্তমান বিশে^ তা এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য উত্তরসুরী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলি সুন্দর ও সফলতার সাথে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। ইসলাম প্রচার ও প্রসারে তাঁর সরকারের সাফল্যের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র সবার জ্ঞাতার্থে তোলে ধরা হল।

১. ৭৪,১০,০০০/- টাকা ব্যয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিক নির্দেশনায় পবিত্র কোরআন সর্বপ্রথম ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে।

২. এই দেশের মুসলমানদের দীর্ঘ দিনের দাবি ইসলামি আরবি বিশ^বিদ্যালয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ২০১৩ সালে মুসলমানদের দাবি পূরণ ও ইসলামি শিক্ষাকে সর্বস্তরে এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে প্রতিষ্ঠার জন্য ঢাকায় ইসলামি আরবি বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। শুধু তাই নয় অবহেলিত হাজার হাজার কওমী মাদরাসার শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সনদের সরকারি স্বীকৃতি প্রদানের উদ্দেশে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ কওমী মাদরাসা শিক্ষা কমিশন গঠন করেন এবং সরকার কওমী শিক্ষার্থীদের সনদের সরকারি স্বীকৃতি প্রদান করেন।

৩. মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পটি জাতীয় একনেক কতৃক শতকোটি ৯৩ লক্ষ টাকা ব্যয় বরাদ্ধ করে অনুমোদিত হওয়ায় ৭৬ হাজার আলেম উলামার কর্ম সংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমান সরকার মহিলাদের কর্মসংস্থান করার লক্ষ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় মাসিক সম্মানির ভিত্তিতে প্রায় ৬ হাজার ধর্ম পরায়ণ মহিলার কর্মসংস্থান ইত্যাদি করা হয়েছে।

৪. মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একান্ত আগ্রহে মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কেন্দ্রকে বিদ্যালয়ে উন্নীত করে যে সকল এলাকায় স্কুল নেই এবং বাংলাদেশের প্রতিটি উপজেলায় দু’টি করে ১০১০টি কেন্দ্রে মহানবী (সাঃ) কতৃক প্রতিষ্ঠিত “দারুল আরকাম” এর নামানুসারে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পবিত্র কোরআন, হাদীস, ফিক্হ, নৈতিকতা, ধর্মীয় মুল্যবোধসহ জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামের বাধ্যতামূলক বিষয় সমূহ শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

৫. বাংলাদেশের ৯০% এর বেশি অধিবাসী ধর্মীয়ভাবে ইসলাম অনুসারী। তাদের সাথে মসজিদের সম্পর্ক এমন স্থান যেমন- দেহের সাথে আত্মার সম্পর্ক। মসজিদ হলো আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করার স্থান। রাসূল (সাঃ) বলেন, আল্লাহ তায়ালার নিকট স্থানসমূহের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রিয় স্থান মসজিদ সমূহ এবং সর্বাপেক্ষা ঘৃণ্য স্থান বাজার সমূহ (মুসলিম শরীফ)।

৬. বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১৩ সালের ১০ই নভেম্বর ঢাকায় এক সম্মেলনে ঘোষণা করেন যে, বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় ও উপজেলায় অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি করে মসজিদ ও ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে ইনশাআল্লাহ! তারই আলোকে সারা বাংলাদেশে ৫৬০টি মডেল মসজিদের কাজ চলমান আছে। এই মসজিদ নির্মার্ণের পর যে সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাবে তন্মধ্যে অন্যতম হলো- (১) একসাথে জেলা পর্যায়ে ৫০০ জন মুসল্লী এবং উপজেলায় ৩০০ জন মুসল্লী নামায আদায় করতে পারবেন। (২) লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করা হবে। (৩) গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি হবে। (৪) দাওয়াতি কাজের সুযোগ তৈরী হবে। (৫) পবিত্র কোরআন হিফজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। (৬) প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ হবে। (৭) ডিজিটাল বৈশিষ্ট্যগুলোর সুযোগ সৃষ্টি হবে (৮) সন্ত্রাস ও নারী নির্যাতন বিরুধী সমাজ উন্নয়ন মূলক বিষয়ে খুৎবা প্রদানের সুযোগ তৈরী হবে (৯) মৃত ব্যক্তির গোসলের সুবিধা ইত্যাদি থাকবে।

৭.
এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে যে সব ফলাফল অর্জিত হবে তা নি¤œরূপ:
(১) মসজিদ ইবাদতের স্থান হিসাবে ব্যবহৃত হবে, রাজনৈতিক তৎপরতা বন্ধ হবে।
(২) মসজিদে প্রদত্ত খুৎবায় আর্থসামাজিক উন্নয়নের পক্ষে এবং সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন ও মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি হবে।
(৩) ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও মর্মবাণী প্রচারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
(৪) নানা ধরণের প্রশিক্ষণ কর্মসূচী বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরী হবে।
(৫) নৈতিক শিক্ষার বিস্তৃতি ঘটবে।
(৬) সামাজিক সমস্যা সমাধানে সচেতনতা সৃষ্টি হবে।
(৭) পর্যাপ্ত সংখ্যক মসজিদ সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখবে।
(৮) আলেম-ওলামার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
(৯) সরকারের প্রতি জনগণের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি হবে ইত্যাদি।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট, ভাইস প্রিন্সিপাল (অবঃ), বানিয়াচং সিনিয়র ফাযিল মাদরাসা, বানিয়াচং, হবিগঞ্জ।

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0