অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও একটি হারানো দিনলিপি

অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও একটি হারানো দিনলিপি

যুগ যুগ ধরে উপমহাদেশের রাজনীতিকরা লিখেছেন তাদের অভিজ্ঞতার আলোকে। শুধু অবসরেই নয়; লিখেছেন কারারুদ্ধ অবস্থায়ও। নেহেরুর লেখা Glimpses of World History এবং The Discovery of India দুটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন জেলে বসে মেয়ে ইন্দিরাকে লেখা চিঠির মাধ্যমে মানবইতিহাসের এক চিত্র তুলে ধরেন Glimpses of World History বইতে। আর ভারতের ইতিহাস, দর্শন ও কৃষ্টি-সম্পর্কিত বিষয়াদি স্থান পায় দ্বিতীয় বইটিতে। নেহেরু ছাড়াও জেলে বসে লিখেছেন আরও অনেক রাজনীতিক।

বছর তিনেক আগে প্রকাশিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’
(The Unfinished Memoirs)। বঙ্গবন্ধুকে তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য এবং সব থেকে মূল্যবান সময় অতিবাহিত করতে হয়েছে পাকিস্তানি কারাগারে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটি রচিত হয়েছে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে, যার শুরু ১৯৬৭ সালের দ্বিতীয়ার্ধে।

গ্রন্থটি রচনার পটভূমি এরকম–

বঙ্গবন্ধুকে তাঁর সহকর্মীরা বলে লিখতে– কারাগারে বসে রাজনৈতিক জীবনের ঘটনাবলী লিখতে। সাধারণ পাঠকদের জন্য যিনি পূর্বে কখনও উল্লেখযোগ্য তেমন কিছু লেখেননি বা প্রকাশ করেননি; তিনি কী-ই-বা লিখবেন? অকপটে স্বীকার করেন, “লিখতে যে পারি না; আর এমন কী করেছি যা লেখা যায়!”

[পৃষ্ঠা ১]

সহকর্মীদের অনুরোধ তাঁকে কতটুকু প্রভাবিত করেছিল তা বলা কঠিন। তবে সহধর্মিনী রেণুর অনুরোধে তিনি যে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তা স্পষ্ট: “বসেই তো আছ, লেখ তোমার জীবনের কাহিনী।”

[পৃষ্ঠা ১]

শুধু বলেই খান্ত নন, ‘কালি-কলম-মন’, লেখার এই তিন উপকরণের যোগানও দিয়েছিলেন রেণু। তা থেকেই শুরু।

খণ্ড খণ্ড রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঘটনা ও তার ধারাবাহিকতার মাঝে বঙ্গবন্ধু বাংলা, পূর্ব বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির এক বিশাল চিত্র তুলে ধরেন, যার ব্যাপ্তি চল্লিশ দশকের শুরু থেকে ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত। প্রায় দেড় দশকের এই সময়ে তিনি কখনও ছিলেন ছাত্র সংগঠক, কখনও উত্তীর্ণ হয়েছেন জাতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে। সে সময়ের তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা শুধু দূর থেকেই প্রত্যক্ষ করেননি, বঙ্গবন্ধু ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিলেন এসব বহু ঘটনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে। জড়িত ছিলেন কোলকাতার ভারত বিভাগের ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে। দেখেছেন প্রতিবাদ সত্ত্বেও জিন্নার রাজনীতির সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচে ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ‘আপাদতদৃষ্টিতে ছোট কিন্তু মৌলিক’ (‘States’ থেকে ‘State’) রদবদল ঘটার ঘটনা।

ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন ভাষা আন্দোলন ও আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্মের সঙ্গে। জড়িত ছিলেন যুক্তফ্রন্টের রাজনীতি, নির্বাচন ও উত্থান-পতনের সঙ্গে। কোনো ভাবগম্ভীর তত্ত্বের মাঝে নয়, এই সব ঘটনা বর্ণনা করেছেন সহজ-সরল ভাষায়, অত্যন্ত আন্তরিকতা এবং সততার সঙ্গে। এটা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র একটি উল্লেখযোগ্য দিক।

বইটিতে একদিকে ফুটে উঠে বঙ্গবন্ধুর দেশে ও মানবপ্রেম; অন্যদিকে প্রকাশ পায় তাঁর সংগ্রামী চেতনা ও গণতান্ত্রিক মনোভাব এবং সেই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতার প্রতি শ্রদ্ধা ও কর্মীর প্রতি সহমর্মিতা। এসব গুণাবলী বঙ্গবন্ধু কোনো কাঠামোগত প্রথায় রপ্ত করেননি; তিনি এগুলো আত্মস্থ করেছেন অভিজ্ঞতার আলোকে। মাটি ও মানুষ থেকে শিখেছেন দেশপ্রেম; সামাজিক বৈষম্যতা করেছে তাঁকে সংগ্রামী; আর সহকর্মীদের ঘনিষ্ঠ সহচরে জন্মেছে সহমর্মিতা।

বঙ্গবন্ধুর লেখা একটি চিঠির কথাই ধরুন। সময় ১৯৫২ সনের জুলাই মাস। তিনি তাঁর এক সহকর্মীর মাকে এই চিঠিটি লেখেন। এই একটি মাত্র চিঠির মাঝেই ফুটে উঠে সহকর্মীর প্রতি বঙ্গবন্ধুর মমত্ত্ববোধের গভীরতা। যে মাকে তিনি কখনও দেখেননি; তাঁর ছেলে আজ জেলে। তাঁকে ‘আম্মা’ বলে সম্বোধন করে লেখেন–

“আম্মা,

আমার ভক্তিপূর্ণ ছালাম নিবেন। আপনি আমায় জানেন না, তবুও আজ লিখতে বাধ্য হচ্ছি। আপনার ছেলে খালেক নেওয়াজ আজ জেলখানায়। এতে দুঃখ করার কারণ নাই। আমিও দীর্ঘ আড়াই বৎসর কারাগারে কাটাতে বাধ্য হয়েছি। দেশের ও জনগণের দুঃখ-দুর্দশা দূর করার জন্যই সে আজ জেলখানায়। দুঃখ না করে গৌরব করাই আপনার কর্তব্য। যদি কোনো কিছুর দরকার হয়, তবে আমায় জানাতে ভুলবেন না। আমি আপনার ছেলের মতো। খালেক নেয়াজ ভালো আছে। জেলখানা থেকেই পরীক্ষা দিচ্ছে। সে মওলানা ভাসানী সাহেবের সাথে আছে।

আপনার স্নেহের… ”

[বঙ্গবন্ধুর অপ্রকাশিত চিঠিপত্র, পৃষ্ঠা: ৬১, দে, ২০১০]

চিঠির ভাষা ও ভাবে যা ফুটে ওঠে তা শুধুই নান্দাইলের আচারগাঁও গ্রামের খালেক নেওয়াজের মাকে লেখা এ চিঠি নয়– এ যেন খালেক নেওয়াজের মায়ের অবস্থানে অবস্থিত বাংলাদেশের সমগ্র মাকে লেখা এ চিঠি। তাই তো এর আবেদন শাশ্বত।

বঙ্গবন্ধু বুঝেছেন মায়ের বুকের চিরন্তন আকুতি; যার প্রকাশ ঘটেছে খালেক রূপে আত্মপ্রকাশ (“আমি আপনার ছেলের মতো”) এবং তাঁর সঙ্গে একাত্বতা ঘোষণার মাঝে (“আমিও দীর্ঘ আড়াই বৎসর কারাগারে কাটাতে বাধ্য হয়েছি”)। একদিকে মাকে দিয়েছেন সান্ত্বনা (“এতে দুঃখ করার কারণ নাই”), শুনিয়েছেন আশার বাণী (“জেলখানা থেকেই পরীক্ষা দিচ্ছে”) দিয়েছে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি (সে ভাসানী সাহেবের সাথে আছে)। অন্যদিকে মায়ের কাছে সন্তানকে করেছেন গৌরবান্বিত (দেশের ও জনগণের দুঃখ-দুর্দ্দশা দূর করার জন্যই সে আজ জেলখানায়। দুঃখ না করে গৌরব করুন)। বাংলার মা এর চেয়ে বেশি কিছু কি চান?

রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল গভীর শ্রদ্ধাবোধ। আত্মজীবনীতে এ বিষয়টির সঙ্গে পাঠকরা মুখোমুখি হয় বারবার। মওলানা ভাসানীর সঙ্গে রাজনীতি করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। যুক্তফ্রন্টের সময় একসঙ্গে কাজ করেছেন শেরে বাংলা ফজলুল হকের সঙ্গে। বঙ্গবন্ধু মওলানা ভাসানীকে দেখেছেন একজন নিঃস্বার্থ, ত্যাগী এবং সাহসী রাজনীতিক হিসেবে।

অন্যদিকে মওলানা ভাসানী বঙ্গবন্ধুকে দেখেছেন একজন কঠিন পরিশ্রমী ও দক্ষ সাধারণ সম্পাদক তথা রাজনীতিক হিসেবে। তবে রাজনৈতিক গুরু হিসেবে যাঁকে মানতেন তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সোহরাওয়ার্দীর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ছিল অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস। তিনি বঙ্গবন্ধুকে সত্যিকার অর্থেই ভালবাসতেন। বঙ্গবন্ধুর প্রতি সোহরাওয়ার্দীর স্নেহ ও ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন:

“তিনি যে সত্যিই আমাকে ভালোবাসতেন ও স্নেহ করতেন, তার প্রমাণ আমি পেয়েছি তাঁর শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করার দিন পর্যন্ত।”

[পৃ. ২৯]

তবে এটাও সত্য, নীতির জন্য তিনি কারও সঙ্গে কখনও আপস করেননি। একবার কোনো এক বিষয়ে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। সম্ভবত সময়টা ১৯৪৪ সাল। হঠাৎ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুকে বলে বসেন:

“Who are you? You are nobody.”

প্রতি-উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন:

“If I am nobody, then why have you invited me (to this meeting)? You have no right to insult me. I will prove that I am somebody.

অ্যারো গেন্ট শোনালেও, অশ্রদ্ধার কোনো সুর ছিল না তাতে, বরং “Thank you, Sir” (পৃ. ২৯) বলে সবিনয়ে বেরিয়ে আসেন।

সত্যিকার অর্থে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা, আর নীতির সঙ্গে আপোষহীন মানসিকতা প্রকাশের কোনো দ্বন্দ্ব নেই। বরঞ্চ, একে অপরের সম্পূরক। ষাটের দশকে বাংলা দেশ একঝাঁক বুদ্ধিদীপ্ত, প্রগতিশীল ও সাহসী ছাত্র রাজনীতিকের জন্ম দেয়। সত্তরে এসে তাঁরা জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। বয়সের ভারে তাঁরাও আজ ধীরে ধীরে সরে দাঁড়াচ্ছেন রাজনীতি থেকে। সত্তরের পর আরও চার দশক গেল। পেল কি বাংলাদেশ বুদ্ধিদীপ্ত ও সাহসী ছাত্র অথবা জাতীয় রাজনীতিক?

বর্তমান ছাত্র রাজনৈতিক অঙ্গনে এ ধরনের গুণাবলী সম্পন্ন রাজনীতিক পাওয়া ভার। তাহলে কি জাতি নেতৃত্বশূন্যতায় ভুগবে অদূর ভবিষ্যতে?

বাংলাদেশ তথা উন্নয়নশীল দেশগুলি অবকাঠামোগত সমস্যায় জর্জরিত। আইনকানুন থাকা সত্ত্বেও তার যথাযথ প্রয়োগ থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। তাই তো বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলিতে সুশাসন কায়েমে তরুণ বুদ্ধিদীপ্ত ও সাহসী রাজনীতিকের এত বেশি প্রয়োজন। তাই বঙ্গবন্ধু পাঠ এখনও প্রাসঙ্গিক।

বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির দুটি প্রধান স্তম্ভ– ঐক্য আর গণতন্ত্র; আত্মজীবনীতে বর্ণিত তাৎপর্যপূর্ণ বহু রাজনৈতিক ঘটনাই এর সাক্ষর। তবে একটি বাদে অন্যটি নয়। ঐক্য হতে হবে গণতন্ত্রে ও সঠিক নেতৃত্বে। এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যুক্তফ্রন্টের ঐক্য আলোচনায়। আজ এ দল, কাল সে দল। আজ এ নেতা, কাল অন্য নেতা– এসব নেতা-কর্মী, এক কথায় এই প্রকৃতির রাজনীতিকদের নিয়ে আর যা-ই হোক, দেশ ও দশের সেবা করা যে সম্ভব নয়, তা বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম প্রহরেই বুঝেছিলেন।

তিনি একাধিকবার বলেছেন:

“নীতিহীন নেতা ও রাজনীতিববিদদের সাথে কোনোদিন একসাথে হয়ে দেশের কোন কাজে নামতে নেই।”

[পৃ. ২৭৩]

“আদর্শহীন লোক নিয়ে ক্ষমতায় গেলেও দেশের কাজ হবে না। ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধার হতে পারে।”

[পৃ. ২৪৯]

শুধু কথায় নয়, প্রমাণ করেছেন কাজেকর্মেও। ১৯৭১ সালের মার্চে বলা “আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না”, বঙ্গবন্ধুর বিচ্ছিন্ন কোনো উচ্চারণ নয়।

এর দেড় যুগ আগের কথা। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে জয়ের পর মওলানা ভাসানী বলেন:

“দরকার হলে তোমাকে (বঙ্গবন্ধুকে) মন্ত্রিসভায় যোগদান করতে হবে।”

[পৃ. ২৬২]

যখন সোহরাওয়ার্দী জিজ্ঞেস করেন, “তুমি মন্ত্রিত্ব নেবা কি না” (পৃ. ২৫৯), উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমি মন্ত্রিত্ব চাই না। পার্টির অনেক কাজ আছে, বহু প্রার্থী আছে দেখেশুনে তাদেরকে দেন।”

[পৃ. ২৫৯]

ফজলুল হক বলেন, ’’তোকে মন্ত্রী হতে হবে। আমি তোকে চাই, তুই রাগ করে ‘না’ বলিস না।”

[পৃ. ২৬২]

শেষে অবশ্য বঙ্গবন্ধু রাজি হন এবং মন্ত্রীও হন। তবে এটাও সত্য, মন্ত্রিত্ব বন্টনে যখন ষড়যন্ত্রের আভাস পান, তখন ফজলুল হককেও বলতে দ্বিধা বোধ করেননি:

“এ সমস্ত ভাল লাগে না, দরকার হয় মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে চলে যাব।”

[পৃ. ২৬৭]

আজগের চিত্র ভিন্ন। আজ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মন্ত্রী হওয়ার জন্যই যেন রাজনীতি। দেশের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার প্রেরণা অগ্রাধিকারেরর তালিকায় সর্বনিম্নে। আর একবার মন্ত্রী হলে তা যেন কামনা-বাসনার চিরস্থায়ী বন্দবস্ত! বাংলাদেশে অনেক রাজনীতিকই আছেন যাঁরা প্রায় সব সরকারেরই মন্ত্রী ছিলেন। ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারই তাদের নীতি ও আদর্শ। ছলে-বলে-কলা-কৌশলে মন্ত্রী হওয়া এবং তা যে করেই হোক ধরে রাখার মাঝে সৃষ্ট রাজনৈতিক vicious চক্রের মাঝে ক্ষত হয় রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা; আর ব্যাহত হয় অর্থনীতি। মন্ত্রিত্ব পরিচালনায় ব্যর্থ হলে, তা হোক অযোগ্যতা, অদূরদর্শিতা বা পরিস্থিতিজনিত, কিংবা জনগণের নীরব (perceived) অসমর্থনজনিত; মন্ত্রিত্ব থেকে সড়ে দাঁড়ানোর ফলে সৃষ্ট হয় এক ধরনের virtuous (উৎকর্ষ) চক্র, যা ধাপে ধাপে রাজনৈতিক কাঠামো সংহত করে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সহায়ক।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে গণতন্ত্র ও বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম ফুটে ওঠে বিভিন্নভাবে এবং আত্মজীবনীর বিভিন্ন অধ্যায়ে। তবে দুটি দিকই একসঙ্গে প্রকাশ পায় ২৫ আগস্ট ১৯৫৫ বঙ্গবন্ধুর পাকিস্তানের গণপরিষদে (করাচিতে) প্রদত্ত ভাষণে:

“Sir (to the Speaker), you will see that they want to use the phrase “East Pakistan” in stead of “East Bengal”. We have demanded many times that you should use “Bengal” in stead of Pakistan. The word “Bengal” has a history and tradition of its own. You can change it only after the people have been consulted… Why do you want it to be taken up right now? What about state language, Bengali?… So, I appeal to my friends on that side to allow the people to give their verdict in any way, in the form of referendum or in the form of plebicite.”

[পৃষ্ঠা ২৯৩]

শত শত বছরের বাসস্থান ত্যাগে জনগোষ্ঠী রূপান্তরিত হয় মহাজিরে, এটা সত্য। তবে মহাজিরে রূপান্তর শুধু ফিজিকাল গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলার ভাষা, ইতিহাস, ও কৃষ্টি থেকে বঞ্চিত করে সেদিন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী চেয়েছিল নিজ বাসভূমিতেই বাঙালিদের মহাজির বানাতে। ভদ্রজনোচিত ও মৃদু কণ্ঠে সেদিন বঙ্গবন্ধু সেই কঠিন বিষয়টির প্রতিই দৃষ্টি আকর্ষণ করেন গণপরিষদে। বলাবাহুল্য, প্রায় ৬০ বছর পর সম্প্রতি পাকিস্তানের এক কলামিস্ট মন্তব্য করেন–

“…The renaming of East Bengal as East Pakistan as the most divisive event in political history of Pakistan and the critical first milestone towards the division of Pakistan.”

[Syed Anwar Mahmood, সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১২, Remembering break-up of Pakistan, The News International]

নিঃসন্দেহে, ‘পূর্ব বাংলা’র নামের রূপান্তর একটি বিভেদকারী পদক্ষেপ। তবে এ ধরনের পদক্ষেপ এখনেই থেমে থাকেনি। ১৯৫৫ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর সব সিদ্ধান্তই ছিল ভুল, অন্যায় ও অমানবিক। সময় এসেছে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের অর্থনেতিক শোষনের এবং ’৭১এর যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অন্যায়ের জন্য Sorry বলা।

১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত বিভাগ হলেও, ১৯৫৪ সনের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেন– বাঙালি ধর্মে গভীর বিশ্বাসী, তবে ধর্মের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়।

এই উপলব্ধি থেকেই জন্ম নেয় বঙ্গবন্ধুর ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি; স্বাধীনতার পর যা অন্তর্ভুক্ত হয় বাংলাদেশের সংবিধানের চার স্তম্ভের এক স্তম্ভে।

যুক্তফ্রন্টে বঙ্গবন্ধু নির্বাচন করেন গোপালগঞ্জ-কোটালীপাড়া আসনে। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মুসলিম লীগ প্রার্থী। ধনবান এই প্রতিদ্বন্দ্বী নির্বাচনে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে অবলম্বন করেন ধর্মকে। এলাকার মওলানাদের সংবদ্ধ করে ফতোয়া দেওয়ার ব্যবস্থা করেন বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে:

“আমাকে (বঙ্গবন্ধুকে) ভোট দিলে ইসলাম থাকবে না, ধর্ম শেষ হয়ে যাবে।”

[পৃ. ২৫৬]

সেই সঙ্গে আরও স্লোগান: (আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে) ‘পাকিস্তান ধ্বংস হয়ে যাবে….
মুসলিম লীগ পাকিস্তানের মাতা।… (আওয়ামী লীগ) হিন্দুদের দালাল, পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলা এক করতে চায়।’’

[পৃ. ২৫৮]

তারপরও শেষরক্ষা হয়নি তাদের। বঙ্গবন্ধুর প্রতিদ্বন্দ্বী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। নির্বাচনের পর বঙ্গবন্ধুর ধারণা জন্মে:

’’জনগণকে ইসলাম ও মুসলমানের নামে স্লোগান দিয়ে ধোঁকা দেওয়া যায় না। ধর্মপ্রাণ বাঙালি মুসলমানরা তাদের ধর্মকে ভালোবাসে; কিন্তু ধর্মের নামে ধোঁকা দিয়ে রাজনৈতিক কার্যসিদ্ধি করতে তারা দেবে না…।’’

[পৃ. ২৫৮]

ধর্মকে মূলধন করে যারা রাজনীতি করে তাদের দেওয়া এ স্লোগানগুলো আমাদের অতিপরিচিত। সত্তরের নির্বাচনেও শুনেছি এ ধরনের স্লোগান। তথাপি, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের মতো সত্তরের নির্বাচনেও দেখেছি মুসলিম লীগ-জামায়াতের ভরাডুবি।

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তারা ইসলামের নামে একই স্লোগান তুলে আর কাজ করে মানবতার বিরুদ্ধে (‘আমাদের দেহ ও প্রাণ শুধু এবং শুধুই ইসলামের জন্য। আমরা ইসলামের জন্যই এসব কাজ করেছি (হত্যা, ধর্ষণ ইত্যাদি)।…. আমরা পাকিস্তানকে উপাস্য মনে করে নয়, মসজিদ মনে করে আমাদের ঝুঁকি ও আমাদের ভবিষ্যতকে এর উপর ন্যস্ত করেছিলাম।’

ডিসেম্বরে বিজয়ের ঠিক আগমুহূর্তে পূর্ব পাকিস্তানের আল-বদর প্রধান আলী আহসান মুজাহিদের সমবেত আল-বদরদের উদ্যেশে প্রদত্ত ভাষণের অংশ।

[জনকণ্ঠ, ১৪ ডিসেম্বর ২০১২]

আজও শুনি তাদের একই স্লোগানের ধ্বনি। তাদের কার্যকর্মের ধারাবাহিকতায় বার বার প্রমাণ করে এরা ধর্মের নামে ধ্বংস ও হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তারা ’৭১এর যুদ্ধাপরাধী। তাদের শাস্তি পেতেই হবে মানবতার বিরুদ্ধে অন্যায়ের জন্য। বঙ্গবন্ধু শুরু করেছিলেন এদের বিচার। অনেকের সাজাও হয়েছিল সে বিচারে। যারা বলে, বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করেছেন, তারা মিথ্যা বলে। সাধারণ ক্ষমা তাদেরই করেছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ বা অগ্নিসংযোগের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এগুলো কথার কথা নয়, এগুলো ডকুমেন্টেড ফ্যাক্ট (ফ্যাক্টস অ্যান্ড ডকুমেন্টস বঙ্গবন্ধু হত্যা, পৃ. ৫০)।

১৯৭৫এর পটপরিবর্তনের পর যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে তারা প্রতিবিপ্লবী। তাই তারা স্বাধীনতার পরাজিত ঘৃণ্যশক্তি রাজাকার-আলবদর; জামায়াত-মুসলিম লীগারদের পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে; আর পুনর্বহাল করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি।

যারা যুদ্ধাপরাধীদের পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে; আর পুনর্বহাল করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি, যারা যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসিত করে, যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতির ব্যবসা করে, যারা ২০১৩ সালে বিজয়ের মাসে ঢাকার পথে পথে হরতালের নামে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জামায়াত-শিবিরের ধ্বংস ও হত্যার রাজনীতিকে সমর্থন জোগায়; যারা যুদ্ধাপরাধী বিচারে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে, তারা একই সূত্রে গাঁথা।

তাদের শহীদ মিনারে কিংবা বুদ্ধিজীবীদের সমাধিস্থলে যাওয়ার, অথবা বিজয়ের পতাকা তলে স্থান পাওয়ার অধিকার আছে কি? এ প্রশ্নের সঠিক উত্তরের জন্য, শুধু অসংলগ্নভাবে জানা নয়; বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ঘটনা ধারাবাহিকতার সঙ্গে বোঝা ও উপলব্ধির প্রয়োজন। তাই স্বাধীনতা-উত্তর প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু পাঠ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

১৯৭৩ থেকে ২০১৪। চল্লিশ বছর। ১৯৭৩ বহির্বিশ্বের বহু সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী দেশের মতামত উপক্ষো করে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছিলেন। নিঃসন্দেহে, এতে বঙ্গবন্ধু সাহসীকতার প্রমান মেলে। তবে সেদিনের বিচারের দণ্ড দীর্ঘস্থায়ী হয়নি প্রতিবিপ্লবীদের থেকে অসতর্কতার কারণে। দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর আবার শুরু হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার।

তবে এবারের বিচারের রায় স্থায়িত্বশীল করার জন্য প্রতিবিপ্লবীদের থেকে সতর্কের বিকল্প নেই। হত্যা ও ধ্বংসে এরা সিদ্ধহস্ত। ১৯৭১, ১৯৭৫ এবং ২০০৪ সালের মতো যে কোনো সময় তারা আবার পারে আঘাত হানতে। সেই সঙ্গে সতর্ক থাকতে হবে বুদ্ধিজীবীদের যাঁরা তাদের লেখনীর মাঝে ক্রমাগত উম্মোচন করছেন ঘাতক দালাল, জামায়াত-শিবির এবং তাদের দোসরদের প্রকৃত চেহারা।

রাজনৈতিক জীবনের বাইরে রাজনীতিকদেরও ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন থাকে। বঙ্গবন্ধুরও ছিল। তবে তা রাজনীতির কারণে উপেক্ষিত হয়েছে বার বার এবং তা এতটাই উপেক্ষিত হয় যে, দীর্ঘদিন পর্যন্ত সন্তানের কাছে পিতা রয়ে যায় যে কোনো পুরুষ রূপে (‘কামাল কিছুতেই আমার কাছে আসল না। দূর থেকে চেয়ে থাকে। ও বোধহয় ভাবত, এ লোকটা কে?’ (পৃ. ১৮৪)। যখন তাদের বিয়ে হয়, তখন বঙ্গবন্ধুর বয়স হয়তো তের। আর তাঁর সহধর্মিনী রেণুর বয়স তিন। পুতুল-পুতুল বিয়ে, পরবর্তীতে ফুলশয্যা এবং সময়ে তাদের মাঝে গড়ে উঠে এক সুন্দর সম্পর্ক।

রেণু একদিকে ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রেরণার উৎস, অন্যদিকে পালন করেছেন সংসারের ষোল আনা দায়িত্ব। রাজনৈতিক কারণে টুঙ্গিপাড়ার সংসার ছেড়ে কখনও তিনি কোলকাতায়, কখনও ঢাকায়, কখনও-বা জেলে থাকা সত্ত্বেও, আত্মজীবনীতে এটা স্পষ্ট, তাদের মাঝের পার্থিব দীর্ঘ দূরত্বের পথ হৃদয়পটে রয়ে গেছে নাতিদীর্ঘ পথে।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে খুঁজে পাওয়া যায় এক সাধারণ বাঙালিকে, যিনি দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার, নির্যাতন সহ্য আর ক্ষমতার মোহ উপেক্ষা করে উত্তীর্ণ হয়েছেন এক মহান ব্যক্তিত্বে। তবে এটাও সত্য, যারা Big Picture দেখে, তাদের জন্য খুঁটিনাটি দেখার সময় কোথায়? যারা দেশ দেখে, তাদের কাছে অনিচ্ছাকৃত উপেক্ষিত হয় সংসার। এ দোষে গান্ধীর মতো বঙ্গবন্ধুও দোষী!

তবে গবেষকদের মতে, বঙ্গবন্ধু ছাত্রজীবন থেকে ডায়েরি লিখতেন যা এখনও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭২ সালে ডেভিড ফ্রস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন:

“পাকিস্তানি…. বর্বর বাহিনী আমার আসবাবপত্র… দ্রব্যসামগ্রী লুণ্ঠন করেছে তাতে আমার দুঃখ নেই। আমার দুঃখ, ওরা আমার জীবনের ইতিহাসকে লুণ্ঠন করেছে। আমার ৩৫ বছরের রাজনৈতিক জীবনের দিনলিপি ছিল… বর্বররা…. লুণ্ঠন করেছে।”

[আহমদ সালিম- পাকিস্তানের কারাগারে শেখ মুজিবের বন্দিজীবন, ঢাকা, ১৯৯৮, পৃ. ১০৪]

সেটি থাকলে এই মহান মানুষটির চিন্তার সব দুয়ার আমাদের সামনে খুলে যেত নিঃসন্দেহে।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের আরএমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক 

What's Your Reaction?

like
0
dislike
0
love
0
funny
0
angry
0
sad
0
wow
0