আগামীতে চলার পথ কঠিন হবে

আগামীতে চলার পথ কঠিন হবে

ডা. এস এ মালেক : চীনে যখন প্রথম উহান প্রদেশে মানুষ করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হলো, তখন লকডাউন প্রক্রিয়া প্রথম থেকেই বেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হলেও প্রথম দুই মাসেই সেখানে প্রায় ৩ হাজার লোক করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এটা সম্ভবত প্রমাণ করে, লকডাউন প্রক্রিয়া যেভাবে করা উচিত ছিল; হয়তো তা যে কারণেই হোক- সঠিকভাবে করা হয়নি। প্রথম থেকেই যিনি বা যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন, আর তাদের সংস্পর্শে আসতে হয়েছিল, এদের যদি সমাজের বাকি অংশ থেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করে রাখা যেত; এমনকি জরুরি প্রয়োজনেও ঘর থেকে বাহির হতে না দিয়ে বাইরে থেকে প্রয়োজন মেটানো হতো, তাহলে রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রিত হতো বলে মনে হয়। পরে এটা যখন ইউরোপে ছড়িয়ে গেল একটার পর একটা দেশ আক্রান্ত হতে লাগলো; মানুষের মৃতু্য ও সংক্রমণের সংখ্যা বেড়ে গেল। তখন আর পুরোপুরি লকডাউন করা সম্ভব হয়নি। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে রোগ দ্রম্নত ছড়িয়ে যাওয়ার কারণেই সামাজিক দূরত্বের প্রশ্নটা আসে। আর সামাজিক দূরত্বের ব্যাপারটা এতই জটিল, এটা শুধু সরকারি নির্দেশের কারণেই সফল করা যায় না। বরং জনগণের সচেতনতা ও জনসংখ্যার অভ্যাসগত প্যাটার্নের ওপর নির্ভর করেছে। তাই স্বভাবগতই শুধু বাড়িতে বা নির্দিষ্ট এলাকায় কঠোরভাবে কোয়ারেন্টিন নিয়ম সফল না হওয়ার কারণ হচ্ছে, জরুরি প্রয়োজনেই হোক বা যে কারণেই হোক কোয়ারেন্টিন সফল করা যায়নি। সুতরাং শুধু বাড়িতে আবদ্ধ থাকলেই এই রোগ নিয়ন্ত্রিত হবে এরূপ প্রত্যাশা গোড়া থেকে করা শতভাগ সঠিক ছিল বলে মনে হয় না। ধরুন এটা কোয়ারেন্টিন এলাকায় ১০ হাজার লোককে আবদ্ধ করে রাখা হলো। তার মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে ১০০ লোক। আর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বাকি ৪০০ লোক। এই ৫০০ লোক ছাড়া বাকি ৯ হাজার ৫০০ লোক সুস্থ। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত ও উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। ৫০০ লোককে কঠোরভাবে আবদ্ধ রেখে বাকি ৯ হাজার ৫০০ লোককে যদি শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিক্ষেত্রে কর্মরত থাকতেন, তাহলে অর্থনীতিতে হঠাৎ করে সর্বাত্মক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হতো না। সুতরাং ৫০০ আক্রান্ত লোকের নিরাপত্তার কারণে ৯ হাজার ৫০০ সুস্থ লোককে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকর্মে অংশগ্রহণ করতে না দিয়ে মূলত অর্থনীতিকেই অচল করে দেওয়া হয়েছে। সে কারণেই সংকটের গভীরতা মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে করোনার মৃতু্য ও সংক্রমণের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। আর একই সঙ্গে অর্থনীতির চাকা বন্ধ হওয়ার কারণে গোটা সমাজে চরম অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ ও ক্ষুদ্র আয়ের লোকরা যখন স্বাভাবিক জীবন-যাপন প্রণালি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে, রোজগার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন এবং সে কারণে পরিবারের সদস্যরা অনাহারের সম্মুখীন হয়েছেন। বেকারত্বের সংখ্যা দ্রম্নত বেড়ে গেছে। সবকিছু বিবেচনায় নিলে প্রথম থেকেই লকডাউন যতটা কার্যকর করা সম্ভব হয়েছে; শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদনব্যবস্থা, তার থেকে দ্রম্নত কর্মক্ষমতা হারিয়ে বসেছে। জনসংখ্যার সুস্থ অংশকে আইসোলেট করে যদি প্রথম থেকেই উৎপাদন যন্ত্র চালু রাখা সম্ভব হতো; তাহলে অর্থনৈতিক সংকট থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পাওয়া যেত। শিল্পপ্রধান দেশগুলোতে যতটা গভীর সংকটের সৃষ্টি হয়েছে, কৃষিপ্রধান দেশ কিন্তু সংকটের মাত্রা ততটা মারাত্মক হয়নি। বাংলাদেশের মতো কৃষিপ্রধান দেশে লকডাউনের কারণে কৃষিব্যবস্থাপনায় যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি তা নয়। তবে গার্মেন্ট শিল্পের শ্রমিকরা যে সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন, কৃষিকাজে নিয়োজিত শ্রমিকরা ততটা হননি। বাংলাদেশের ছোট, মাঝারি ও বড় শিল্প-কারখানা যে ধরনের স্থবিরতা সৃষ্টি হয়েছে, কৃষি ক্ষেত্রে তা হয়নি। শ্রমসংকট কৃষি ক্ষেত্রেও দেখা দিয়েছিল, কিন্তু সরকার সুকৌশলে লকডাউন সিস্টেমকে অগ্রাহ্য করে কৃষি ক্ষেত্রে শ্রমিক নিয়োগের ব্যবস্থা করেছেন। যে কারণে এবারের প্রধান ফসল বোরো ধান ঘরে উঠানো সম্ভব হয়েছে।


এখন শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর যেসব দেশ বিশেষ করে ইউরোপ অঞ্চলে করোনার আক্রমণ ভয়াবহ ধারণ করেছিল, এখনো চলছে বা আক্রমণের পরিমাণ কিছুটা শিথিল হয়েছে। সব ক্ষেত্রে সরকারকে করোনার কারণে অচল অর্থনীতিকে সচল করার উদ্যোগ নিতে হচ্ছে। কম-বেশি সব দেশেই এই নীতি অনুসরণ করতে যাচ্ছে। এখানে যে দ্বন্দ্বটা এখন বেশ কিছুটা প্রকট বলে মনে হচ্ছে; তা যথাযথ বুদ্ধি-বিবেচনার সঙ্গে সমাধান করতে না পারলে দেশে নতুন করে সামাজিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে।প্রশাসনের বাইরেও সাধারণ জনগণের একাংশ মনে করছেন, দেশের করোনার আক্রমণ ও সংক্রমণ যখন দ্রম্নত বৃদ্ধি পাচ্ছে; তখন বাংলাদেশ সরকার স্থবির অর্থনীতির ক্ষেত্রে গতি সঞ্চারের উদ্যোগ নিতে গিয়ে করোনা নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার সিদ্ধান্ত সঠিক নয়। প্রশ্ন উঠেছে- ঈদের ছুটিতে বাড়িমুখী হওয়া জনসংখ্যার এক বিপুল অংশকে প্রথমে নিষেধাজ্ঞা জারি করে পরে আবার গ্রামে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হলো কেন? এসব নিয়ে বিতর্ক চলছে। তাছাড়া শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন, বিতরণব্যবস্থা সবকিছু যেখানে বন্ধ রয়েছে, সেখানে তো সংশ্লিষ্ট মানুষের জীবন-যাত্রাই অচল। এসব কর্মচারীদের তো সরকার অনির্দিষ্টকাল খাবার সরবরাহ করতে সক্ষম নন। আর সব লোককে যদি সরকারের খাওয়ানোর সামর্থ্য থেকেই থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক চাকা বন্ধ হওয়ার কারণে সংকটের প্রকৃতি কি ধরনের আকার ধারণ করবে? অনেকে বলছে সরকার জনগণের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাওয়ার ব্যাপারে কঠোর হয়নি কেন? সরকার যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিত, যে কোনো মূল্যে গ্রামের দিকে ধাবিত যাত্রীদের প্রতিহত করতে হবে। তাহলে অবস্থাটা গিয়ে দাঁড়াতো কোথায়। জনসংখ্যার এক বিরাট অংশ যেখানে গণতান্ত্রিক সরকারের পাশে, তাদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হওয়া সমুচিত ছিল কি? আর এরূপ সংঘাতের ফল কি হতে পারত। বাংলাদেশ একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়; বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রয়েছে আমদানি, রপ্তানি, বাণিজ্য, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ রয়েছে। বাংলাদেশে বিশ্বের বিভিন্ন শিল্পপতিদের রয়েছে আর্থিক বিনিয়োগ। ইচ্ছা করলেই বাংলাদেশ একক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। অনেকে ক্ষুব্ধ এই ভেবে, হঠাৎ করে কেন গার্মেন্টশিল্প চালু করা হলো? বাস্তবতা হচ্ছে- যেসব ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি করেন; তাদের সরবরাহ বন্ধ করে দিলে তো তারা বিকল্প পথ খুঁজে বের করবে। একইভাবে আমরা যেসব বিদেশি কাঁচামালের ওপর নির্ভর করে কারখানা চালু রাখি, সেগুলো যদি তারা সরবরাহ করতে না পারে তাহলে তারাও তো বিকল্প বাজার খুঁজবে। বিবেচনায় নিন অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাকে। ধরুন আমাদের দেশে ২ লাখ গণপরিবহণ রয়েছে। এখন যদি অনির্দিষ্টকাল যাতায়াত বন্ধ থাকে, তাহলে পরিবহণব্যবস্থা গিয়ে দাঁড়াবে কোথায়? কয়েক লাখ পরিবহণ শ্রমিক বাঁচবে কি করে? কীভাবে মালিকরা তাদের বেতন দেবে? নদীপথে যাতায়াত করে অগণিত লঞ্চ। সেগুলো যদি বন্ধ থাকে, তাহলে পণ্য বহন করবে কারা? গ্রামের কৃষিপণ্য শহরে আসবে কী করে? গণপরিবহণ বন্ধ থাকলে মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাবে কী করে? কোনো দেশের শিক্ষাব্যবস্থাপনা কি অনির্দিষ্টকাল বন্ধ রাখা যায়? কী অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে এই দুই মাসে? একমাত্র কৃষি ছাড়া সব তো অচল। সুতরাং যারা বলছেন কঠোরভাবে লকডাউন কার্যকর রেখে করোনা আক্রমণ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে এনে তারপর শিথিলতার প্রশ্ন। এমনকি প্রয়োজন বোধে কারফিউ দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের পরামর্শের পিছনে যে যুক্তি দাঁড় করছেন, তা কতটা বাস্তব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যখন বলছে বোধ হয় বেশকিছু দিন বিশ্ববাসীকে করোনার সঙ্গে সহাবস্থান করতে হবে। এমনকি প্রতিশেধক আবিষ্কার হলেও তা প্রয়োগ করে সফল হতে বেশকিছু সময় লাগবে। সেহেতু সবকিছু আস্তে আস্তে সচল করে অর্থনীতিকে পূর্ণজীবিত করতে হবে। সেকারণে ভাইরাস আক্রমণ প্রতিরোধের নতুন কৌশল অবলম্বন করতে হবে। একথা সত্য যে, লকডাউন শিথিল করলে হয়তো মৃতু্যর সংখ্যা ও রোগীর সংখ্যা বাড়বে। তাই নতুন কৌশল হবে সীমিত আকারে বিধিনিষেধ শিথিল করা ও আক্রান্ত ব্যক্তি বা তার সহযোগীদের ওপর কঠোরতম নিয়ন্ত্রণ আর বাকি অঞ্চলে আস্তে আস্তে অর্থনীতিকে সচল করে জনগণকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আনা। দুদিকেই রিক্স রয়েছে। কিন্তু একটাকে বন্ধ রেখে অন্যটাকে সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব কি? জীবন ও জীবিকা দুটোই তো মৌলিক প্রশ্ন। জীবনের জন্যই তো জীবিকা। জীবিকা বন্ধ হলে জীবন রক্ষা পাবে কি করে। তাই সরকার ও জনগণ উভয়কেই এই বাস্তব উপলব্ধি করতে হবে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে যে কৌশলের পথে এগোচ্ছে আমাদেরও একই পথে এগোতে হবে। ভবিষ্যতে কোনো মসৃণ পথ কারও জন্য খোলা আছে বলে মনে হয় না। মনে রাখা দরকার বিশ্বের সব ব্যবস্থাপনায় আগামীতে যে পরিবর্তন সূচিতে হতে যাচ্ছে বাংলাদেশকে তা বিবেচনায় নিয়েই এগোতে হবে। আর সে কারণেই সরকার দেশকে সচল রাখার পদক্ষেপ নিয়েছে। গণপরিবহণসহ সব কিছু খুলে দিয়েছে। এতে অবশ্য আক্রান্ত ও মৃতু্য বেড়েছে।

অর্থনীতি যদি স্থবির হয়; তাহলে উন্নয়ন তৎপরতাও বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। আগামী বাজেট হতে হবে অত্যন্ত যুক্তিনির্ভর। উন্নয়নের গতি কিছুটা সীমিত হলেও দুর্দশাগ্রস্ত জনগণের দুর্যোগ বাড়ে এমন কোনো পদক্ষেপ আগামী বাজেটে গ্রহণ করা ঠিক হবে না।

রাজনীতিক ও কলাম লেখক

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0